Image description

‘স্পোর্টসম্যানশিপ স্পিরিট’- এই জোড়া শব্দের ভার অনেক বেশি। খেলার মাঠে পরিস্থিতির চাপে পড়ে ‘খেলোয়াড়সুলভ চেতনা’ ভুলে যাওয়া দোষের কিছু নয়। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মেহেদী হাসান মিরাজের কর্মকাণ্ডে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তার মাঝে কি এই ধরনের কোনো চেতনা আছে? নয়তো ক্রিজের বাইরে থেকে বল তার হাতে তুলে দিতে চাওয়া সালমান আগাকে ওভাবে কেন রান আউট করলেন তিনি? পাকিস্তান অধিনায়ক ম্যাচ শেষে জানিয়েছেন– তিনি এমন পরিস্থিতিতে পড়লে স্পোর্টম্যানশিপ স্পিরিটকে প্রাধান্য দিতেন।  তার কথা, ‘আমি আগে কখনো এমন কিছু করিনি, ভবিষ্যতেও করব না।’ সালমানের এমন দৃঢ়চেতা মনোভাব প্রশংসনীয় বটে। 

সালমানকে আউট করা দেখে হতবাক হয়েছেন পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সাবেক ক্রিকেটার অজয় জাদেজা। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ‘ক্রিকেটীয় চেতনা’ লংঘনের আরেকটি উদাহরণও টেনেছেন তিনি। ওইবার হেলমেট স্ট্র্যাপ ইস্যুতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাঠে না নামায় সাকিব আল হাসান আউটের আবেদন জানান। নিয়মের মধ্যে থেকেই শ্রীলঙ্কান ব্যাটারকে আউট দিয়েছিলেন আম্পায়ার। এই দুই ঘটনাকে মিলিয়ে এক্স-এ অজয়ের মন্তব্য, ‘অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের টাইমড-আউট থেকে সালমান আগার বিতর্কিত রান আউট, মনে হচ্ছে বাংলাদেশকে বিশ্বাস করা অপরাধ। বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার সময় সব দলকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।’

মাত্র তিন বছরের বিরতি দিয়ে দুটি ঘটনায় বাংলাদেশের ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অল্প সময়ের দুটি ঘটনার কারণে বাংলাদেশকে অখেলোয়াড়সুলভ দল অভিহিত করা যেতে পারে। অজয় তিন বছর পেছনে ফিরে গেছেন। কিন্তু ২৩ বছর আগে ফিরে গেলে পাকিস্তানের সততা নিয়েও প্রশ্ন করা যেতে পারে। আর বাংলাদেশের যে কোনো ‘ক্রিকেটীয় চেতনা’ নেই— এই দাবিও উড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

২০০০ সালে টেস্ট ক্রিকেটে নাম লেখানো বাংলাদেশ তখনো পায়ের নিচে মাটি পায়নি। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে মুলতানে তৃতীয় টেস্টে। বাংলাদেশকে নিয়ে ছেলেখেলা করার বাসনা থেকে মাঠে নেমেছিল রশিদ লতিফের পাকিস্তান। হাবিবুল বাশার সুমন ও রাজিন সালেহর ব্যাটে চড়ে ২৮১ রান করেছিল সফরকারীরা। তারপর মোহাম্মদ রফিকের ফাইফারে দুইশর আগেই পাকিস্তানকে গুটিয়ে দেয় বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ সুবিধা করতে পারেনি। রাজিনের চল্লিশ ছাড়ানো ইনিংসে দেড়শ পার করেই গুটিয়ে যায় তারা। তবে থিতু হতে থাকা অলক কাপালির ক্যাচ আউট নিয়ে বিতর্ক ওঠে এবং এখনো ক্রিকেট মহলে সেই আউট চর্চিত। পাকিস্তানের দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে সেদিন মাঠে ছিলেন আম্পায়ার অশোকা ডি সিলভা। একাধিক বিতর্কিত আউট দিয়েছিলেন তিনি। 

