সতর্কবার্তা: এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিশু যৌননিপীড়ক চক্র এবং শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্য পাঠকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। প্রতিবেদনটিতে চ্যাটিং অ্যাপগুলোর প্রকৃত নামের পরিবর্তে ‘অ্যাপ বি’ ও ‘অ্যাপ সি’ ব্যবহার করা হয়েছে।
দরকারি কাজে স্মার্টফোনটা হাতে নিয়েছেন। দু-একটা অ্যাপে এদিক-সেদিক স্ক্রল করতেই হঠাৎ ভেসে উঠল প্রায় অর্ধনগ্ন নারীদের একটি ভিডিও বিজ্ঞাপন। অস্বস্তিতে এদিক-সেদিক তাকিয়ে হয়তো আপনি দ্রুত বিজ্ঞাপনটি কেটে দিলেন।
সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে আপনি বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারলেও এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমেই দেশের লাখো তরুণের মুঠোফোনে পৌঁছে যাচ্ছে এমন অশ্লীল ভিডিও। নৈতিক স্খলনের কথা ভেবে আপনি হয়তো মুখ ফিরিয়ে নিলেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রলোভন দেখিয়ে এবং অভাবের সুযোগ নিয়ে দেশের তরুণ-তরুণীদের দিয়েই এসব ভিডিও তৈরি করানো হচ্ছে।
বাদ যাচ্ছে না অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু-কিশোররাও। এসব ভিডিও তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে।
অনুসন্ধানে ‘অ্যাপ বি’ এবং ‘অ্যাপ সি’র নাম উঠে এসেছে। এসব অ্যাপের বিরুদ্ধে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা এবং মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করার মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২০২১ সালের জুনে এমনই একটি লাইভ স্ট্রিমিং চক্র ধরা পড়ে। একজন চীনা নাগরিকসহ পাঁচজনকে সে সময় গ্রেপ্তার করা হয়। চক্রটি রাজধানীর এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। ওই ব্যবসায়ী পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) অভিযোগ করার পরই তাঁরা গ্রেপ্তার হন।
সে সময় সিআইডির ডিআইজি (সাইবার উইং) জামিল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমরা আরও কিছু নাম পেয়েছি। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের ব্যাংক এবং মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবে এখন পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। আমাদের সন্দেহ, বিভিন্ন লাইভ চ্যাটিং অ্যাপের মাধ্যমে আয় করা টাকার বড় অংশই দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে।’
তবে এসব গ্রেপ্তার ছিল মূল অপরাধজগতের সামান্য একটা অংশ। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে, অ্যাপ সির মতো অ্যাপ সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের সুযোগ করে দিচ্ছে। গেমের মতো হওয়ায় এই অ্যাপ ব্যবহারকারী ও কনটেন্ট নির্মাতা—উভয়ের জন্যই বেশ লাভজনক। ভাষা অনুবাদের সুবিধা থাকায় ভিনদেশিদের সঙ্গেও সহজে যুক্ত হওয়া যায়। কিন্তু এসব সুবিধার আড়ালেই ব্যবহারকারীরা পা বাড়াচ্ছেন এক ভয়াবহ অপরাধজগতের দিকে।
যেভাবে কাজ করে এসব অ্যাপ
অ্যাপ সি কাজ করে বেশ গোপনে। এতে লগ-ইন করার জন্য কোনো ভেরিফিকেশন বা পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হয় না। শুধু একটি স্মার্টফোন থাকলেই অ্যাপটি নামানো যায়।
ব্যবহারকারী এবং কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এর ব্যবসার ধরন আলাদা। ব্যবহারকারী যদি কারও সঙ্গে একান্ত বা প্রাইভেট ভিডিও কলে কথা বলতে চান, তবে তাঁকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘গোল্ড ডায়মন্ড’ খরচ করতে হবে।
কত ডায়মন্ড খরচ হবে, তা নির্ভর করে কনটেন্ট নির্মাতার ‘লেভেল’ বা স্তরের ওপর। লেভেল যত বেশি হবে, কলের খরচও তত বাড়বে। উদাহরণস্বরূপ, লেভেল ৫-এর একজন কনটেন্ট নির্মাতার সঙ্গে কথা বলতে প্রতি মিনিটে ২ হাজার গোল্ড ডায়মন্ড খরচ করতে হয়।
ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে অ্যাপ থেকে সরাসরি এসব ডায়মন্ড কেনা যায়। ১৫০ টাকায় প্রায় ৪ হাজার ডায়মন্ড পাওয়া যায়। বেশি কিনলে ছাড়ও থাকে। কার্ড না থাকলে ‘টপ-আপ হেল্পার’দের মাধ্যমেও ডায়মন্ড কেনা যায়।
অ্যাপ বি-তেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সেখানে ব্যক্তিগত আলাপের পাশাপাশি গ্রুপ চ্যাটে অংশ নেওয়ার প্রলোভন রয়েছে। অ্যাপগুলোর আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো—অ্যাপের নিজস্ব মুদ্রা আয় করতে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন গেমে বাজি ধরতে পারেন, যা পুরোপুরি জুয়ার মতোই।
অ্যাপে প্রবেশের পরপরই স্মার্টফোনের পর্দায় বিভিন্ন ‘কনটেন্ট নির্মাতা’র ছবি ভেসে ওঠে। লাইভ সম্প্রচারে পর্নোগ্রাফি, অপ্রাপ্তবয়স্কদের উপস্থিতি বা অবৈধ কনটেন্টের বিষয়ে অ্যাপটির সতর্কতা রয়েছে। কিন্তু কনটেন্ট নির্মাতারা তাদের ভিডিওর যে শিরোনাম দেন, তাতে আসল উদ্দেশ্য বুঝতে আর বাকি থাকে না।
চ্যাটের ইঙ্গিতপূর্ণ ধরন দেখলেই বোঝা যায় এর গন্তব্য কোথায়, বিশেষ করে ভিডিও কলগুলো যখন প্রাইভেট হয়।
স্ট্রিমের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে ১০০টি প্রোফাইল যাচাই করে দেখা গেছে, এর মধ্যে অন্তত ২৪টি অপ্রাপ্তবয়স্কদের। এসব প্রোফাইলে ‘স্টুডেন্ট’ (শিক্ষার্থী) ট্যাগ দেওয়া থাকে। সেখানে ক্লিক করলে অন্যান্য শিক্ষার্থীর প্রোফাইলও সামনে চলে আসে।
একাধিক অতিথির অংশগ্রহণে চলা এমন একটি লাইভ সেশনে এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, ‘তোমার ছোট বোনকে আনছ না কেন?’
অ্যাপ বি লাইভ স্ট্রিমিং, ভার্চ্যুয়াল উপহার, একাধিক গেস্টরুম এবং কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়। তবে তারা দাবি করে, নজরদারির জন্য তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে। অন্যদিকে, অ্যাপ সির রয়েছে ওয়ান-টু-ওয়ান ভিডিও কল, রিয়েল-টাইম অনুবাদ এবং পার্টি রুম। ভুয়া অ্যাকাউন্ট কমাতে তাদের একটি যাচাই ব্যবস্থাও রয়েছে।
টার্গেট পূরণের ইঁদুরদৌড়
‘সুইট হার্ট’ (ছদ্মনাম) নামের একজন কনটেন্ট নির্মাতার প্রোফাইল যাচাই করে দেখা গেছে, নিজের ‘লেভেল’ বাড়ানোর চাপে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইভে বসে থাকছেন। তাঁর লাইভ স্ট্রিমিং বিনা খরচে ২০ মিনিট পর্যন্ত দেখা যায়।
তিনি তাঁর বেশির ভাগ সময় কাটান ব্যবহারকারীদের সঙ্গে গল্প করে এবং তাঁকে উপহার পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে। তাঁর সাধারণ লাইভ সম্প্রচারগুলোতে অ্যাপের কোনো নিয়ম ভঙ্গ হয় না। তবে ক্যামেরার সামনে তিনি যেভাবে ঝুঁকে বসেন, তা দেখে ব্যবহারকারীরা দ্রুতই তাঁকে একান্ত বা প্রাইভেট কলে আসার জন্য চাপ দিতে থাকেন।
এ পর্যায়ে সুইট হার্ট হাসিমুখে জানান, তিনি ভীষণ ক্লান্ত। তিনি বলেন, ‘আমি খুব অসুস্থ, প্রচণ্ড জ্বর। এ জন্যই বেশি সময় থাকতে পারছি না। তবে আমাকে লেভেল আপ করতে হবে। জানি না কীভাবে করব, কাজ হচ্ছে না। কিন্তু টার্গেট পূরণ করতে আমাকে লাইভে থাকতেই হবে।’
একেকজনের টার্গেট একেক রকম হলেও এর পদ্ধতি একই। কনটেন্ট নির্মাতারা প্রতিটি গোল্ড ডায়মন্ডকে ‘বিন’-এ রূপান্তর করতে পারেন। লেভেল ১-এর একজন কনটেন্ট নির্মাতা মিনিটে ১ হাজার ২০০ বিন আয় করতে পারেন। আর লেভেল ৯-এর কেউ পারেন ৬ হাজার বিন।
১০ হাজার বিনে এক ডলার হয়। তবে অ্যাপ সি প্ল্যাটফর্ম ফি হিসেবে আয়ের ৪০ শতাংশ কেটে রাখে। এত টাকা কেটে নেওয়ার পরও সুইট হার্ট মাসে অনায়াসেই ৩০০ ডলার (প্রায় ৩৩ হাজার টাকা) আয় করেন বলে জানান। ওপরের সারির কনটেন্ট নির্মাতারা আরও বেশি আয় করেন।
অনেক নির্মাতা গোপনীয়তা বজায় রাখতে মুখে মাস্ক ব্যবহার করেন। লাইভে আসা মন্তব্যগুলোও তাঁদের শালীনতার সীমা ছাড়াতে উসকানি দেয়। এত বিপুলসংখ্যক নির্মাতার ওপর সরাসরি নজরদারি রাখাও একপ্রকার অসম্ভব।
