কিলিয়ান এমবাপ্পে মাথা নোয়ালেন। ঘাসের দিকে তাকিয়ে ছিলেন অন্তত এক মিনিট। শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে। সতীর্থ আরও কয়েকজন মাঠ ছাড়তে চাচ্ছিলেন না। সান্ত্বনা দেয়ার মতো কেউ নেই। পুরো টিমই বিধ্বস্ত। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের চিত্র এটাই। খেলার খবর সবাই জানেন। ফরাসিদের বিশ্বকাপের স্বপ্ন ছিনিয়ে নিয়েছে স্পেন। চারদিকে আলাপ ছিল- এই অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সকে কে থামাবে। কিন্তু স্পেন থামিয়েই দিলো। নাটকীয় ফলাফল। ভাষ্যকাররা বলছিলেন, বল ফ্রান্সের জাল চিনে ফেলেছে। একের পর এক গোল যেভাবে হচ্ছিল তাতে এটা মনে হওয়ারই কথা। মাঝ মাঠেই খেলা হয় প্রথমার্ধে। পেনাল্টি ছাড়া এমন কোনো অ্যাকশন ছিল না। ফরাসিদের ভয় ছিল ইয়ামালকে নিয়ে। সেই ইয়ামালই তাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। ইয়ামাল কখন যে ডি বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন তা টেরই পাননি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে। বল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ইয়ামালের শরীরে টাচ লাগে। এরপর যা হওয়ার তাই হলো। নির্ভেজাল পেনাল্টি। এই নিখুঁত পেনাল্টি শট নিলেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। এ নিয়ে বিশ্বকাপে তার গোল সংখ্যা হলো ৫। খেলার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় স্পেনের হাতে। খেলা দেখে মনে হচ্ছিল- ফ্রান্সকে ফুটবলের প্রথম পাঠ শেখাচ্ছে স্পেন। সেমিফাইনালের মতো খেলা নয়। যদিও এই খেলা ঘিরে অনেক হিসেব-নিকেশ ছিল। ফ্রান্সের সাবেক অধিনায়ক প্যাট্রিক ভিয়েরা আইটিভিকে বলেছেন, পুরো টিমে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। জানি না তারা এই স্প্যানিশ দলটিকে নিয়ে অতিরিক্ত ভয় পেয়েছিল কিনা। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মতো ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের অভাব ছিল তাদের মধ্যে। কিলিয়ান এমবাপ্পে বলের জন্য হা-হুতাশ করছিলেন। এক পর্যায়ে মনে হলো তিনি সেন্ট্রাল স্ট্রাইকার হিসেবে খেলছেন না। তিনি ডানে-বামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বল খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। খেলায় আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে চাচ্ছেন। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। স্পেনের খেলাটা সত্যি অসাধারণ ছিল। তারা এমনভাবে বল ঘুরাচ্ছিল তখন ফরাসিদের চরম অসহায়ত্ব দেখে কে! কিন্তু পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে অত্যন্ত উজ্জ্বল ছিল ফরাসিদের আক্রমণভাগ। তবে ওলিসে এবং দেম্বেলের পারফরম্যান্স ছিল বেশ হতাশাজনক। নির্মম সত্য হলো- ফরাসি শিবিরে আর কোনো আলোর ঝলকানি দেখা যায়নি। স্পেন আসলেই এক অসমান্য ম্যাচ খেলেছে। বিখ্যাত ফরাসি দৈনিক লেকিপ বলেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে ফ্রান্স সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। স্পেনের কাছে হারাটা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। ২০২৪ ইউরোর পর ফরাসিদের বিপক্ষে আরও একবার নিজেদের আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি ঘটালো স্প্যানিশরা। ফরাসি বাস্তিল দিবসে এই পরাজয়ে সবকিছু ম্লান হয়ে গেল। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছা হলো না তাদের।
ম্যাচের কিছু অংশে স্পেনের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের সামনে ফ্রান্সের কোনো প্রতিরোধ গড়ে না ওঠায় তৈরি হয়েছিল অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। পেনাল্টির আট মিনিট পর ফরাসি শিবিরে দুঃস্বপ্ন নেমে আসে। পিঠের ব্যথার কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন দলের নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা। এরপর ফ্রান্স কেমন যেন খেলার গতি হারিয়ে ফেলে। চূড়ান্ত পর্যায়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে স্পেন। আর গোলের জন্য সব প্রশংসা পাচ্ছেন পেদ্রো পোরো। স্পেনের গোটা টিমের বিল্ডআপও ছিল চমৎকার। কুকুরেয়ার নাম উল্লেখ করতেই হয়। পোরোর পাস দেয়া এবং সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াটাও ছিল দারুণ। যদিও ফ্রান্স কয়েকবার চেষ্টা করেছিল স্পেনের জালে বল পাঠাতে। কিন্তু সবই ছিল এলোমেলো, নিয়ন্ত্রণহীন। এমবাপ্পেকে যেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি, পুরো টিমটার অবস্থাও ছিল নাজুক। ম্যাচটি শেষ হয় গ্যালারিতে উপস্থিত স্প্যানিশ সমর্থকদের বিপুল আনন্দধ্বনি আর ওলে ওলে স্লোগানের মধ্য দিয়ে। ফরাসি শিবিরে তখন কান্না।