Image description
টিনের বেড়া দেওয়া এক ঝুপড়ি ঘর। সেখান থেকেই এক নারী লাইভ স্ট্রিমিং অ্যাপের মাধ্যমে রোজগারের চেষ্টা করছেন। এই অ্যাপ দিয়ে যেকোনো জায়গা থেকে সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যায়।
 
তিনি এখন ‘লেভেল-১’-এ আছেন। টিকে থাকতে হলে তাকে দ্রুত ওপরের লেভেলে উঠতে হবে। আর সে জন্য দর্শকদের অনেকক্ষণ ধরে স্ট্রিমে আটকে রাখা জরুরি।
 
প্রথমে তিনি একটা লাল শাড়ি পরে নাচ শুরু করেন। কিন্তু কমেন্ট বক্সে দর্শকরা তাকে অশালীন কিছু করবার জন্য চাপ দিতে থাকে। কমেন্ট আসছে অনেক। আর প্রায় সব কমেন্টেই একই ধরনের আপত্তিকর অনুরোধ আসছে।
মুখে কালো মাস্ক পরা সেই নারী অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধীরে ধীরে দর্শকদের কথায় সাড়া দিতে থাকেন। সময়ের সাথে অনুরোধগুলো আরও নোংরা আরও নগ্ন হতে থাকে। অ্যাপটিতে পর্দার ওপর সতর্কবার্তা দেখাচ্ছিল—অশ্লীল কিছু দেখালে তা সাথে সাথে সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে কাজ হচ্ছিল তার উল্টো।
 
ক্রিয়েটর যখন বিপজ্জনক সীমানায়
 
এরই মধ্যে তিনি বেশ কিছু অনুসারী জুটিয়ে ফেলেছেন। তাদের এখন প্রাইভেট চ্যাটে নেওয়া যাবে। সেখান থেকেই সাধারণত টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর আদান-প্রদান করা হয়।
 
লেভেল-১ কনটেন্ট নির্মাতারা প্রতি মিনিটে ১,২০০ বিনস পর্যন্ত আয় করতে পারেন। লেভেল-৯ এ পৌঁছালে এই আয় মিনিটে ৬,০০০ বিনস পর্যন্ত হয়।
 
দশ হাজার বিনস এক ডলারের সমান। তবে অ্যাপ কর্তৃপক্ষ কেটে নেয় আয়ের ৪০ শতাংশ।
 
ধাপে ধাপে ওপরে উঠতে পারলে একজন কনটেন্ট নির্মাতা অনায়াসেই মাসে ৩০০ ডলার আয় করতে পারেন। পিপিআরসি-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি পুরো পরিবারের গড় মাসিক আয়ও প্রায় এমনই।

 

‘সংকুচিত সাংস্কৃতিক পরিসরে সাইবার বিনোদনের দাপট’

ফেব্রুয়ারি নাগাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে এই ধরনের অ্যাপ্লিকেশনগুলো নিয়ে আলোচনা বাড়তে শুরু করে।
 
অনেক ব্যবহারকারী স্ট্যাটাস দিয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করেন যে তারা যেন তাদের সন্তানদের ফোন পরীক্ষা করেন।
 
ফেসবুক ব্যবহারকারী অভিলেজ লিখেছেন, ‘বর্তমানে [চ্যাটিং অ্যাপগুলো] নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে যে, কিছু তরুণী লাইভ ও ভিডিও কলের মাধ্যমে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের উদ্দেশ্য ভার্চুয়াল কয়েনকে টাকায় রূপান্তর করে অর্থ উপার্জন করা।’
 
তিনি বলেন, অনলাইনে শেয়ার করা এই ধরনের ভিডিও এবং ছবি ভবিষ্যতে বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই সবার সচেতন থাকা দরকার।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গবেষক জানান, পার্বত্য অঞ্চল এই ধরনের অ্যাপ ব্যবহারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একটু ভিন্ন ঘরানার বা আকর্ষণীয় চেহারা মানেই প্রতি সেশনে বেশি আয়।
 