অনেক সময় তাঁরা হয়তো খুব সাধারণ কাজই করেন। যেমন- পানি পান করা, খাওয়া দাওয়া বা শুধু ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বসে থাকা। কিন্তু এই সাধারণ কাজগুলোতেও প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্টের মতোই অশ্লীল মন্তব্য আসে।
অ্যাপ সি বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গেও কাজ করে। অ্যাকাউন্টে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা হলে তা সরাসরি তুলে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মূলত এই এজেন্সিগুলোতেই বহুস্তরের প্রতারণা চক্রের আভাস মেলে।
সন্দেহজনক এজেন্ট, অস্বচ্ছ লেনদেন
অনেক অ্যাপের ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হলো এমন একটি হোস্ট বা এজেন্সি খুঁজে বের করা, যারা আপনাকে নিয়োগ দেবে, অ্যাকাউন্ট খুলে দেবে, প্রশিক্ষণ দেবে এবং আয়ের পথ নিশ্চিত করবে।
এজেন্সি খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিন নয়। ফেসবুকে এমন ‘লোভনীয়’ চাকরির প্রস্তাবে ভরা অসংখ্য পেজ রয়েছে। এসব পেজের বিজ্ঞাপনও বেশ আকর্ষণীয়।
এমন একটি বিজ্ঞাপনে লেখা, ‘অ্যাপ পির জন্য হোস্ট প্রয়োজন (জরুরি নিয়োগ)! আপনি কি স্মার্ট, মেধাবী এবং ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী? তাহলে এটি আপনার জন্য একটি দারুণ সুযোগ! মাসে ১৫,০০০ - ৫০,০০০+ টাকা আয় (কাজের ওপর নির্ভরশীল) + বোনাস ও উপহার থেকে আয়, প্রতি সপ্তাহে পেমেন্ট।’
এই চাকরিতে আসলে কী করতে হয়? বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘লাইভে আসুন এবং দর্শকদের সঙ্গে কথা বলুন। গান, গল্প, আড্ডা বা নিজের প্রতিভা তুলে ধরুন। প্রতিদিন মাত্র ২-৩ ঘণ্টা লাইভে থাকলেই চলবে।’
এমন পোস্টে মন্তব্য করলেই আপনাকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হবে। সুইট হার্টের মতো অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দর্শকদের ধরে রাখা এবং সম্পৃক্ততা বাড়ানোর এই তাগিদটাই একসময় ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।
ফেসবুকের একটি পেজের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে একটি এজেন্সি জানায়, ‘অনৈতিক কিছু করার কোনো দরকার নেই। তবে দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখতে আপনাকে অবশ্যই ভালো ব্যবহার করতে হবে।’ সরাসরি কোনো নির্দেশ দেওয়া না হলেও, কথার পেছনের ইঙ্গিতটা ছিল স্পষ্ট।
এজেন্সিগুলোর আরেকটি নির্দেশ হলো—আপনাকে আরও হোস্ট বা লাইভকারী খুঁজে আনতে হবে। নির্দিষ্টসংখ্যক হোস্ট জোগাড় করতে পারলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। আপনি যদি বিশ্বস্ত নিয়োগকারী হিসেবে প্রমাণ দিতে পারেন, তবে অগ্রিম টাকাও পাওয়া যায়।
এসব লেনদেনের বেশির ভাগই হয় অনলাইনে। ফলে সম্ভাব্য হোস্ট ও এজেন্টদের সামনাসামনি দেখা হওয়ার সুযোগ খুব কম। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, আপনি যত বেশি হোস্ট নিয়ে আসবেন, আপনার আয়ও তত বাড়বে। আপনার আয়ের একটি কমিশন কেটে নেন এজেন্টরা।
যেহেতু তাঁরাই আপনাকে অ্যাকাউন্ট খুলে দেন, তাই অ্যাকাউন্টের পুরো নিয়ন্ত্রণও তাঁদের হাতেই থাকে। অনেক সময় তাঁরা টাকা আটকে দেন। এমনটি ঘটলে এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
পুলিশ কী বলছে
সম্প্রতি রাস্তায় নাগরিকদের মুঠোফোন চেক করে ‘জুয়া খেলার অ্যাপ’ খুঁজছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা—এমন বেশ কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। গত ২৭ এপ্রিল ক্যাসিনো ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার পরই এমন তৎপরতা দেখা যায়।
