‘হ্যারি কেইন সত্যিকারের ভদ্রলোক।’
কথাটা ব্যালন ডি’অরের লাল গালিচা সংবর্ধনায় এক সঞ্চালকের। হ্যারি কেইনের ছোট্ট সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর তাঁর উপলব্ধি। পাশে মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়ানো ইতালিয়ান সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানো মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিলেন। কেইন কতটা ভদ্রলোক, সেটা প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ব্যালন ডি’অরের শেষ ট্রফিটা দেওয়ার পর বোঝা গেল আরও ভালোভাবে।
না, লামিনে ইয়ামাল কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পে ট্রফিটি জেতার পর কেইন ভীষণ ভদ্রতা দেখিয়েছেন, তেমন নয় ব্যাপারটা। ব্যক্তিগত পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের আরাধ্য ওই ট্রফিটি উঠেছে কেইনের হাতেই। তারপর মাইক্রোফোনের সামনে তাঁর বলা কথাগুলোয় ভদ্রতা যেন ঠিকরে বেরোল!
কেইনের ক্যারিয়ারকে ফ্লাশব্যাক করে দেখলে সেটা ধরতে পারা সহজ। ২০২৩ সালে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার আগে ১৯ বছর ছিলেন টটেনহাম হটস্পারে। ইংল্যান্ডে আর কোনো ক্লাবে যোগ দেবেন না এবং বড় কিছু জেতার জন্য জন্মভূমি ছেড়ে গেলেন জার্মানি। সেখানে এই তিন বছরে রেকর্ডের পর রেকর্ড ভেঙে কেইন যখন ফিরলেন লন্ডনে, তাঁর হাতে ব্যালন ডি’অর ট্রফি আর ইংরেজদের চোখে ২৫ বছরের অপেক্ষা ঘোচার আনন্দশ্রু। ওদিকে বিজয় মঞ্চে কেইনের কণ্ঠে টটেনহামের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যতগুলো কোচের অধীনে খেলেছেন, নাম উল্লেখ করলেন সবার। দিলেন ধন্যবাদও।
সেটা ইংরেজদের দেওয়ার কথা কেইনকেও। মাইকেল ওয়েন যে বছর ব্যালন ডি’অর জিতলেন, কেইন তখন আটে পড়েছেন। আর্সেনালের বয়সভিত্তিক দলে ছিলেন। একটু ‘মোটাসোটা’ আর ‘অ্যাথলেটিক নয়’ বলে তাঁকে ছেড়েও দেওয়া হয়। কে জানত, সেই ছেলেটিই ধীরে ধীরে এতটা বেড়ে ইংল্যান্ডের ২৫ বছরের অপেক্ষা ঘোচাবেন! ২০০১ সালে ওয়েনের পর ইংল্যান্ডের প্রথম ব্যালন ডি’অর বিজয়ী। কেইন অভিবাদন পেলেন মঞ্চেই। সঞ্চালক ও ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি তাঁকে দেখিয়ে বললেন,‘পরিশ্রম ও প্রতিভার সম্মিলনে নিখুঁত উদাহরণ।’
অথচ এই কেইনই টটেনহামে থাকতে হর-হামেশা শুনেছেন ‘লুজার! লুজার!’ কিন্তু বাতাস চিরকাল এক দিকে বয়ে চলে না। গত মৌসুমে ইংল্যান্ড ও বায়ার্নের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোলে ঘটে চূড়ান্ত হাওয়া-বদল। পঞ্চম ইংরেজ হিসেবে কেইনের হাতে ব্যালন ডি’অর সেই বদলেরই প্রমাণ। স্যার স্ট্যানলি ম্যাথুস, ববি চার্লটন, কেভিন কিগান ও মাইকেল ওয়েনের পর কেইন। লাল গালিচার সঞ্চালকরা অনুষ্ঠান শুরুর সময়ই বলাবলি করছিলেন,‘কেইন জিতলে কিন্তু স্যার হ্যারি কেইন!’
