Image description

তরুণ কর্মীবাহিনীর চাকরি হারানোর পেছনে প্রযুক্তির আধুনিক সংস্করণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনুসন্ধান চালাচ্ছেন অর্থনীতিবিদেরা। তবে সাম্প্রতিক দুটি নতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। তরুণদের হোয়াইট কলার (দাফতরিক) চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনাকালের শুরু হওয়া ‘রিমোট ওয়ার্ক’ কর্মপদ্ধতি। এআই-এর প্রভাব এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে মাত্র।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং অক্সফোর্ডের এলিসন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতিবিদেরা এক যৌথ গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘এই ধরনের ক্রমাগত সংকোচন ভবিষ্যৎ অভিজ্ঞ কর্মীবাহিনী তৈরির প্রক্রিয়াকে ভেতর থেকে শূন্য করে দিচ্ছে।’

রিমোট ওয়ার্কের কারণে কর্মীরা যেকোনও জায়গায় বসে কাজ করার সুযোগ পেলেও এর একটি নেতিবাচক দিক সামনে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়োগকর্তারা এখন অনভিজ্ঞদের নিয়োগ দিতে ইতস্তত বোধ করছেন। দূর থেকে নতুনদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদের পেশাগত দক্ষতা তৈরি করা কঠিন বলে মনে করেন তারা। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অভিজ্ঞ কর্মীদের বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

গবেষকদের মতে, তরুণ হোয়াইট কলার কর্মীদের প্রথম বড় ধাক্কাটি ছিল মহামারির সময়ে রিমোট ওয়ার্কে রূপান্তর। এই সংকট কাটেনি, তার আগেই হাজির হয়েছে এআই। একে গবেষকেরা ‘ভাঙা মই’ বলে অভিহিত করেছেন, যা তরুণদের ক্যারিয়ারের শুরুর সিঁড়িটি ভেঙে যাওয়ার করুণ চিত্রকে তুলে ধরে।

নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের অর্থনীতিবিদেরা তাদের এক গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘নিয়োগকর্তারা পুরোপুরি ভার্চুয়াল টিমে নতুন স্নাতকদের নিয়োগ দিতে চান না। কারণ দূর থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পেশাগত দক্ষতা শেখানো বেশ কঠিন।’

 

পরিসংখ্যান কী বলছে?

কোভিড-১৯ মহামারির আগে ২৯ বছরের কম বয়সী কলেজ স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৩.১ শতাংশ। তবে ২০২২ সালের পর থেকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে। অথচ এই একই সময়ে অভিজ্ঞ কলেজ স্নাতকদের বেকারত্বের হার উল্টো কমেছে।

এই বৈষম্য মূলত সেসব চাকরিতে বেশি দেখা গেছে যা বাসা থেকে করা সম্ভব। এ ধরনের পেশায় তরুণ স্নাতকদের বেকারত্বের হার প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে একই পেশার অভিজ্ঞদের বেকারত্বের হার কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বেকারত্ব বাড়ার এই সময়কালটি মূলত এআই-এর দ্রুত প্রসারের আগের। তারা হিসাব করে দেখিয়েছেন, মহামারি-পরবর্তী সময়ে তরুণদের বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রায় ৬৪ শতাংশের জন্যই দায়ী এই রিমোট ওয়ার্ক।

নিউ ইয়র্ক ফেড উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছে, তরুণ কর্মীরা আগে কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞ সহকর্মীদের কাছাকাছি থেকে যে পরামর্শ ও ফিডব্যাক পেতেন, রিমোট ওয়ার্কের কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কর্মজীবনের শুরুতে যে সুবিধা তারা পেতেন, তা হারিয়ে গেছে।

এআই বনাম রিমোট ওয়ার্ক

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষকেরা জানিয়েছেন, আগের কিছু গবেষণায় এন্ট্রি-লেভেল চাকরি কমার জন্য এআই-কে দায়ী করা হলেও, সেখানে মূলত রিমোট ওয়ার্কের প্রভাবটিই প্রতিফলিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ চারটি দেশের নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা দেখিয়েছেন, রিমোট ওয়ার্কের প্রভাবটিকে হিসাবের মধ্যে ধরলে এআই-এর কারণে নতুনদের চাকরি কমার তত্ত্বটি আর ধোপে টেকে না।

তবে দাফতরিক চাকরি বাদ দিলে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। বিএনপি পারিবাস’র অর্থনীতিবিদেরা গত সপ্তাহে এক নোটে জানিয়েছেন, অনেক তরুণ আমেরিকান খুচরা বিক্রি, বিনোদন ও আবাসন খাতের মতো শিল্পগুলোতে নিযুক্ত আছেন। এসব খাত এআই-এর চেয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলে এই তরুণদের অবস্থান ভালো থাকবে।

নিউ ইয়র্ক ফেডের অর্থনীতিবিদেরা লিখেছেন, ‘ভবিষ্যতে তরুণদের কর্মসংস্থানের ধরণ নির্ধারণে জেনারেটিভ এআই এবং অন্যান্য কারণগুলো আরও প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে। তা সত্ত্বেও, এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রমাণ বলছে যে রিমোট ওয়ার্কের উত্থান তরুণ কলেজ স্নাতকদের সাম্প্রতিক সংকটকে অর্থপূর্ণভাবে বাড়িয়ে তুলেছে।

বিপরীতে, অভিজ্ঞ কর্মীদের ক্ষেত্রে সুবিধা হলো, তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ও বিচারক্ষমতাকে এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা কঠিন।

সূত্র: অ্যাক্সিওস