Image description

ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ‘হেক্সা’ মানেই ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন যেন উল্টো দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ২০০২ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর কেটে গেছে ২৪ বছর। এরপর ছয়টি বিশ্বকাপে শিরোপার আশা নিয়ে মাঠে নামলেও প্রতিবারই বিদায় নিতে হয়েছে ইউরোপের কোনো না কোনো দলের কাছে। সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষে হারের মধ্য দিয়ে টানা ষষ্ঠবারের মতো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের কাছে নকআউট পর্বে হারল সেলেসাওরা। তাই অনেক সমর্থকের কাছে এটি যেন ব্রাজিলের 'অন্যরকম হেক্সা'।

২০০৬ বিশ্বকাপ: জিদানের জাদুতে থেমে যায় ব্রাজিল

২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা ও আদ্রিয়ানোর তারকাবহুল দলকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার ধরা হচ্ছিল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জিনেদিন জিদানের অসাধারণ নৈপুণ্যের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে ব্রাজিল।

ম্যাচের ৫৭ মিনিটে জিদানের ফ্রি-কিক থেকে থিয়েরি অঁরির একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় তৎকালীন চ্যাম্পিয়নরা।

২০১০ বিশ্বকাপ: নিজেদের ভুলেই ডাচদের কাছে হার

দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শুরুটা দুর্দান্ত করেছিল ব্রাজিল। রবিনহোর গোলে এগিয়েও যায় তারা।

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে গোলরক্ষক হুলিও সিজার ও ফেলিপে মেলোর ভুল বোঝাবুঝিতে আত্মঘাতী গোল হজম করে ম্যাচে ফেরায় ডাচদের। পরে ওয়েসলি স্নেইডারের হেডে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। শেষদিকে ফেলিপে মেলো লাল কার্ড দেখলে ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

২০১৪ বিশ্বকাপ: ঘরের মাঠে ৭-১-এর দুঃস্বপ্ন

নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত ২০১৪ বিশ্বকাপ ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে।

নেইমারের চোট এবং থিয়াগো সিলভার নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেমিফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল তারা। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটেই পাঁচ গোল হজম করে বসে ব্রাজিল। শেষ পর্যন্ত ৭-১ গোলের লজ্জাজনক হার ফুটবল ইতিহাসে 'মিনেইরাজো ট্র্যাজেডি' হিসেবে জায়গা করে নেয়।

২০১৮ বিশ্বকাপ: বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের কাছে হার

রাশিয়া বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শুরু থেকেই চাপে পড়ে ব্রাজিল।

ফার্নান্দিনহোর আত্মঘাতী গোল এবং কেভিন ডি ব্রুইনার দূরপাল্লার শটে প্রথমার্ধেই ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে যায় তারা। দ্বিতীয়ার্ধে রেনাতো অগুস্তো একটি গোল শোধ করলেও গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার দুর্দান্ত সব সেভে আর সমতায় ফিরতে পারেনি ব্রাজিল।

২০২২ বিশ্বকাপ: পেনাল্টির হতাশায় বিদায়

কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে নেইমারের দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ব্রাজিল।

কিন্তু ১১৬ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল হজম করে ম্যাচ সমতায় আনে ক্রোয়েশিয়া। পরে টাইব্রেকারে রদ্রিগো ও মার্কুইনহোস পেনাল্টি মিস করলে ৪-২ ব্যবধানে হেরে আবারও কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নেয় সেলেসাওরা।

২০২৬ বিশ্বকাপ: নরওয়ের কাছে নতুন হতাশা

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে নতুন শুরুর স্বপ্ন দেখেছিল ব্রাজিল।

কিন্তু শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে বল দখল ও আক্রমণে এগিয়ে থেকেও সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি তারা। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিসের পর শেষ ১০ মিনিটে রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে জোড়া গোল করেন আর্লিং হলান্ড। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল।

৩৬ বছর পর শেষ ষোলো থেকেই বিদায়

২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে হারের মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বের প্রথম ধাপ থেকেই বিদায় নিল ব্রাজিল।

এর আগে সর্বশেষ ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছিল সেলেসাওরা। সেবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পুরো ম্যাচে একের পর এক সুযোগ নষ্ট করার পর ৮১ মিনিটে ডিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ পাস থেকে ক্লদিও ক্যানিজিয়া গোল করেন। সেই একমাত্র গোলেই ১-০ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল।

দীর্ঘ ৩৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। আর সেই সঙ্গে 'হেক্সা' জয়ের স্বপ্নও আরও একবার অধরাই থেকে গেল।