Image description

বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। গ্রুপ ‘জে’র প্রথম ম্যাচে কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে লিওনেল স্কালোনির দলের প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া। মেসিদের সামনে লক্ষ্য পরিষ্কার—শিরোপা ধরে রাখার পথে জয় দিয়ে শুরু। তবে ম্যাচটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক অস্বস্তিকর অধ্যায়ও।

 

বিশ্বকাপ জয়ের পর পরের আসরের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা কখনো জিততে পারেনি। ১৯৭৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৮২ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল তারা। ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পর ১৯৯০ বিশ্বকাপেও শুরুটা হয়েছিল ক্যামেরুনের কাছে ১-০ হারে। এবার ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রথম ম্যাচে সামনে আলজেরিয়া। ইতিহাস বদলানোর সুযোগ তাই মেসিদের সামনে।

 

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ওপেনারের ইতিহাস অবশ্য পুরোপুরি খারাপ নয়। আগের ১৮টি প্রথম ম্যাচে তাদের জয় ১১টি, ড্র ১টি, হার ৬টি। গোল করেছে ২৭টি, হজম করেছে ১৯টি। কিন্তু শিরোপা ধরে রাখার অভিযানের শুরুতে তাদের ভাগ্য ভালো ছিল না। সেই কারণেই আলজেরিয়া ম্যাচটি শুধু গ্রুপ পর্বের একটি সাধারণ ম্যাচ নয়; এটি আর্জেন্টিনার জন্য পুরোনো অস্বস্তি কাটানোরও পরীক্ষা।

 

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে। উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। লুইস মন্তির গোলে জয় দিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত ফাইনালে স্বাগতিক উরুগুয়ের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা।

 

১৯৩৪ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই সুইডেনের কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। সে আসরে নকআউট ফরম্যাট থাকায় সেটিই ছিল তাদের বিদায়। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৫৮ সালে বিশ্বকাপে ফিরে পশ্চিম জার্মানির কাছে ৩-১ গোলে হার দিয়ে শুরু করে তারা।

 

১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালে শুরুটা ভালো ছিল। ১৯৬২ সালে বুলগেরিয়াকে ১-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালে স্পেনের বিপক্ষে ২-১ জয়ে জোড়া গোল করেন লুইস আরতিমে। তবে ১৯৭৪ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডের কাছে ৩-২ হারে আবারও ওপেনারে ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা।

 

১৯৬৬ সালে স্পেনকে হারিয়ে শুরু করে আর্জেন্টিনা।
১৯৬৬ সালে স্পেনকে হারিয়ে শুরু করে আর্জেন্টিনা।

 

 

নিজেদের মাটিতে ১৯৭৮ বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল হাঙ্গেরির বিপক্ষে ২-১ জয়ে। কারোলি চাপোর গোলে পিছিয়ে পড়লেও লিওপোলদো লুকে ও দানিয়েল বেরতোনির গোলে ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা। শেষ পর্যন্ত সেই আসরেই প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় তারা।

 

কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের আসরেই আসে ধাক্কা। ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। এরউইন ভানডেনবার্গের গোলেই হারতে হয়েছিল সেজার লুইস মেনোত্তির দলকে।

 

১৯৮৬ সালে মেক্সিকোয় শুরুটা ছিল সফল। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-১ জয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। হোর্হে ভালদানো জোড়া গোল করেন, আরেকটি গোল করেন অস্কার রুগেরি। সেই আসরেই ম্যারাডোনার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা।

 

তবে ১৯৯০ সালে আবারও চ্যাম্পিয়ন হিসেবে প্রথম ম্যাচে হোঁচট। সান সিরোতে ক্যামেরুন ১-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনাকে। ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের গোল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হয়ে আছে। আর্জেন্টিনা সেবার ফাইনাল পর্যন্ত গেলেও পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে শিরোপা হারায়।

 

বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনে ক্যামেরুনের কাছে হারে আলবিসেলেস্তেরা।
বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনে ক্যামেরুনের কাছে হারে আলবিসেলেস্তেরা।

 

 

১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ওপেনার ছিল সবচেয়ে দাপুটে ম্যাচগুলোর একটি। গ্রিসকে ৪-০ গোলে হারায় তারা। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা করেন হ্যাটট্রিক, ম্যারাডোনাও করেন স্মরণীয় গোল। কিন্তু পরে ডোপ টেস্টে ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞা সেই বিশ্বকাপকে আর্জেন্টিনার জন্য দুঃস্বপ্নে বদলে দেয়।

 

১৯৯৮ সালে জাপানের বিপক্ষে ১-০ জয়ে আবারও গোল করেন বাতিস্তুতা। ২০০২ বিশ্বকাপেও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর গোলেই ১-০ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। যদিও সেই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় মার্সেলো বিয়েলসার দল।

 

২০০৬ সালে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে শুরু করে আর্জেন্টিনা। ২০১০ সালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ১-০ জয় আসে গাব্রিয়েল হেইনজের হেডে। ২০১৪ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে শুরু করে আলেহান্দ্রো সাবেলার দল। সেই আসরে ফাইনালে গিয়ে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হারে আর্জেন্টিনা।

 

 

আফ্রিকার বিশ্বকাপে নাইজেরিয়াকে হারায় মেসিরা।
আফ্রিকার বিশ্বকাপে নাইজেরিয়াকে হারায় মেসিরা।

 

 

২০১৮ সালে শুরুটা ছিল হতাশার। আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ ড্র করে আর্জেন্টিনা। সের্হিও আগুয়েরো গোল করলেও মেসি পেনাল্টি মিস করেন। সেই আসরে শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।

 

সবশেষ ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে ২-১ হারে শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। মেসির পেনাল্টি গোলে এগিয়ে গেলেও সালেহ আল-শেহরি ও সালেম আল-দাওসারির গোলে অঘটন ঘটায় সৌদি আরব। ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডও শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সেই হারই যেন আর্জেন্টিনাকে জাগিয়ে দেয়। পরে মেক্সিকো ম্যাচ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্কালোনির দল।

 

 

qatar 2022
qatar 2022

 

 

এবার সেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আবার নতুন শুরুতে। মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, স্কালোনির শিরোপা ধরে রাখার মিশন, আর ইতিহাস বদলানোর সুযোগ—সব মিলিয়ে আলজেরিয়া ম্যাচের গুরুত্ব তাই আরও বেশি।

 

আর্জেন্টিনা জানে, বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ সবকিছু নির্ধারণ করে না। কাতারেই তারা সেটি প্রমাণ করেছে। তবে প্রথম ম্যাচে জয় টুর্নামেন্টের পথ সহজ করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং চ্যাম্পিয়নদের বার্তা দেয়। আর এবার সেই জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরোনো এক অস্বস্তি কাটানোর সম্ভাবনা।

 

আলজেরিয়া সহজ প্রতিপক্ষ নয়। উত্তর আফ্রিকার দলটি গতি, শারীরিকতা ও পাল্টা আক্রমণে বিপজ্জনক। স্কালোনিও আলজেরিয়াকে সম্মান করার কথা বলেছেন। ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হারের অভিজ্ঞতা আর্জেন্টিনাকে শিখিয়েছে, বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই আগে থেকে জেতা থাকে না।

 

তবু আর্জেন্টিনার জন্য প্রশ্নটা বড়—বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রথম ম্যাচে হারের ইতিহাস এবার বদলাবে কি?

 

কানসাস সিটিতে সেই উত্তর দিতে নামছেন মেসিরা।

 

বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ

 

  • ১৯৭৮ চ্যাম্পিয়ন
  • ১৯৮২: আর্জেন্টিনা ০-১ বেলজিয়াম

 

  • ১৯৮৬ চ্যাম্পিয়ন
  • ১৯৯০: আর্জেন্টিনা ০-১ ক্যামেরুন

 

  • ২০২২ চ্যাম্পিয়ন
  • ২০২৬: আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়া

 

বিশ্বকাপ ওপেনারে আর্জেন্টিনার রেকর্ড

 

  • ম্যাচ: ১৮
  • জয়: ১১
  • ড্র: ১
  • হার: ৬
  • গোল: ২৭
  • হজম: ১৯

 

আজকের ম্যাচ

 

  • আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়া
  • গ্রুপ: জে
  • ভেন্যু: কানসাস সিটি স্টেডিয়াম
  • সময়: বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৭টা