Image description

ঘড়ির কাঁটা চলছে। পৃথিবীও চলছে। শুধু নরওয়ে যেন থেমে গেছে। অসলোর যে রাস্তায় কিছুক্ষণ আগেও গাড়ির ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন অদ্ভুত নীরবতা। রেস্তোরাঁর কর্মীরা কাজের ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছেন টেলিভিশনের সামনে। 

Advertisement

কোনো হাসপাতালের অপেক্ষাকক্ষে রোগীর স্বজনদের চোখও টিভির পর্দায়। কেউ বাড়িতে, কিংবা বড় পর্দার সামনে। সুযোগ পেলেই মোবাইল ফোনে স্কোর দেখে নিচ্ছেন কেউ।

মাঠে নেমেছে নরওয়ে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আসা দেশটির কাছে শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরেছে নরওয়ে। একটি প্রজন্ম বড় হয়েছে শুধু পুরোনো বিশ্বকাপের গল্প শুনে। আরেকটি প্রজন্ম অপেক্ষা করেছে বছরের পর বছর। এবার সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে। বিশ্বকাপের মাঠে আবার উড়েছে লাল-সাদা-নীল পতাকা।

ফুটবল তখন আর শুধু খেলা থাকে না। ৯০ মিনিটের জন্য সেটি হয়ে ওঠে একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্মিলিত অনুভূতি। একই সময়ে লাখো মানুষ তাকিয়ে থাকে একই দিকে। একই পাসে উত্তেজিত হয়। একই শটে বুক কেঁপে ওঠে। একই গোলে অচেনা মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্য সব সময় স্টেডিয়ামের ভেতরে দেখা যায় না। কখনো দেখা যায় হাজার কিলোমিটার দূরের অসলোর ফাঁকা রাস্তায়। কোনো ছোট শহরের ক্যাফেতে। হাসপাতালের করিডরে। কর্মস্থলের বিশ্রামকক্ষে। কিংবা একটি ঘরে, যেখানে তিন প্রজন্মের মানুষ পাশাপাশি বসে একটি বলের গতিপথ দেখছে। বয়স্ক মানুষটি এখনো মনে রেখেছেন ১৯৯৮ সালের সেই বিশ্বকাপ। 

ব্রাজিলকে হারানোর অবিশ্বাস্য রাত। পাশে বসা তার সন্তান তখন ছিল শিশু। নাতি প্রথমবার দেখছে নিজের দেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে। টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে তিনটি প্রজন্ম। তাদের বয়স আর স্মৃতি আলাদা। স্বপ্ন একটাই নরওয়ে।

ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই বদলে যায় দেশের দৈনন্দিন জীবন। অফিসে কাজের ফাঁকে আলোচনা হয় সম্ভাব্য একাদশ নিয়ে। শিশুরা গায়ে জড়ায় জাতীয় দলের জার্সি। জানালায় ঝোলে পতাকা। শহরের বড় পর্দার সামনে জমতে থাকে মানুষ।

সবার মুখে একটি নাম হলান্ড।

ক্লাব ফুটবলে গোলের পর গোল করা সেই ভয়ংকর স্ট্রাইকার একটি দেশের স্বপ্নের সবচেয়ে বড় প্রতীক। তার প্দৌড়ের সঙ্গে দৌড়ায় নরওয়ের আশা। বল পেলে টেলিভিশনের সামনে একটু এগিয়ে বসে পুরো দেশ। প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকলে একই সঙ্গে নিঃশ্বাস আটকে যায় লাখো মানুষের।

তারপর বাঁশি বাজে। বন্ধ হয়ে যায় পৃথিবীর বাকি সব শব্দ। বল গড়িয়ে চলে সবুজ মাঠে। সঙ্গে ছুটতে থাকে একটি দেশের ২৮ বছরের অপেক্ষা। হলান্ড প্রতিপক্ষের বক্সের দিকে এগিয়ে গেলে  অসলোর কোনো বাড়ির সোফা থেকে উঠে দাঁড়ান বৃদ্ধ বাবা। ক্যাফেতে কাপ হাতে স্থির হয়ে যান কেউ। মোবাইলের ছোট পর্দায় চোখ আটকে যায় পথচারীর। শটটি গোল হলে একটি দেশ বিস্ফোরিত হয় আনন্দে।

এক মুহূর্ত আগেও যারা একে অন্যকে চিনতেন না, তারা জড়িয়ে ধরেন। জানালা খুলে চিৎকার করেন মানুষ। পতাকা উড়তে থাকে। কোনো শিশু বাবার কাঁধে উঠে নাচে। কোনো বৃদ্ধের চোখে জল আসে। গোলটি তখন স্কোরবোর্ডের সংখ্যা নয়,হয়ে ওঠে ২৮ বছরের অপেক্ষার উত্তর।

বিশ্বকাপে নরওয়ে একের পর এক বাধা পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। প্রতিটি জয়ের সঙ্গে স্বপ্নটি আরও বড় হয়েছে। দেশটি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল এই গল্প আরও দূর যাবে।

কিন্তু ফুটবল সবচেয়ে বেশি নির্মম হয় তখনই, যখন স্বপ্ন সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে। একটি ভুল পাস। একটি অফসাইড। একটি পেনাল্টি। গোলবারে লেগে ফিরে আসা একটি বল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি মুহূর্ত চার বছরের অপেক্ষাকে শেষ করে দিতে পারে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ বাঁশি যখন বাজল, স্কোরবোর্ডে লেখা নরওয়ে ১-ইংল্যান্ড ২।

বিশ্বকাপের স্বপ্ন শেষ। কেউ নিঃশব্দে টেলিভিশন বন্ধ করে দিলেন। কোনো শিশু কাঁদল। কোনো বৃদ্ধ কিছুক্ষণ একই জায়গায় বসে রইলেন। খেলোয়াড়দের মতো দর্শকেরাও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সব শেষ।

ধীরে ধীরে আবার জীবন শুরু হলো।অসলোর রাস্তায় গাড়ি নামল। রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু হলো। মানুষ ফিরে গেল নিজের ব্যস্ততায়। সবকিছু আবার আগের মতো হয়ে যাবে।

২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ে একটি নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। হলান্ডের দল এমন একটি স্মৃতি তৈরি করেছে, হয়তো কোনো বাবা একদিন তার সন্তানকে বলবেন ২০২৬ সালে আমরা আবার বিশ্বকাপে ফিরেছিলাম। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম।

বিশ্বকাপ থেকে নরওয়ে বিদায় নিয়েছে। তবে একটি দেশের ফুটবল আবার জেগে উঠেছে।

পৃথিবী কোনো ফুটবল ম্যাচের জন্য থেমে থাকে না। সূর্য ওঠে, সময় চলে, জীবনও এগিয়ে যায়। বিশ্বকাপের সেই ৯০ মিনিটে নরওয়ের মানুষের কাছে মনে হয়েছিল সবকিছু সত্যিই থেমে গেছে।একটি বল গড়িয়ে যাচ্ছিল সবুজ মাঠে। তার পেছনে ছুটছিল একটি দেশের ২৮ বছরের স্বপ্ন।