তবে জুয়ার পাশাপাশি বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে এসব অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের শোষণ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের সাইবার ক্রাইম ইউনিট জানিয়েছে, লাইভ চ্যাটিং অ্যাপে কেউ ব্ল্যাকমেইল বা প্রতারণার শিকার হলে তাঁরা যেন অভিযোগ করেন।
২০২১ সালে অ্যাপ বির কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে অভিযানের সময় উপস্থিত থাকা ডিবির সাইবার (নর্থ) বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার ঢাকা স্ট্রিমকে জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অভাবে অ্যাপ বি ও অ্যাপ সির বিরুদ্ধে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি।
তিনি বলেন, ‘অনলাইন ব্যবহারকারীরা প্রায়ই বিভিন্ন লাইভ চ্যাটিং অ্যাপের বিজ্ঞাপন দেখেন। তবে গত এক বছরে এসব অ্যাপের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি। অভিযোগ পেলেই আমরা তদন্ত শুরু করব।’
সাইবার জগতের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘সাইবার জগতে লাখ লাখ জুয়া এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সাইট রয়েছে। সীমিত জনবল দিয়ে সার্বক্ষণিক সব সাইট নজরদারি করা কঠিন। এ কারণেই আমরা মূলত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’
অ্যাপেই সর্বস্বান্ত
ময়মনসিংহের পরাণগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা মানিক হোসেনের (ছদ্মনাম) একটি ছোট মুদিদোকান ছিল। ২০১৯ সালের দিকে তিনি স্মার্টফোন কেনেন। এরপরই অ্যাপ বির লাইভের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং এর খুব সক্রিয় একজন ব্যবহারকারী হয়ে ওঠেন।
এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানিক দোকান খোলা রেখে সব সময় মুঠোফোনের দিকেই তাকিয়ে থাকতেন। একসময় এই অ্যাপগুলোতে টাকা ওড়াতে শুরু করেন তিনি।
মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মানিকের দোকানে বিক্রি কমে যায়, আয়ও কমতে থাকে। দুই বছরের মাথায় মানিক তাঁর দোকানটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।
ঘটনার প্রায় ছয় বছর পর আজ মানিক সে সময়কার ঘটনা নিয়ে কোনো কথাই বলতে চান না। তাঁকে এখন আর আগের মতো মুঠোফোন ঘাঁটতেও দেখা যায় না। তবে মানিকের এই পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
অ্যাপ বির পাশাপাশি অ্যাপ সির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে আপত্তিকর কনটেন্টের জেরে গুগল যখন প্লে স্টোর থেকে অ্যাপ সি সরিয়ে দেয়, তখনো মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তালিকার শীর্ষে ছিল এই দুটি অ্যাপ।
শুধু বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া গেলেও ডেটা ডট এআইয়ের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ভারতে ব্যবহারকারীরা অ্যাপ সির পেছনে ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন।
এর আগের বছর এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে এই অ্যাপে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে।
প্লে স্টোরে অ্যাপটি ৫ কোটি বারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে। পুনরায় প্লে স্টোরে ফেরার পর এর রেটিং এখন ৪ দশমিক ৩ স্টার।
এরই মধ্যে কিছু এজেন্সি অভিযোগ করতে শুরু করেছে যে তাদের আইডিগুলো সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। তবে এই পুরো চক্রটি রূপকথার দানব ‘হাইড্রা’র মতো কাজ করে। এর একটি মাথা কাটলে আরেকটি গজিয়ে ওঠে। কোনো একটি অ্যাপের বিরুদ্ধে অভিযান চললে, তার জায়গা নিতে আরও শত শত অ্যাপ প্রস্তুত থাকে।
এই ধারাবাহিকের আগামী পর্বে আমরা দেখব, কীভাবে এসব নেটওয়ার্ক মানুষের জীবন ধ্বংস করছে, কীভাবে একটি সাংস্কৃতিক শূন্যতা এসব কাজকে উৎসাহিত করছে এবং এ বিষয়ে আইনে কী বলা আছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন এস এম নুরুজ্জামান ও মাইদুল ইসলাম]