আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন খাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা বাড়ালেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে সাইবার নিরাপত্তা (সাইবার সিকিউরিটি) খাতে। এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ ও তথ্য সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে এখন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ছে। শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো এই খাতের যোগ্য প্রার্থীদের আকৃষ্ট করতে লাখ লাখ ডলারের লোভনীয় বেতন প্যাকেজ অফার করছে।
ফরচুন ১০০ কোম্পানির জন্য সাইবার নিরাপত্তা খাতের শীর্ষ নির্বাহী খুঁজে দেওয়ার কাজ করে ‘হেইড্রিক অ্যান্ড স্ট্রাগলস’ নামের একটি এক্সিকিউটিভ ট্যালেন্ট ফার্ম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হেডহান্টার অস্টিন কাওয়ান জানান, `এআই নিয়ে বাজারে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার কারণে কোম্পানিগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ খোঁজার হিড়িক পড়েছে। আগে যে ধরনের পদের জন্য ১২ মাসে একটি অনুরোধ আসত, এখন প্রতি সপ্তাহে তেমন পদের জন্য অনুরোধ আসছে।
জব সার্চ প্ল্যাটফর্ম গ্লাসডোরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাসে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত চাকরির বিজ্ঞাপন আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে সিকিউরিটি এক্সিকিউটিভদের খোঁজার দায়িত্ব পাওয়া হিচ পার্টনার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং পার্টনার মাইকেল পিয়াসেন্তে জানান,‘গত বছরের শরতের তুলনায় বর্তমানে এই ধরনের অনুরোধ পাঁচ থেকে সাত গুণ বেড়েছে। যোগ্য প্রার্থীর অভাবে তারা অনেক ক্লায়েন্টের কাজ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘প্রযুক্তি কর্মীরা এখন কোড লেখার জন্য এআই-এর সাহায্য নিচ্ছেন, যা অনেক সময় সিস্টেমে ত্রুটি বা ‘বাগ’ তৈরি করছে। এছাড়া অ্যানথ্রোপিকের ‘মিথোস’ এবং ওপেনএআই-এর ‘জিপিটি-৫.৪-সাইবার’-এর মতো অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলো সফটওয়্যারের ত্রুটি খুঁজে বের করে সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে-এমন সতর্কবার্তার পর বিশ্বজুড়ে এই তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
লিংকডইনের চিফ ইনফরমেশন সিকিউরিটি অফিসার লি কিসনার এই পরিস্থিতিকে সফটওয়্যার ত্রুটির মহাবিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
চাহিদা তুঙ্গে থাকায় এই খাতের শীর্ষ কর্মীরা এখন বেতন নিয়ে দরকষাকষির ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। অস্টিন কাওয়ান জানান, ‘বর্তমানে সিকিউরিটি এক্সিকিউটিভদের জন্য ৭০ থেকে ৮০ লাখ ডলারের (প্রায় ৭-৮ মিলিয়ন ডলার) বেতন প্যাকেজ সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনাতীত ছিল। যদিও শীর্ষ এআই গবেষকদের ২৫ কোটি ডলারের প্যাকেজের তুলনায় এটি কম, তবুও সাইবার নিরাপত্তা খাতে এটি একটি বড় লাফ।
অবশ্য শুধু সাইবার নিরাপত্তা নয়, প্রাইভেট ইকুইটি, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং স্বয়ং এআই ইন্ডাস্ট্রিতেও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। লিংকডইনের তথ্যমতে, নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য এখন দ্রুততম বর্ধনশীল পদের নাম ‘এআই ইঞ্জিনিয়ার’।
গুগলের নলেজ অ্যান্ড ইনফরমেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নিক ফক্স জানান, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের পরিধি এখন ‘এআই এজেন্ট’ বা বট ব্যবস্থাপনার দিকে মোড় নিচ্ছে, তবে তাদের চাকরি হারিয়ে যাচ্ছে না।
অভিজ্ঞ সাইবার সিকিউরিটি ইঞ্জিনিয়ার ব্রায়ান গাউডেন্টি মনে করেন, কর্মীদের টিকে থাকতে হলে এআই-এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। তিনি নিজে ‘ভাইবকোর্ডিং’ বা এআই দিয়ে কোড লেখার কৌশল আয়ত্ত করে সম্প্রতি একটি এআই স্টার্টআপে চাকরি পেয়েছেন।
তবে সাইবার নিরাপত্তা খাতের এই নিয়োগের জোয়ার প্রযুক্তি শিল্পের সামগ্রিক কর্মী ছাঁটাইয়ের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নিতে পারছে না। এআই খাতে খরচ বাড়াতে সম্প্রতি মেটা তাদের ১০ শতাংশ কর্মী (প্রায় ৮ হাজার জন) ছাঁটাই করেছে। এছাড়া আমাজন ১৬ হাজার কর্মী এবং স্ট্রাইপ, স্ন্যাপ ও ব্লকের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস