Image description

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের সঙ্গে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর মধ্যে যেমন প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ খবর রয়েছে, তেমনি আছে গুজব, ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর ছবি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক ভিডিও। অনেক সময় এসব মিথ্যা তথ্য এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্য শনাক্ত করে মানুষের সামনে তুলে ধরার কাজটি দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর এই কাজকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন পেশার সুযোগ—ফ্যাক্ট-চেকিং ও ডিজিটাল ভেরিফিকেশন।

কী কাজ করেন ফ্যাক্ট-চেকাররা?

ফ্যাক্ট-চেকার বা তথ্য যাচাইকারীদের মূল দায়িত্ব হলো কোনও দাবি, ছবি, ভিডিও, বক্তব্য কিংবা সংবাদ সত্য কিনা, তা অনুসন্ধান করে দেখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনও পোস্টে রাজনৈতিক বক্তব্য, পুরোনো ছবি, ভুয়া পরিসংখ্যান বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকলে তারা সেটির উৎস খুঁজে বের করেন।

এ জন্য সংবাদমাধ্যম, সরকারি নথি, গবেষণা প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা হয়। কোনও ছবি বা ভিডিও সত্যিই সাম্প্রতিক কিনা, কোথায় ধারণ করা হয়েছিল কিংবা সেটি সম্পাদনা করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করতে হয়।

অনেক ক্ষেত্রে একটি ভিডিওর কিছু অংশ কেটে ভিন্ন অর্থে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আবার পুরোনো কোনও ঘটনার ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়। ফ্যাক্ট-চেকারদের কাজ হলো এসব বিভ্রান্তির পেছনে থাকা প্রকৃত তথ্য খুঁজে বের করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি তুলে ধরা।

ডিপফেক শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে এখন এমন ভিডিও ও অডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যেখানে কোনও ব্যক্তি বাস্তবে যা বলেননি বা করেননি, সেটিও বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখানো যায়। এ ধরনের কৃত্রিমভাবে তৈরি বা পরিবর্তিত ভিডিওকে সাধারণভাবে ডিপফেক বলা হয়।

ডিপফেক শনাক্ত করতে শুধু ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। ফ্যাক্ট-চেকাররা ভিডিওর উৎস, প্রকাশের সময়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, মুখের নড়াচড়া, শব্দ ও ছবির অসামঞ্জস্য এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সংকেত বিশ্লেষণ করেন। প্রয়োজনে বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে দেখেন এবং ভিডিওটির মূল সংস্করণ খুঁজে বের করেন।

তবে সব ডিপফেক শুধু প্রযুক্তিগত সফটওয়্যার দিয়ে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের পাশাপাশি সাংবাদিকতার অনুসন্ধানী দক্ষতা ও তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।

কোন দক্ষতা প্রয়োজন?

এই পেশায় আগ্রহীদের প্রথমেই ভালো গবেষণা ও অনুসন্ধানী দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। কোনও তথ্য দেখেই বিশ্বাস না করে প্রশ্ন করা, একাধিক উৎস থেকে তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর অভ্যাস অত্যন্ত জরুরি।

এ ছাড়া প্রয়োজন— সংবাদ ও তথ্যের উৎস যাচাইয়ের দক্ষতা; গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চসহ বিভিন্ন অনুসন্ধানী সরঞ্জাম ব্যবহারের জ্ঞান; ছবি, ভিডিও ও অডিও বিশ্লেষণের প্রাথমিক ধারণা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা বোঝার সক্ষমতা; তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন লেখার দক্ষতা; ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন গোপনীয়তা সম্পর্কে ধারণা; নিরপেক্ষতা, সততা ও নৈতিক সাংবাদিকতার চর্চা।

ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের কাজে ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বা ওসিন্টের ধারণাও কাজে লাগে। ইন্টারনেটে উন্মুক্ত থাকা ছবি, ভিডিও, মানচিত্র, নথি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনও ঘটনার সত্যতা যাচাই করা এ পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কোথায় কাজের সুযোগ রয়েছে?

ফ্যাক্ট-চেকাররা সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং তথ্য যাচাইভিত্তিক সংগঠনে কাজ করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের তথ্য যাচাই কার্যক্রম, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পেও এ ধরনের পেশাজীবীদের প্রয়োজন হয়।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর কনটেন্ট যাচাইয়ের গুরুত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ভাষায় তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও তৈরি হচ্ছে। ফলে বাংলা ভাষায় দক্ষ, সাংবাদিকতা বোঝেন এবং ডিজিটাল অনুসন্ধানে পারদর্শী তরুণদের জন্য এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে।

কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়?

সাংবাদিকতা, গণযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান কিংবা ডেটা বিশ্লেষণের শিক্ষার্থীরা এ পেশায় আগ্রহী হতে পারেন। তবে নির্দিষ্ট কোনও বিষয়ে ডিগ্রি থাকাই একমাত্র শর্ত নয়। নিয়মিত অনুশীলন, তথ্য যাচাইয়ের প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।

শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবি যাচাই করে অনুশীলন করা যেতে পারে। পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মের প্রতিবেদন পড়া, রিভার্স ইমেজ সার্চ, ভিডিওর উৎস অনুসন্ধান এবং তথ্যের প্রাথমিক নথি খোঁজার দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল দুনিয়ায় তথ্যের পরিমাণ যত বাড়ছে, সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনও তত বাড়ছে। ফলে ফ্যাক্ট-চেকিং শুধু সাংবাদিকতার একটি বিশেষায়িত কাজ নয়, ভবিষ্যতের ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।