তাঁর চলমান তদন্তে তিনি আরও দেখেছেন যে, এই চ্যাটিং অ্যাপ্লিকেশনগুলো মানব পাচারের প্রবেশপথ হয়ে উঠছে। ফলে এটি একটি গুরুতর সংকট হয়ে উঠতে পারে।
 
ফোন পরীক্ষার দাবি জোরালো হচ্ছে। সেই সঙ্গে স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও সামনে চলে আসে।
 
তবে নৃবিজ্ঞানী, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন কর্মী রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, এই ধরনের অ্যাপ সরাসরি নিষিদ্ধ করার আগে আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
 
হয়তো প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ধরনের অ্যাপ্লিকেশনের অনুপ্রবেশ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে কারণ এসব এলাকা এখন বিনোদনের প্রাথমিক উৎসে পরিণত হয়েছে।
 
স্নিগ্ধা বলেন, ‘বিনোদনের উৎস হয়ে ওঠার পেছনের কারণটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি বিনোদনের উৎস হয়ে উঠছে কারণ গত ১৫ বছর ধরে খুব পরিকল্পিতভাবে আমাদের গ্রাম এবং ছোট শহরগুলোতে ছেলেমেয়েদের বিনোদনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
 
কিন্তু বিনোদন, আনন্দ এবং উৎসব মানুষের খুব সহজাত প্রবৃত্তি। তিনি আরও যোগ করেন, ‘মানুষের বিনোদনের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। যেখানে আগে যাত্রা হতো, সার্কাস হতো, নারী-পুরুষ একসঙ্গে দেখতে যেত; মানুষ সেখানে অংশ নিত; পাড়ায় পাড়ায় নাটক হতো—সব এখন বন্ধ।’
 
বিনোদনের পুরো ধারাটিই এখন কম-বেশি সাইবার জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামে। তবে স্নিগ্ধা বলেন, সেখানে নিয়ম থাকা উচিত, তবে তদারকিই হবে আসল চাবিকাঠি।
 
‘যদি অ্যাপ্লিকেশনগুলো চলতে দেওয়া হয়, তবে কে দায়বদ্ধ থাকবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত। এটিই প্রথম পদক্ষেপ।’
 
অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের সম্ভাব্য শোষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ভোটার আইডি কার্ড যাচাইকরণ ছাড়া এই ধরনের অ্যাপ খোলার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়—‘অন্তত একটি সর্বনিম্ন বয়সসীমা থাকা উচিত’।
 
‘আমি বলছি না যে এই অ্যাপগুলো চলুক বা বন্ধ হয়ে যাক। তবে যা হতে পারে তা হলো—রাষ্ট্র এই অ্যাপগুলোর সাথে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে পারে। বাংলাদেশ থেকে যে কেউ অ্যাকাউন্ট খুললে অবশ্যই ভোটার আইডি দিতে হবে। এতে শুধু অপ্রাপ্তবয়স্করাই রক্ষা পাবে না, আমরা স্ক্যামারদের হাত থেকেও সুরক্ষা পাব।’
 
স্নিগ্ধা ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ বা মনোযোগের অর্থনীতিকে ‘ভাইরাল সিকনেস’ বা ভাইরাল অসুস্থতা বলে অভিহিত করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি গণমাধ্যমের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।
 
‘আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই অ্যাটেনশন ইকোনমি এবং এই ভাইরাল অসুস্থতা। এখানে একটি প্রজন্ম ধ্বংস করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের অনেক বড় দায় রয়েছে।’
 
তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আরও সুযোগ তৈরির জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কেও তাগিদ দেন।
 
‘এখন প্রায় কোনো রকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই। মানুষ তাই সাইবার জগতে চলে গেছে। আর সেই সাইবার জগতটি অনিয়ন্ত্রিত।’
 
অ্যাপগুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার সময় স্নিগ্ধার কথাগুলো সত্য বলে মনে হয়। সেখানে সত্যিই নাচ এবং গানের অনুষ্ঠান হয়, পাশাপাশি বিভিন্ন সাধারণ বিষয় নিয়ে আলোচনার সেশনও থাকে।
 
অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো এর একটি ভালো দিকও রয়েছে। কিন্তু এর ক্ষতিকর দিকটি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আইনি জটিলতাও বিবেচনা করার মতো আরেকটি দিক।
 
এই অ্যাপ থেকে আয়ের সুযোগ লোভনীয়। এর পরিণামও তেমনি সারা জীবনের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।
 
যৌনতাকে কি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে
 
সাইবার সেশনগুলো শেষ হওয়ার পর শুরু হয় বাস্তব জগতের জটিলতা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারান মো. আরাফ এমনটাই মনে করেন।
 
এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত নারীরা ব্ল্যাকমেইল হওয়ার বড় ঝুঁকিতে থাকেন। একই সাথে তাদের জন্য সাজার বিধানও বেশ কঠোর।
 
‘যদি কোনো নারী নিজের নগ্ন ভিডিও কারো সাথে শেয়ার করেন এবং সেই ব্যক্তি তা ছড়িয়ে দেন, তবে প্রচলিত আইনে ওই নারীকেই বড় অপরাধী হিসেবে দেখা হয়। কারণ তিনি পর্নোগ্রাফি তৈরির সঙ্গে তা বিতরণও করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ আনা হয়। আর যিনি এটি ফাঁস করেছেন তার অপরাধ তুলনামূলক কম ধরা হয়।’
 
তিনি বলেন, এই কারণেই নারীরা ন্যায়বিচার পান না।
 
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ অনুযায়ী, পর্নোগ্রাফি উৎপাদনকারী বা এতে অংশগ্রহণের জন্য চুক্তি সম্পাদনকারী ব্যক্তির সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
 
কিন্তু এটি বিতরণের জন্য সাজার মেয়াদ পাঁচ বছর এবং জরিমানা ২ লাখ টাকা পর্যন্ত।
 
চ্যাট রুমের আলাপচারিতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি সম্মতির ভিত্তিতে চ্যাট রুমে নগ্ন অবস্থায় থাকেন, তবে সেটি পর্নোগ্রাফির সংজ্ঞায় পড়ে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু সেই ভিডিও জমা রাখা, ছড়িয়ে দেওয়া এবং বারবার দেখা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।’
 
তবে আইন অনুযায়ী, কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের কথোপকথনে লিপ্ত হওয়া সরাসরি কোনো অপরাধ নয়।
 
তিনি আরও যোগ করেন, ‘কারণ আপনি যৌনতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে পারেন না’।
 
কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে এটি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়। হয়তো এটি বিনোদনের অভাবেরই একটি লক্ষণ।
 
সিআইডি যা বলছে
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নাগরিকদের ফোনে ‘জুয়ার অ্যাপ’ আছে কি না, তা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেক করার বেশ কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। গত ২৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া একটি বক্তব্যের পর এই তৎপরতা শুরু হয়। সেই বক্তব্যে তিনি ৩০ এপ্রিল থেকে ক্যাসিনো ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন।
 
এ বিষয়ে সিআইডি-র (মিডিয়া উইং) জসিমউদ্দিন খান ‘স্ট্রিম’-কে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে দুটি স্ট্রিমিং অ্যাপ সক্রিয় রয়েছে। আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সাইবার পুলিশ এখন পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পায়নি। এগুলোর মাধ্যমে কোনো সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়। তবে এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।’
 
নিয়ন্ত্রণ থাকলেও এই ঘটনাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই পুরো ব্যবস্থাটি অনেকটা ‘হাইড্রা’র মতো কাজ করে। এর একটি মাথা কেটে ফেললে আরেকটি গজিয়ে ওঠে। যখন একটি অ্যাপের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়, তখন সেটির জায়গা নিতে তৈরি থাকে শত শত অন্য অ্যাপ।
 
(এই প্রতিবেদনে সহযোগিতা করেছেন রাতুল আল আহমেদ ও এস এম নূরুজ্জামান)