Image description

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আসক্তিকে অনেকেই ক্যাসিনো, ওপিয়ড ও সিগারেটের সঙ্গে তুলনা করেন। অতিরিক্ত ব্যবহার আর আসক্তির সীমারেখা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও অনেকে মনে করেন, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা স্ন্যাপচ্যাটের টান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি’র এক প্রতিবেদন অনুসারে, প্রিয় অ্যাপগুলোর নির্মাতাদের লক্ষ্য ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, যাতে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে বিলিয়ন ডলার আয় করা যায়। অন্তহীন স্ক্রল, স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর উদ্দীপনা, লাইক ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার মানসিক তৃপ্তি; এসবের বিরুদ্ধে লড়াই অনেকের কাছে অসম মনে হয়। কারও কারও কাছে ‘রেজ-বেইট’, হতাশাজনক খবর বা অনলাইন তর্কও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

এ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আসক্তি নিয়ে উদ্বেগের বড় অংশ শিশুদের ঘিরে থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্করাও ঝুঁকির বাইরে নন। অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন স্কুলের আসক্তি চিকিৎসাবিষয়ক পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আনা লেম্বকে আসক্তিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, ‘নিজের বা অন্যের ক্ষতি সত্ত্বেও কোনও পদার্থ বা আচরণের অব্যাহত ও বাধ্যতামূলক ব্যবহার।’ লস অ্যাঞ্জেলেসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতি নিয়ে এক ঐতিহাসিক মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, মানুষের জন্য দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা প্রায় সীমাহীন ও বাধাহীন প্রবেশাধিকার এসব প্ল্যাটফর্মকে এত আকর্ষণীয় করে তোলে।

তবে কিছু গবেষক মনে করেন, অতিরিক্ত ব্যবহারকে সরাসরি ‘আসক্তি’ বলা ঠিক নয়। তাদের মতে, আসক্তি বলতে হলে স্পষ্ট উপসর্গ থাকতে হবে। যেমন প্রবল ও নিয়ন্ত্রণহীন তাড়না বা ব্যবহার বন্ধ করলে প্রত্যাহারজনিত লক্ষণ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি এখনও মানসিক রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড ‘ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডারস’-এ আনুষ্ঠানিক রোগ হিসেবে স্বীকৃত নয়। এর একটি কারণ হলো, কীভাবে আসক্তি নির্ধারণ করা হবে বা অন্তর্নিহিত মানসিক সমস্যার ভূমিকা কতটা, এ নিয়ে বিস্তৃত ঐকমত্যের অভাব। তবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকলেও অতিরিক্ত ব্যবহার যে ক্ষতিকর হতে পারে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সন্দেহ নেই।

বেলর কলেজ অব মেডিসিনের মনোরোগ ও আচরণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. লরেল উইলিয়ামস বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যক্তি নিজের ব্যবহারের পরিমাণ ও তা তাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সে সম্পর্কে কী অনুভব করছেন। যদি দেখা যায় যে, তিনি এত বেশি ব্যবহার করছেন যে অন্য উপভোগ্য বা প্রয়োজনীয় কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তবে তা সমস্যাজনক। নিয়মিতভাবে ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন, দুঃখিত বা রাগান্বিত অনুভব করলে সেই ব্যবহার ভালো নয়।’

অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কি জীবনের অন্য অংশে প্রভাব ফেলছে? কাজ, গৃহস্থালি, শখ বা পরিবার-বন্ধুদের সময় কি পেছাচ্ছে? কমানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছেন? ব্যবহারের জন্য অপরাধবোধ হচ্ছে? এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যব্যবস্থাপনা অধ্যাপক অফির তুরেল বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি’ শব্দবন্ধ নিয়ে কোনও ঐকমত্য নেই এবং শিগগিরই হবে বলেও তিনি মনে করেন না। তবে তার মতে, ‘সমস্যা যে আছে, তা স্পষ্ট। একে আসক্তি না-ই বলি, তবু এটি একটি ইস্যু, এবং সমাজ হিসেবে আমাদের তা নিয়ে ভাবতে হবে।’

ব্যবহার কমাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সহজ উপায় তুলে ধরেছেন। ডা. উইলিয়ামস বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করে, তা বোঝা জরুরি। একে এমন একটি কোম্পানি হিসেবে ভাবুন, যারা চায় আপনি থেকে যান এবং কিছু কিনুন। মনে রাখুন, সব তথ্য সত্য নাও হতে পারে। বিকল্প উৎস থেকে তথ্য নিন। একই বিষয় বারবার দেখলে মানুষ সেটিকে সত্য মনে করতে শুরু করতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পোস্টডক্টরাল গবেষক ইয়ান এ. অ্যান্ডারসন ছোট কিন্তু অর্থবহ পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। যেমন, ফোনে অ্যাপের অবস্থান বদলে দেওয়া বা নোটিফিকেশন বন্ধ করা। তিনি বলেন, ফোন শোবার ঘরে না নেওয়ার মতো পদক্ষেপও কার্যকর হতে পারে।

প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও রয়েছে। আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড উভয় ডিভাইসেই স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের সুবিধা আছে। আইফোনে ‘স্ক্রিন টাইম’ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন কার্যক্রম বন্ধ রাখা যায়। নির্দিষ্ট অ্যাপ বা অ্যাপের বিভাগেও সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব। তবে এসব সীমা এড়ানো কঠিন নয়; সতর্কবার্তা দেখালেও ব্যবহারকারী চাইলে তা উপেক্ষা করতে পারেন।

হালকা পদক্ষেপে কাজ না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছেন কেউ কেউ। কেউ ফোনকে গ্রে-স্কেল মোডে রাখেন, যাতে রঙিন আকর্ষণ কমে। কেউ পুরোনো ধাঁচের সাধারণ ফোনে ফিরে যান। কিছু স্টার্টআপ এমন হার্ডওয়্যার তৈরি করেছে, যেগুলো ব্যবহার না করলে নির্দিষ্ট অ্যাপ খোলা যায় না। আবার কেউ ফোন সম্পূর্ণ দূরে রাখার জন্য লকবক্স ব্যবহার করেন।

সবশেষে, যদি এসবের কোনোটিই কাজ না করে, তবে ভেতরের কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। উদ্বেগ, চাপ, একাকিত্ব, হতাশা বা আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি; এসব সমস্যার উপসর্গ হিসেবেও অতিরিক্ত ব্যবহার দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে থেরাপি সহায়ক হতে পারে।

ডা. উইলিয়ামস বলেন, ‘যারা দূরে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন, তারা বন্ধুদের নিয়ে একসঙ্গে চেষ্টা করতে পারেন। দলগত উদ্যোগ নিন। শুধু এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আবার পোস্ট করবেন না! যত বেশি জায়গা ফোনমুক্ত হবে, তত কমে আসতে পারে সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার আকাঙ্ক্ষা।’