একটিমাত্র সংলাপ বা বাচনভঙ্গি কীভাবে রাতারাতি একজন সাধারণ মানুষকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যেতে পারে, তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ বাংলাদেশ ও বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হওয়া দুটি ভিন্ন চরিত্র। বাংলাদেশে যেমন ‘রাগ করলা, কথাটা ঠিক না বেঠিক?’ সংলাপ দিয়ে নেটিজেনদের মাতিয়েছেন পেশাদার অভিনেতা ঈমান আলী, ঠিক তেমনি সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে ‘ভেরি ডেমুর, ভেরি মাইন্ডফুল’ শব্দবন্ধ দিয়ে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝড় তুলেছেন রূপান্তরকামী টিকটকার জুলস লেব্রন। শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীই নন, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রিয় তারকা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও ব্যবহার করতে শুরু করে এটি। তবে এই দুই ভাইরাল ট্রেন্ডের তুমুল জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে আছে দুটি ভিন্ন জীবনের গল্প।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রাগ করলা, কথাটা ঠিক না বেঠিক?’ সংলাপটি হাস্যরস, মিম ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভাইরাল ভিডিওটিতে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কের পাশে এক যুবকের ভাগ্য গণনা করছেন এক কবিরাজ, যার প্রতিটি বাক্যের শেষে ‘রাগ করলা?’ বলার ভঙ্গিটি নেটিজেনদের নজর কাড়ে।
শুরুতে অনেকে তাকে আসল কবিরাজ ভাবলেও জানা গেছে, ভাইরাল হওয়া এই ব্যক্তির নাম ঈমান আলী। প্রায় ২৫ বছর আগে লালমনিরহাট থেকে গাজীপুরে আসা ঈমান আলী মূলত একজন পেশাদার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভিনেতা। একটি ইউটিউব কনটেন্টের জন্য করা তার এই কবিরাজ চরিত্রের অভিনয় রাতারাতি লুফে নেয় নেটিজেনরা। এই দেশীয় সংলাপের জনপ্রিয়তা এতটাই ছড়িয়েছে, খোদ বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফিফা’ তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ব্রাজিলের তারকা ফুটবলারের ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লিখেছে, ‘কী প্রতিপক্ষ, রাগ করলা?’
ঠিক একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী টিকটকার জুলস লেব্রন তার কর্মক্ষেত্রের বিরতিতে গাড়িতে বসে একটি সাধারণ ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। হালকা মেকআপ নিয়ে করা সেই ভিডিওতে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘ভেরি ডেমুর, ভেরি মাইন্ডফুল’ (খুবই নম্র, খুবই সচেতন)। ভিডিওটি আপলোড করার পর রিফ্রেশ করতেই লাখ লাখ ভিউ ও মন্তব্যের ঝড় ওঠে, যা লেব্রনকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়।
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এই সংলাপ টিকটক পেরিয়ে মার্কিন প্রশাসনের হোয়াইট হাউস এবং মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টেও জায়গা করে নেয়। নাসা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর ছবি দিয়ে লেখে, পৃথিবী দেখতে ‘ভেরি ডেমুর, ভেরি মাইন্ডফুল’। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অ্যাকাউন্ট থেকে এবং তারকা খলোয়ি কার্দাশিয়ানের মেকআপ ভিডিওতেও এই সংলাপ ব্যবহার করা হয়।
তবে ‘ভেরি ডেমুর’ ট্রেন্ডের মাধ্যমে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়া জুলস লেব্রনের ক্যামেরার পেছনের বাস্তব জীবন ছিল অত্যন্ত ট্রাজিক ও অন্ধকার। ২০ বছর বয়সের শুরুতে লিঙ্গ রূপান্তরের (ট্রান্সজিশন) পর ইউটিউবে মেকআপ টিউটোরিয়াল ও নিজের সংগ্রামের গল্প বলে ১০ লাখ সাবস্ক্রাইবার পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আরেক ইনফ্লুয়েন্সার প্যাট্রিক স্টারের সাথে দ্বন্দ্বের জেরে তিনি ব্র্যান্ড চুক্তি হারান এবং তীব্র কোকেন আসক্তিতে জড়িয়ে পড়েন। ক্যারিয়ার ধ্বংসের পর তিনি গ্ল্যামার দুনিয়া ছেড়ে একটি সুপারমার্কেটে তাক সাজানোর সাধারণ চাকরি নেন। আর সেই সাধারণ চাকরি করার সময়ই আকস্মিকভাবে ‘ডেমুর’ ভিডিওটি ভাইরাল হয়।
ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডগুলোর প্রচারণার জন্য লেব্রনকে টানা ১০-১১ সপ্তাহ হোটেলেই কাটাতে হয়, অংশ নেন ‘জিমি কিমেল লাইভ!’ শো-তেও। কিন্তু পর্দার আড়ালে তীব্র মানসিক চাপ ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরপরই ইন্টারনেটে পরিচিত হওয়া এক ব্যক্তির দ্বারা তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু খ্যাতির জোয়ারে তার ব্যস্ত শিডিউল থামানোর মতো কেউ ছিল না। ফলে একাকীত্ব ও ট্রমা থেকে তিনি আবারও মাদকের অন্ধকারে ডুবে যান।
এমনকি ২০২৪ সালের মিলান ফ্যাশন উইকে যখন লাক্সারি ব্র্যান্ড ‘বত্তেগা ভেনেতা’র হয়ে সেলিব্রিটিদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, ঠিক মেকআপের সময় তার প্রাক্তন বাগদত্তা ফোন করে জানান যে তার পোষা কুকুরটিকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। চোখের জল মুছে ইভেন্টে গিয়ে মডেল কেন্ডাল জেনারের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে চরম উপেক্ষার শিকার হয়ে কেঁদে ফেলেন লেব্রন। হোটেল রুমে ফিরে তীব্র যন্ত্রণায় আবারও ড্রাগস খুঁজছিলেন তিনি। অতিরিক্ত মাদক সেবনে মৃত্যুর চিন্তাও তার মাথায় এসেছিল।
অন্ধকার সময়ের মধ্যেও লেব্রন তার বড় পুয়ের্তো রিকান পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ঠাকুরমার চিকিৎসার খরচ, বাবার রান্নাঘর সংস্কার ও ভাইয়ের ঋণ শোধ করেছেন তিনি। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর একপর্যায়ে আয় কমে গেলে তিনি তার কর্মচারীদের ছাঁটাই করতে বাধ্য হন এবং এক চরম হতাশা থেকে ‘ডেমুর’ শব্দটিকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করেন।
অবশেষে নিজের জীবনের এই বিশৃঙ্খলা ও মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পেতে মায়ের কাছে থেরাপির সাহায্য চান লেব্রন। বর্তমানে একটি স্থায়ী আবাসন ও থেরাপির মাধ্যমে তিনি সুস্থ জীবনে ফেরার লড়াই করছেন। জিম করা, চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার ভিডিও এখন তিনি আপলোড করছেন। বর্তমানে ৩২ বছর বয়সী এই পুয়ের্তো রিকান রূপান্তরকামী নারী নিজেকে শুধু একটি ‘মিম’ বা ‘মেমে’র ফ্রেমে বন্দি না রেখে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরছেন।