একসময় পথ চিনতে মানুষ মানচিত্র ব্যবহার করত, দিক মনে রাখত মাথায়। তারপর এল জিপিএস। এখন অনেকেই নিজের শহরের রাস্তার মানচিত্রও মনে রাখতে পারেন না। সার্চ ইঞ্জিন আসার পর বদলেছে স্মৃতির ধরন। কোনো তথ্য মনে রাখার বদলে মানুষ এখন মনে রাখে, কোথায় খুঁজলে সেটি পাওয়া যাবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হয়তো সেই পরিবর্তনকে আরও গভীর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে; সৃজনশীলতা, মনোযোগ, বিশ্লেষণক্ষমতা থেকে শুরু করে চিন্তার মৌলিক কাঠামো পর্যন্ত। খবর বিবিসির।
প্রযুক্তিবিষয়ক লেখক টমাস জার্মেইন বিবিসির প্রতিবেদনে লিখেছেন, তিনি কয়েক বছর আগে নিয়মিত এআই ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রযুক্তি নিয়ে লিখতে হলে সেটিকে ব্যবহার করাও জরুরি। কিন্তু গত এক বছরে প্রকাশিত একের পর এক গবেষণা তাঁকে নতুন করে ভাবাচ্ছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে করতে তিনি কি নিজের মস্তিষ্কেরই ক্ষতি করছেন?
গবেষণাগুলো বলছে, যারা অতিরিক্তভাবে চ্যাটজিপিটি বা এ ধরনের এআই টুলের ওপর নির্ভর করেন, তাঁদের সৃজনশীলতা, মনোযোগ, সমালোচনামূলক চিন্তা ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব পড়তে পারে। কিছু গবেষক আবার আশঙ্কা করছেন, মানুষ ধীরে ধীরে সেই কগনিটিভ ফ্রিকশন হারিয়ে ফেলছে, যেটি গভীর চিন্তাকে ধারালো করে।
তবে এই গবেষণার ক্ষেত্র এখনো একেবারেই নতুন। সব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী ও ‘ল্যাবরেটরি ফর রিলেশনাল কগনিশন’-এর পরিচালক অ্যাডাম গ্রিন বলেন, ‘মোটা দাগে বললে— হ্যাঁ, উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে।’
তাঁর ভাষায়, এআই এখন এমন কাজ করছে, যেগুলো আগে মানুষের মানসিক শ্রমের প্রয়োজন হতো। প্রচুর প্রমাণ আছে যে আপনি যদি নিজে কম চিন্তা করেন, তাহলে সেই ধরনের চিন্তা করার সক্ষমতাও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়।
আবার আপনি চাইলেও এআই এড়িয়ে চলা কঠিন। গুগলের সার্চ রেজাল্টের প্রথম পাতাতেই সবার ওপরে এখন এআইয়ের তৈরি উত্তর দেখা যায়। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দ্রুত এআইকে মানুষের ফোন, ব্রাউজার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু বিষয়ে সচেতন থাকলে বড় ঝুঁকিগুলো এড়ানো সম্ভব।
প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়
ডেল মেডিক্যাল স্কুলের ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইকোলজিস্ট জ্যারেড বেঞ্জ বলছেন, বিষয়টি এতটাও বাইনারি নয় যে এআই ব্যবহার করলেই তা ক্ষতিকর হবে, বা হবে না।
তাঁর মতে, যদি এআই কোনো কম গুরুত্বপূর্ণ কাজের চাপ কমিয়ে মানুষকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়, তাহলে সেটি মস্তিষ্কের জন্য উপকারীও হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘মানুষের মস্তিষ্ক তো আগে থেকেই নানা প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তাহলে এআইকে আমরা এত আলাদা ভাবছি কেন? প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়।’
তবে গবেষকদের বড় উদ্বেগ হলো, মানুষ কি ধীরে ধীরে চিন্তার বদলে শুধু ‘ফলাফল’ চাইতে শিখছে?
অ্যাডাম গ্রিনের ভাষায়, ‘এআই আমাদের প্রথমবারের মতো এমন সুযোগ দিয়েছে, যেখানে প্রক্রিয়াকে বাদ দিয়ে সরাসরি ফল পাওয়া যায়।’
প্রবন্ধ আরও সুন্দর দেখায়। উপস্থাপনা আরও ঝকঝকে হয়। কোনো অনুষ্ঠানের কৌতুকও নিখুঁতভাবে লেখা যায়। কিন্তু মাঝখানের যে সংগ্রাম, ভুল, আটকে যাওয়া আর হঠাৎ করে সমাধান খুঁজে পাওয়ার মুহূর্ত; সেটিই আসলে মস্তিষ্কের ব্যায়াম। গ্রিন বলেন, ‘এটা যেন জিমে গিয়ে রোবটকে দিয়ে আপনার হয়ে ভারোত্তোলন করানো। এতে আপনার কিছুই অর্জন হয় না।’
এআইয়ের কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস নয়
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি এআই ব্যবহার করেন, তাঁরা সমালোচনামূলক চিন্তার পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে খারাপ ফল করেছেন। কারণ, তাঁরা ধীরে ধীরে নিজের চিন্তার দায়িত্ব যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক মানুষ নিজের বিচারবুদ্ধির চেয়েও এআইকে বেশি বিশ্বাস করেন, এমনকি যখন এআই ভুল তথ্য দেয় তখনও। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভ্যানিয়ার গবেষকেরা এই প্রবণতার নাম দিয়েছেন ‘কগনিটিভ সারেন্ডার’ বা ‘চিন্তার আত্মসমর্পণ’। সমস্যা আরও বাড়ে যখন ব্যবহারকারী নিজেই বিষয়টি ভালো বোঝেন না।
মাইক্রোসফট রিসার্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিষয়ে মানুষের নিজস্ব দক্ষতা কম, সেসব ক্ষেত্রে এআইয়ের ভুল বিচার করার ঝুঁকিও বেশি।
গবেষণাটির সহলেখক ও কারনেগি মেলন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক হ্যাংক লি বলেন, ‘ব্যবহারকারীর যদি বোঝার ক্ষমতা না থাকে যে উত্তরটি আসলে ভালো কি না, সেখানেই বিপদ।’
তাঁর পরামর্শ, এআইকে প্রশ্ন করার আগে নিজে অন্তত একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করুন। তারপর এআইকে ব্যবহার করুন নিজের চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। এতে এআই আপনার চিন্তার জায়গা দখল করবে না, বরং সেটিকে যাচাই করতে সাহায্য করবে।
শেখার মধ্যে ‘ফ্রিকশন’ দরকার
ফ্রিকশন কথাটা এই লেখায় আগেও একবার এসেছে। বিষয়টা একটু আলাপ করা যাক। ধরুন, আপনি নিজে খাতা-কলমে একটা অঙ্ক কষে সমাধান করলে যে মানসিক পরিশ্রম হয়, সেটি কগনিটিভ ফ্রিকশন। কিন্তু ক্যালকুলেটর বা এআই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর বলে দিলে সেটিতে ফ্রিকশন কমে যায়। কোনো কঠিন বই ধীরে ধীরে পড়ে বোঝার চেষ্টাও কগনিটিভ ফ্রিকশন। কিন্তু ইউটিউব শর্টস বা এআই সারাংশ দেখে দ্রুত ‘জেনে ফেলা’র মধ্যে সেই গভীর মানসিক প্রক্রিয়া কম থাকে। মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানে ধারণা হলো, এই ফ্রিকশন মস্তিষ্ককে ‘ওয়ার্কআউট’ করায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক বারবারা ওকলে বলেন, ‘অনেক সময় কোনো কিছু চোখের সামনে দেখলেই মনে হয়, সেটি আপনার মনে গেঁথে গেছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না।’
প্রাথমিক কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এআই মানুষের তথ্য মনে রাখার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ৪৯৪ শিক্ষার্থীর ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, যারা বেশি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগও বেশি। যদিও এ ধরনের আত্মমূল্যায়নকে চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলা যায় না।
তবে ২০২৪ সালের একটি অপ্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহার করার আগে যদি মানুষ নিজে একটু সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে, তাহলে শেখার মান বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই থেকে কোনো তথ্য শিখতে চাইলে সেটিকে ধীরে গ্রহণ করা জরুরি। নোট নিতে হবে, সম্ভব হলে হাতে লিখে। চাইলে এআইকে দিয়ে কুইজ বা ফ্ল্যাশকার্ডও তৈরি করানো যেতে পারে। কারণ, শেখার জন্য কিছুটা ‘কষ্ট’ দরকার। সেই কগনিটিভ ফ্রিকশন তথ্যকে স্থায়ী করে।
ফাঁকা পাতাটিকে একটু বেশি সময় ফাঁকাই থাকতে দিন
এআই খুব সহজেই নতুন নতুন ধারণা তৈরি করতে পারে। আর সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। গবেষণায় দেখা গেছে, সৃজনশীল কাজে এআই ব্যবহারকারীদের ধারণাগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি অনুমানযোগ্য এবং কম মৌলিক হয়।
অ্যাডাম গ্রিনের ভাষায়, মানুষের মস্তিষ্ক সৃজনশীল হয় অপ্রত্যাশিত সংযোগ তৈরির মাধ্যমে। কিন্তু সেই কাজটি যদি এআই করে দেয়, তাহলে মস্তিষ্ক নিজের অনুশীলনের সুযোগ হারায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, মানুষ তার সৃজনশীলতার পেশী হারিয়ে ফেলতে পারে। এআই অনেকভাবে আমাদের ভুল বোঝাচ্ছে যে এটি আমাদের আরও সৃজনশীল করছে।’
তাঁর পরামর্শ, কোনো লেখা বা কাজ শুরু করার আগে নিজের চিন্তাগুলো আগে কাগজে লিখুন, এলোমেলো করে হলেও। কারণ, সেই মুহূর্তে আপনার মস্তিষ্ক নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও জ্ঞান থেকে নতুন সংযোগ তৈরি করছে। সেটিই আসল অনুশীলন। তারপর চাইলে এআই ব্যবহার করে নিজের ভাবনাকে আরও উন্নত করা যেতে পারে।
মনোযোগ ধরে রাখার লড়াই
আপনি যদি এতক্ষণ ধরে এই লেখাটি পড়ে থাকেন, তাহলে অভিনন্দন। কারণ, মনোযোগ ধরে রাখা এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। গবেষণা বলছে, প্রযুক্তির অবিরাম উপস্থিতি মানুষের মনোযোগের ক্ষমতাকে দুর্বল করছে। এআই হয়তো সেটিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ, এখন সব উত্তর হাতের কাছেই পাওয়া যায়। ফলে কঠিন বা অস্বস্তিকর চিন্তার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু কাজ ধীরে করুন। বড় কোনো লেখা চ্যাটজিপিটিকে দিয়ে সংক্ষেপ করিয়ে নেওয়ার আগে নিজে পড়ুন। কঠিন সমস্যার মুখোমুখি কিছুক্ষণ থাকুন। মাঝে মাঝে নিজেকে বিরক্ত হতেও দিন। কারণ, অস্বস্তিই মস্তিষ্ককে গভীর চিন্তার জন্য প্রস্তুত করে।
মানুষের মস্তিষ্কের আলাদা শক্তি
টমাস জার্মেইন বিবিসির প্রতিবেদনে লিখেছেন, এই লেখার উদ্দেশ্য এআই ব্যবহার বন্ধ করতে বলা নয়। বরং, সেটি ব্যবহার করার সময় আরও সচেতন হওয়া।
অ্যাডাম গ্রিন বলছেন, মানুষের মস্তিষ্ক এআই থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। মানুষ এমন সংযোগ তৈরি করতে পারে, যা ব্যক্তিগত, অপ্রত্যাশিত এবং সত্যিকার অর্থেই নতুন; যা কোনো সম্ভাবনানির্ভর যন্ত্র পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারে না।
তাঁর ভাষায়, ‘আগামী দিনে মানুষের চিন্তার স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যই সবচেয়ে বড় মূল্য হয়ে উঠবে। মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদেই বটের বাইরে চিন্তা করতে শিখবে।’
অন্যদিকে জ্যারেড বেঞ্জের মনে করিয়ে দেন, প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ইতিহাস মানুষের নতুন নয়। তিনি বলেন, ‘গাড়ি এসেছে বলে মানুষ কি ম্যারাথন দৌড়ানোর ক্ষমতা হারিয়েছে? না। বরং দৌড়ানো এখন এমন কিছু, যা মানুষ করতে চায় বলেই করে।’
প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু নিজে চিন্তা করার, নতুন কিছু তৈরি করার এবং নিজের মতো করে উত্তর খুঁজে বের করার মানবিক তাগিদ, সেটিকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা এখনো সম্ভব হয়নি।