কাপালির বিরুদ্ধে কট বিহাইন্ডের আবেদন করে সফল হন লতিফ। কিন্তু সেটি কি আসলেই আউট ছিল নাকি মাটি থেকে বল কুড়িয়ে নিয়ে পাকিস্তানি কিপার আউটের আবেদন করেছিলেন? স্পষ্টতই দেখা গেছে বল গ্লাভসে নেওয়ার আগে মাটিতে ছিল বল। আর কাপালিকে ফেরাতে ইনজামামের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ইনজামাম নাকচ করে দেন। পরবর্তীতে লতিফ এই ঘটনার জন্য আইসিসি কর্তৃক ৫ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

বিতর্কিত সেই আউটের কারণে আরেকটু বেশি রান না হওয়ার আক্ষেপ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ দারুণ বোলিং করে পাকিস্তানকে চেপে ধরেছিল। ২৬১ রানের লক্ষ্য দিয়ে ২০৫ রানে ৮ উইকেট তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপরও দৃঢ়চেতা হয়ে ক্রিজে থাকা ইনজামাম উল হককে নিয়ে উমর গুল প্রতিরোধ গড়েন। তাদের ৫২ রানের জুটিতেই লেখা হয়ে যায় বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। কিন্তু এই জুটি আরও আগেই ভাঙার সুযোগ পেয়েছিল তারা। মোহাম্মদ রফিক ইচ্ছা করলেই গুলকে মানকাডিং আউট করতে পারতেন। বাংলাদেশি স্পিনার বোলিংয়ের সময় ক্রিজের বাইরে ছিলেন পাকিস্তানের দশ নম্বর ব্যাটার। কিন্তু স্টাম্প ভেঙে তাকে আউট না করে ডেকে সতর্ক করেন। 

রফিক ক্রিকেটীয় চেতনা না দেখিয়ে সেই আউট করলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। ইনজামাম উল হকের অপরাজিত ১৩৮ রানের ইনিংসে বাংলাদেশকে হয়ত ১ উইকেটে হারের আক্ষেপে পুড়তে হতো না। কেঁদে রুমাল ভেজাতে হতো না খালেদ মাহমুদকে। বড় দলের বিপক্ষে প্রথমবার জয়ের এত কাছে গিয়েও আফসোস করতে হতো না।  

লতিফ আর আম্পায়ারের ক্রিকেটীয় চেতনাহীন কাণ্ডের জবাবে রফিকের সেই ‘ভালো মানুষি’ পরে প্রশংসনীয় হয়েছে। মাশরাফি মুর্তজা বলেছিলেন, ওই সময় ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের জন্য স্পোর্টসম্যানশিপ বড় ব্যাপার ছিল। রফিক ঠিক কাজটাই করেছেন। পেরিয়ে গেছে বহু বছর, কয়েক দশক। বাংলাদেশ এখন আরও পরিণত ক্রিকেট খেলে। 

ওই ঘটনার ২১ বছর পর রাওয়ালপিন্ডিতে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় পায়। কিন্তু সেই দুঃখ কি ভোলার মতো? হাবিবুলের মতে সেই ক্ষত থেকেই যাবে। রাওয়ালপিন্ডি টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের পর সাবেক অধিনায়ক বললেন, ‘অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন মুলতানের দুঃখ কি ভুলতে পেরেছি এবার? আমি বলব না সেই দুঃখ ভুলবার নয়। ওইটা ছিলো স্পেশাল টেস্ট। তখন জিতলে সব কিছু অন্যরকম হতো। আমরা তখন মাত্র ৩ বছর হয় টেস্ট খেলছি। সংগ্রাম করছিলাম টেস্টে, ম্যাচ জিতি না। এমন অবস্থায় পাকিস্তানকে পাকিস্তানের মাঠে হারানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই দুঃখ আজীবন থাকবে।’

পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়খরা কাটিয়ে দুই বছর আগে মুলতান টেস্টের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এবার ফিরল ভিন্ন কারণে। মিরাজের কাণ্ড নিয়ে যখন বিতর্ক আর সালমানের সাফাই গাওয়া— তখন অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, সেদিন বাংলাদেশ ক্রিকেটীয় চেতনা দেখিয়ে কী পেয়েছিল আর পাকিস্তানের খেলোয়াড়সুলভ চেতনা কোথায় ছিল? লতিফের মতো অসততা তো দেখাননি মিরাজ, আউট করেছেন নিয়ম মেনেই! রফিকের মতো ভালো মানুষি দেখাতে যাননি বলেই কি তাকে বিতর্কিত করা যায়!