গত বছরের অক্টোবরে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন। ক্রিকেট বোর্ডের সেই নির্বাচনে সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে ১৬ ক্লাবের কাউন্সিলররা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বর্তমান কমিটির অধীনে সব ধরনের ঘরোয়া ক্রিকেট বয়কট করেছিল ঢাকার ৪৫টি ক্লাব। যার সুরাহা এখনও করতে পারেনি বিসিবি।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। বিসিবির নির্বাচন ও বর্তমান কমিটির বৈধতা নিয়ে আগে থেকেই সমালোচনা করে আসছিলেন দেশের এই কিংবদন্তি গোলরক্ষক। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই তিনি বিসিবির গত নির্বাচনকে 'প্রশ্নবিদ্ধ' বলে আখ্যা দিলেন।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন আমিনুল। শপথ গ্রহণ শেষে সন্ধ্যায় মিরপুরের নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে দেশের ক্রীড়াঙ্গন, বিশেষ করে ক্রিকেট বোর্ডের বর্তমান পরিস্থিতি ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়া নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেন তিনি।
বিসিবি নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নে আমিনুল বলেন, ‘ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচন নিয়ে আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচন হয়েছে। বিষয়গুলো যেহেতু আইসিসির নিয়মের অধীন, তাদের বিধি-বিধান অনুসারে আমি তাদের সঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করব, কীভাবে আমরা ভালো একটি পর্যায়ে যেতে পারি। তাদের সঙ্গে বসা এবং পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব।’
আমিনুলের বক্তব্যে বিসিবিতে যখন পরিবর্তনের হাওয়ার সুর, তার আগের দিনই পারিবারিক কারণ দেখিয়ে দেশ ছাড়েন বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন বলে নিশ্চিত করেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন। যদিও সপ্তাহখানেকের মধ্যেই দেশে ফিরবেন বলে বোর্ড পরিচালকদের জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, গত ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ক্রীড়া সাংবাদিকদের প্রবেশে বেশকিছু বিধিনিষেধ দিয়ে দেয় বিসিবি। এখন কেবল বিসিবি ডাকলেই বিসিবির ভেতরে যেতে পারবেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা। এমন ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনার ঝড় ওঠে। সব মিলিয়ে গত কয়েক দিনের ঘটনায় বিসিবি এবং ক্রীড়া সাংবাদিক যেন একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিল।
তবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই বিসিবিতে সাংবাদিকদের ঢোকার পথ সুগম করে দিলেন। সংবাদ সম্মেলনে বসেই বিসিবির সিইও নিজামউদ্দীন চৌধুরী সুজনকে ফোন করেন আমিনুল। ফোনে আমিনুল বলেন, ‘সুজন ভাই, আগামীকাল থেকে আমাদের ক্রিকেট বোর্ডে যে নিরাপত্তা ইস্যুতে যে আমাদের ক্রীড়া সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয় না, এটা উঠায়ে ফেলেন। কালকে থেকে ক্রীড়া সাংবাদিকরা অবাধে যাবে, সুন্দরভাবে কাজ করবে, তাদেরকে যেন কোনো বাঁধা কেউ না দেয়।’
এছাড়া এর আগে সাংবাদিকদের বিসিবিতে প্রবেশাধিকার সীমিত প্রসঙ্গে আমিনুল বলেছেন, ‘আমি আসলে নিজেই জানি না যে কেন আপনাদেরকে ঢুকতে দেয় না, আমার নিজেরই জানা নেই এটা। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আগামীকাল থেকে আপনারা স্টেডিয়ামে যাবেন, আপনারা নির্বিঘ্নে আপনাদের কাজ করবেন, সেখানে কেউ বাঁধা প্রদান করবেন না। আমরা ছোটবেলা থেকে যখন খেলাধুলা করেছি, (তখন থেকে মনে করি) সাংবাদিকরা হচ্ছে খেলোয়াড়দের প্রাণ। সাংবাদিকদের মাধ্যমেই কিন্তু একটি খেলোয়াড়কে উৎসাহিত করা যায়, যে ভালো খেলে তাকে উৎসাহিত করা, যে খারাপ খেলে তার সমালোচনা করা সম্ভব। আপনারা যারা ক্রীড়া সাংবাদিক, আপনারা যদি চোখে না দেখে, যদি কিছু লিখতে না পারেন, তাহলে খেলোয়াড়দের নিয়ে কী মন্তব্য করবেন?’
আমিনুল আরও বলেছেন, ‘এখন আমি ক্রিকেট বোর্ডের সিইওকে বলে দিচ্ছি, যাতে কালকে থেকে (স্টেডিয়াম) উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, আপনারা ক্রিকেট বোর্ডে যাবেন, এটা আপনাদের, আপনারা স্বাচ্ছন্দ্যে, স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, সেখানে আপনাদেরকে কেউ বাঁধা প্রদান করবে না। আমিও আশা করব, আমাদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আপনাদের কাছ থেকেও কিন্তু সার্বিক সহযোগিতা আমি চাই।’
আমিনুল আরও বলেছেন, ‘আজকের পর থেকে (বিসিবিতে সাংবাদিকদের প্রবেশে) কোনো কঠোরতা থাকবে না। কারণ সাংবাদিকরা যেভাবে (তাদের) লেখনীর মাধ্যমে খেলাধুলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান, আমি মনে করি আপনাদের সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই আগামীর ক্রীড়াঙ্গনকে গড়ে তুলতে চাই। সেখানে কোনো বাঁধা আজকের পর থেকে ইনশাআল্লাহ থাকবে না।’
এছাড়া সাংবাদিকদের পরামর্শ, আলাপ নিয়েই সামনে আগাতে চান জানিয়ে আমিনুল বলেছেন, ‘আমি আগামী কিছু দিনের মধ্যেই সেক্টর ওয়াইজ সব ফেডারেশনের সাথে বসব। সবার আগে আপনাদের সাথে বসব। আপনারা যারা ক্রীড়া সাংবাদিক রয়েছেন, আপনাদের ভেতর থেকে হয়ত কাউকে কাউকে দায়িত্ব দিব, আল্লাহর রহমতে আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে দীর্ঘ যে যাত্রা রয়েছে সেখানে যেন আমার সাথে কাজ করতে পারেন। খেলাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আপনাদের সবার যে পরামর্শ, চিন্তাভাবনা রয়েছে সবকিছুকে একত্রিত করে সামনে এগিয়ে যাব।’
এদিকে, মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার পর নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। এরপর আইসিসির সিদ্ধান্তে বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়ার পর থেকেই বিসিবিতে অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে। একদিকে বোর্ড পরিচালকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বোর্ডের বৈরী সম্পর্ক— সব মিলিয়ে এক নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যা বা কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আমিনুল জানান নিজের মতামত, 'আমি দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ভারতের ডেপুটি হাই কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেছি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের কথা বলেছি। আমরা চাই, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে।'
ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিকীকরণ না করারও ঘোষণা দিয়েছেন নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, ‘একদিনেই সব পরিবর্তন করতে পারব না, এটি সম্ভবও না। সংস্কারের জন্য লম্বা সময়ের চর্চা প্রয়োজন। আমি নিশ্চিত করতে চাই খেলাকে রাজনীতিকীকরণ করা কিংবা কোনো দলের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে না। যারা সত্যিকারভাবে খেলাকে ভালোবাসে ও স্পোর্টিং কমিউনিটির উচিত তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা।’