Image description

ভক্ত-সমর্থকদের তারিফ করতেই হয়। দলের অবস্থা যেমনই হোক না কেন, তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় এতটুকু কমতি, ঘাটতি নেই।

যে দল জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ২০০ করতে পারেনি, সেই টাইগারদের নিয়েও সমর্থকদের রাজ্যের উৎসাহ। আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। জিম্বাবুয়েকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেওয়া আফগানিস্তানের সঙ্গে জয়ের আশায় টিভির সামনে বসে কোটি টাইগার সাপোর্টার।

বিজ্ঞাপন

শুধু জিতলেই চলবে না। ফাইনাল খেলতে একটা সমীকরণ আছে। যেকোনো রান করে আফগানদের বিপক্ষে অন্তত ৪১ রানে জিতলেই ফাইনাল খেলবে তাওহীদ হৃদয়ের দল। ভক্তরা সেই কাঙ্ক্ষিত জয়ের আশায় উন্মুখ হয়েই বসেছিলেন।

কিন্তু খেলা শুরুর পর যত সময় গড়ালো, ততই সেই প্রত্যাশার বেলুন চুপসে যেতে থাকল। কথায় বলে, ‘স্বপ্ন দেখা ভালো। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে বাস করা ভালো না।’

বিজ্ঞাপন

এই প্রবচনটি বোধকরি আজ ২১ অক্টোবর শারজাহর মাঠে আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ম্যাচে খুব প্রযোজ্য। এই আফগানিস্তানের সঙ্গে গত ২ বছর আরব আমিরাতের মাটিতে ২ সিরিজে হেরেছে বাংলাদেশ। ৬ ম্যাচে টাইগারদের জয় মোটে একটি। আফগানদের জয় ৫টিতে। সেই আরব আমিরাতের মাটিতে আফগানদের হারানো বহুদূরে, বাংলাদেশের ব্যাটাররা তো ব্যাট করতে আর রান করতেই গেছেন ভুলে।

দলে পরিবর্তন আনা হলো। উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান নুরুল হাসান সোহান, স্পিনিং অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত আর লেগস্পিনার রিশাদ হোসেনকে বাদ দিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ, পারভেজ হোসেন ইমন আর ‘মিস্ট্রি’ স্পিনার আলিস আল ইসলামকে দলে নেওয়া হয়েছে।

যারা এসেছেন, তাদের মধ্যে পারভেজ হোসেন ইমনই শুধু কাজের কাজ করেছেন। দলের সর্বোচ্চ স্কোরার এই বাঁহাতি। আর দলে ফিরে মিরাজ যথারীতি ব্যর্থ। ১ রানে আউট।

বিজ্ঞাপন

ওপরে সাইফ হাসান ছাড়া সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান তামিম, নাজমুল হোসেন শান্ত আর অধিনায়ক হৃদয়ও ব্যর্থতার মিছিলে অংশ নিয়েছেন।

এ আসরের প্রথম ২ খেলায় যে দল আগে ব্যাট করেছে, সেই দল অন্তত ২৭০+ রান করেছে। এবং জিতেছেও। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে আগে ব্যাট করার সুযোগ পায়নি। আজ টস জয়ে প্রথম ব্যাটিংয়ের সুযোগ এল। কিন্তু ব্যাটিংয়ের চালচিত্র বদলাল না একচুলও।

বিজ্ঞাপন

 

 

 

প্রথম দিন জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ১৭২ করা হৃদয়ের দল আজ আফগানিস্তানের সঙ্গে থামল ১৬০ রানে। আগের ২ ম্যাচে যে দলের একটি পার্টনারশিপ বড় হয়েছে, তারাই জিতেছে। প্রথম দিন ২ জিম্বাবুয়ান ব্রেন্ডন টেলর আর ক্রেইগ আরভিন দেড়শ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে জিম্বাবুয়েকে ২৭১ রানের বড় পুঁজি গড়ে দিয়েছিলেন। আর জিম্বাবুয়ের সঙ্গে দুই আফগান টপ অর্ডার ইব্রাহিম জাদরান ও সেদিকুল্লাহ আতালের ১৪০ রানের পার্টনারশিপে আফগানিস্তান ৩০০-র খুব কাছে পৌঁছে বড় জয়ে মাঠ ছেড়েছিল।

কিন্তু হায়, আজ বুধবার শারজায় অমন একটি জুটিও তৈরি করতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। দুই ওপেনার তানজিদ তামিম (১) আর সৌম্য সরকার (০) ফিরে গেলেন শুরুতেই। দিনের দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে পরপর ২ উইকেট খুইয়ে ব্যাকফুটে বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত আর সেই বিপর্যয় কাটিয়ে সামনে আসা সম্ভব হয়নি।

নবীন আফগান পেসার ইয়ামিন আহমেদজাইয়ের অফস্টাম্পের ঠিক বাইরের বলে আউট হলেন দুই বাঁহাতি তানজিদ তামিম আর সৌম্য সরকার। তানজিদ অফস্টাম্পের বাইরে পড়ে বেরিয়ে যাওয়া বলে ব্যাট পেতে হন কট বিহাইন্ড। ফর্মহীন সৌম্য উইকেটে এসে জায়গায় দাঁড়িয়ে অফস্টাম্পের বাইরের বলকে কাট করতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনলেন। বল ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে উইকেটে গিয়ে আঘাত হানল।