এখন বোধ হয় সেটাও ঘটবে। কিংবা একটু সময় নিয়ে হয়তো উদ্যাপনটা শেষ করে। আনুষ্ঠানিকভাবে যখনই হোক, কেইন এখনই যে কোনো কোনো ইংরেজের হৃদয়ে ‘নাইট’ কিংবা ‘স্যার’ উপাধি পেয়ে গেছেন, তা নিশ্চিত।
ওদিকে মঞ্চে কেইনের ভদ্রতায় কোনো বিকার নেই। পরিবার ও বন্ধুদের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা এমনিতেই কঠিন। ক্যারিয়ারে তাঁদের অবদানের কথা বলতে গিয়ে কেইনের গলাটা একটু ধরে এসেছিল। কিন্তু চোখের পানিতে নিটোল ভদ্রতাটুকুর সৌন্দর্ নষ্ট করার মতো বেরসিক ইংরেজ কেইন নন। বরং ৩৩ বছরের পরিপক্ক মানসিকতায় পা দুটো রইল মাটিতেই,‘অনেকেই এটা ভাবেননি। এমনকি আমিও ভাবিনি যে এতটা পথ আসতে পারব। অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতে। এখানে (কক্ষে) কয়েকজনের মতো একদিন সুপারস্টার হবো, তেমন মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না।’
কেইন এরপর বললেন আসল কথাটা,‘সময় লেগেছে। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেক সময় নিজেই নিজের বিপক্ষে চলে গিয়েও বিশ্বাসটা ধরে রাখতে হয়েছে।’
ভোটদাতা থেকে শুরু করে ভক্ত, প্রতিদ্বন্দ্বী, সতীর্থসহ প্রায় সবাইকেই ধন্যবাদ জানান কেইন। বোঝা গেল, গোল পোস্টের সামনে যতটা নির্মম, স্বীকৃতির ভারে ততটাই বিনয়ী। অথচ ধন্যবাদ সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য ছিল তাঁর। চেষ্টা ও মেধার সম্মিলনে সাধারণ থেকে এতটা উঁচুতে ওঠা যায় যে, শুধু মেসি ছাড়া ইউরোপে শীর্ষ পাঁচ লিগে আর কেউ কেইনের মতো এক মৌসুমে এত (গত মৌসুম) গোল করতে পারেনি।
২০১৭ ফিফা বেস্ট অ্যাওয়ার্ডের ভেন্যু ছিল এই প্যালাডিয়াম। সেদিন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমার, সের্হিও রামোসদের দূর থেকে দেখার মুহূর্তটি কি কেইনের মনে আছে? ফুটবলের অভিজাত কাতার থেকে একটু দূরে থাকার আক্ষেপটা স্পষ্ট ছিল তাঁর চোখেমুখে। ৯ বছর পর সেই একই জায়গায়, যেটা আবার কেইনের জন্মভূমি লেইটনস্টন থেকে মাত্র ৯ মাইল দূরে—কেইন বসলেন, লামিনে ইয়ামাল, রদ্রিদের কাতারে। একটু পর ব্যালন ডি’অর ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে ছাপিয়ে গেলেন সবাইকে।
তবু মাটিতেই পা রইল। আবেগের প্রকাশটা হলো তিন শব্দে,‘আমি প্রায় ভাষাহীন।’ তারপর ফিরল সেই চিরায়ত ভদ্রতাজ্ঞান,‘এখানে (কক্ষে) কিছু বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা আছে। মনোনয়নপ্রাপ্ত সবাই এবং বিজয়ীদের অভিনন্দন।’
কেইনের আগে মঞ্চ ছেড়ে যান স্পেনের মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস পুতেয়াস। নিজের তৃতীয় ব্যালন ডি’অর ট্রফিটা বুঝে নিতে ভুল করেননি। মেয়েদের ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ব্যালন ডি’অর জয়ে আইতানা বোনমাতির রেকর্ডে ভাগ বসালেন পুতেয়াস। টানা ষষ্ঠবার জিতে স্পেনও যেন এই ট্রফিটি ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ করে নিয়েছে।
স্পেনের প্রসঙ্গে বলতে হয় রাতটা কিন্তু শুধু কেইনের ছিল না। ব্যালন ডি’অরে এবারের রাতটা স্প্যানিশদেরও। আটটি ক্যাটাগরিতে ট্রফি গিয়েছে স্প্যানিশদের ঘরে। এর মধ্যে লামিনে ইয়ামালের হাতে সেরা উদীয়মান তরুণ খেলোয়াড়ের ট্রফিটি দেখে নিশ্চয়ই কারও কারও মনে কু-ডাক দিয়েছিল। বড়টা জিততে পারবে না বলেই হয়তো টানা তৃতীয়বারের মতো উদীয়মান ট্রফির সান্ত্বনা!

শেষ পর্যন্ত ঘটেছেও ঠিক তাই। তবে বুকায়ো সাকা যে অতিথিদের আবেগে ধাক্কা দেবেন তা জানা ছিল না অনেকেরই। মানবহিতকর কাজে অবদান রাখায় এবার সক্রেটিস ট্রফি তাঁর। মঞ্চে উঠে সাকা রুয়ান্ডার ১৪ বছর বয়সী এক শিশুর চিঠি পড়ে শোনান। তাঁর ইংরেজির শিক্ষক হওয়ার খুব স্বপ্ন। কিন্তু চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোর পথে ছিল। একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে শিশুটির দৃষ্টি ফেরায় অবদান রাখেন সাকা।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ছেলেদের সেরা কোচের ট্রফি নেওয়ার সময় তুমুল শীষের শব্দে মনে হলো, হার্টথ্রব কোনো নায়ক বুঝি মঞ্চে! বোঝা গেল, বিশ্বকাপ জেতার পর ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। ছেলেদের বর্ষসেরা ক্লাবের ট্রফি পিএসজির হয়ে নেন উসমান দেম্বেলে। ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৫৬ সালে স্ট্যানলি ম্যাথুসের প্রথম ট্রফি জয়ের ভিডিও ও স্টিল ছবি দেখানো হয়। কেইন তখনো জানতেন না, আর কিছুক্ষণ পরই তিনি হবেন সর্বশেষ!
ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও মঞ্চে তাঁর নাম ঘোষণার পর যখন জানলেন, ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রসিকতা শুরু হয়েছে। ব্যালন ডি’অর নাকি এরপর আর আয়োজন না করাই ভালো। কারণ তাতে ইংরেজরা বলতে পারবে, এই পুরস্কারের প্রথম ও শেষটি আমাদের!
কিন্তু কেইন ওদিকে মঞ্চ থেকে পুরস্কারটি জয়ের মন্ত্র শিখিয়ে দিলেন সবাইকে, ‘একাগ্রতা, বাধা ও আত্মবিশ্বাস থেকে শেখো। আমার চলার পথও সহজ ছিল না। সেরা হতে আমাকেও লড়তে হয়েছে। আশা করি এতে প্রেরণা পাবে।’
সে তো বটেই! ইংল্যান্ডে ফুটবলের জনপ্রিয়তা আরও এক ধাপ বাড়ল বলে!