বিজ্ঞাপন

বাঁহাতি শান্ত আর অধিনায়ক হৃদয় আউট হলেন আরেক পেসার ওমরজাইয়ের বলে। শান্তও অফস্টাম্পের ঠিক বাইরের বলে খেলব না, খেলব না করে ব্যাট পেতে হলেন কট বিহাইন্ড। আগের ম্যাচে লেগস্টাম্প সোজা ডেলিভারিকে অনসাইডে ঘোরাতে গিয়ে লেগবিফোর হওয়া অধিনায়ক হৃদয় আজও লেগস্টাম্প সোজা বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে ফিরে এসেছেন।

তামিম, সৌম্য, শান্ত ও হৃদয় যে বলে আউট হয়েছেন, তার একটিও উইকেট পতনের ডেলিভারি ছিল না। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ভুল খেলে উইকেট দিয়ে চলে এসেছেন।

যে ম্যাচে শুধু জয়ই নয়, অনেক হিসাব-নিকাশ করে তবে জিততে হবে, সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রথম ৪ জন যখন নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য ঠাওরে উঠতে পারেন না। কোন বল ছাড়বেন, কোন বল কোথায় মারবেন; বুঝে উঠতে সমস্যা হয়, সেই দলের ওই ম্যাচে ভাগ্যবিপর্যয় ছাড়া আর কী হতে পারে?

বিজ্ঞাপন

অনেকেই সৌম্যকে দুষছেন। সৌম্যকে একা দোষ দিয়ে কী লাভ? মোসাদ্দেকের বদলে মিরাজকে নেওয়া হলো, মিরাজও উইকেটে এসে একটা মাঝারি গতির খাটো লেন্থের বলকে পুল করে ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ক্যাচ তুলে দিয়ে এলেন। ২৮ রানে ৪ উইকেট পতনের পর সাইফ হাসান আর এ ম্যাচে দলে ফেরা পারভেজ ইমন পঞ্চম উইকেটে খানিকটা দায়িত্ব নিয়ে কিছুটা সময় দেখে খেলেছেন। একসময় মনে হলো দুজনই সেট হয়ে গেছেন।

কিন্তু ঠিক ওই সময়ই ধৈর্যচ্যুতি ঘটল সাইফ হাসানের। ৮২ বলে ৪১ করে হঠাৎ সাইফের মনে হলো মোহাম্মদ নবীকে ছক্কা হাঁকাই। আর সেটাই কাল হলো। ছক্কার বদলে বল তার ব্যাটের বাইরের কোনায় ওপরের দিকে লেগে আকাশে উঠে গেল। এরপর পারভেজ ইমন একা হয়ে পড়লেন। ৯৬ বলে ৭০ রানে রশিদ খানের বুদ্ধিদীপ্ত ডেলিভারিতে ব্যাট ও প্যাডের ফাঁক গলে লেগবিফোর হলেন ইমন। ৯৩ রানের পার্টনারশিপ ভাঙার পর বালির বাঁধের মতো ভাঙল লেট অর্ডার। শেষ ৪ উইকেট পড়ল ১৩ রানে।

বিজ্ঞাপন

এই হলো সংক্ষেপে বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার সাতকাহন। ভক্ত ও সমর্থকরা একে-ওকে দোষ দিয়ে নিজের রাগ-ক্ষোভ মেটাচ্ছেন। আসল কথা হলো, পুরো দলই খারাপ খেলছে। কারওই কনফিডেন্স নেই। দলকে টেনে তোলার মতো অবস্থায় নেই একজন ব্যাটারও। তাদের কনফিডেন্স লেভেল নিচে নামতে নামতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। জিম্বাবুয়ে আর আফগান পেসার ও স্পিনারদের বিপক্ষেও করণীয় ঠাওরে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছেন সবাই।

কে জানে, এই তলানি থেকে ওপরে ওঠার পথ কী? কেউ কেউ কোচদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। তাদের জন্য বলা, যারা খারাপ খেলছেন, ব্যাটিং ভুলে গেছেন, তারা কেউ কচি খোকা নন যে শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়া যাবে। সবাই অনেকটা বছর খেলে ফেলেছেন। তাদের আর কোচ বদলে কিছু হবে না। হয় আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর দাওয়াই দিতে হবে। না হয় নতুনদের সুযোগ দিতে হবে।

তারপরও সৌম্য সরকারের কথা না বললেই নয়। সৌম্যকে ঢের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনোই উন্নতি নেই। সৌম্যর বদলে জাওয়াদ আবরার, হাবিবুর রহমান সোহান আর আজিজুল হাকিম তামিমকে সুযোগ দেওয়ার সময় এসে গেছে। মিরাজ আর মোসাদ্দেকের অবস্থাও কিন্তু ভালো না। তাদের বিকল্প খোঁজার সময়ও কিন্তু এসে গেছে।