বিশ্বকাপ ফুটবল হোক কিংবা প্রিয় ক্লাবের বা ঘরোয়া কোনো ফুটবল ম্যাচ সবটাই উন্মাদোনার সৃষ্টি করে। তবে ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় একটা বাড়তি চাপ থাকে লাল কার্ড বা হলুদ কার্ডের। একজন খেলোয়াড়ের লাল কার্ড পাওয়া অনেক সময় ম্যাচটার মোর ঘুরিয়ে দেয়।
ফুটবলে আজ যে লাল ও হলুদ কার্ড শাস্তির নিয়ম আমরা দেখি, তার পেছনের ইতিহাস শুরু হয়েছিল মাঠের বিশৃঙ্খলা, ভাষাগত বিভ্রান্তি এবং আধুনিক রেফারিং ব্যবস্থাকে আরও পরিষ্কার করার প্রয়োজন থেকে। এর শিকড় অনেক দূর অতীতে গেলেও, আধুনিক কার্ড ব্যবস্থার ধারণাটি মূলত ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপের ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ থেকে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে ১৯৭০ বিশ্বকাপে পূর্ণ রূপ পায়।
১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে ইতালি ও স্বাগতিক চিলির মধ্যকার ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে কুখ্যাত ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ নামে পরিচিত। ম্যাচটি ছিল অতি মাত্রায় আক্রমণাত্মক, যেখানে বারবার ফাউল, মারামারি এবং রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। ওই সময় রেফারিরা খেলোয়াড়দের শাস্তি দিতে পারতেন শুধু মুখে সতর্ক করা বা সরাসরি মাঠ থেকে বের করে দেওয়া (সেন্ড-অফ)। কিন্তু সমস্যা ছিল এই সতর্কতা বা শাস্তি অন্যদের কাছে স্পষ্টভাবে বোঝানো যেত না, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ম্যাচে যেখানে ভাষাগত বাধা ছিল বড় সমস্যা। এই ম্যাচটি পরবর্তীতে ফুটবল কর্তৃপক্ষকে রেফারিং ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
তবে কার্ড ব্যবস্থার প্রকৃত ধারণা আসে ইংল্যান্ডের রেফারি কেন অ্যাস্টন-এর কাছ থেকে। তিনি ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচে একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হন, যেখানে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাটিনকে যখন রেফারি মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন।
তবে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক রেফারির জার্মান ভাষা বুঝতে পারেননি। ফলে তিনি মাঠ ছেরে যাচ্ছিলেন না। তখন মাঠে আসেন ইংল্যান্ডের রেফারি কেন অ্যাস্টন। তিনি কিছুটা স্প্যানিশ বুঝতেন এবং বলতে পারতেন। তিনিই আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে স্প্যানিশে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন। তবে অন্য খেলোয়াড়রা এবং দর্শকরা বুঝতে পারেনি ঠিক কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অ্যাস্টন তখনই ভাবেন, রেফারির সিদ্ধান্তকে এমনভাবে দেখাতে হবে যা ভাষা ছাড়াই সবাই বুঝতে পারে।
সেদিনই তিনি ম্যাচ শেষে বাড়ি ফেরার সময় ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন তার নজরে আসে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল-হলুদ রঙের লাইটের ধারণা। হলুদ মানে সতর্কতা, আর লাল মানে সম্পূর্ণ থামা বা বহিষ্কার। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘রঙের কার্ড’ ধারণা। এই সহজ ভিজ্যুয়াল সিস্টেমই পরবর্তীতে ফুটবলের ইতিহাসে বিপ্লব আনে।
অবশেষে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে হলুদ ও লাল কার্ড ব্যবহার শুরু করে। এই বিশ্বকাপেই ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবার খেলোয়াড়রা কার্ড দেখে শাস্তি পায়, যা রেফারিং ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। হলুদ কার্ড দেওয়া হয় সতর্কতার জন্য এবং লাল কার্ড দেওয়া হয় সরাসরি মাঠ থেকে বহিষ্কারের জন্য। এর ফলে খেলায় শৃঙ্খলা অনেক বেড়ে যায় এবং রেফারির সিদ্ধান্ত আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
এরপর থেকে বিশ্ব ফুটবলে কার্ড ব্যবস্থা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ক্লাব ফুটবল, ইউরোপিয়ান লিগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এটি বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম আরও উন্নত হয়। এক ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড মানে লাল কার্ড, ফাউলের ধরন অনুযায়ী সরাসরি লাল কার্ড, এমনকি ভিএআর যুগে এসে কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল করা হয়েছে।
বিশ্বকাপে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিডফিল্ডার কাখি আসাতিয়ানি। ৩১ মে ১৯৭০ ফিফা বিশ্বকাপে সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম মেক্সিকো ম্যাচে তিনি প্রথম হলুদ কার্ড পান। ১৯৭০ বিশ্বকাপে কার্ড ব্যবস্থা চালু হলেও, সেই আসরেই কোনো লাল কার্ড দেখানো হয়নি।
প্রথম লাল কার্ড দেখানো হয় চার বছর পর, ১৯৭৪ বিশ্বকাপে। ১৪ জুন চিলি বনাম পশ্চিম জার্মানি ম্যাচে রেফারি দোগান বাবাচান চিলির ফরোয়ার্ড কাসেলি কাসজেলিকে একটি ফাউলের কারণে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন। এটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার কোনো খেলোয়াড়কে আনুষ্ঠানিকভাবে লাল কার্ড দিয়ে বহিষ্কার করা। যা গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও জায়গা করে নেয়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে কার্ড ব্যবস্থার প্রভাব বিশাল। এটি খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেছে, খেলাকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ করেছে এবং রেফারিদের ক্ষমতাকে স্পষ্ট করেছে। যদিও কখনো কখনো বিতর্ক তৈরি হয়, তবুও কার্ড ব্যবস্থা ফুটবলের শৃঙ্খলার অন্যতম ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজকের আধুনিক ফুটবলে লাল ও হলুদ কার্ড শুধু শাস্তির প্রতীক নয়, বরং খেলায় ন্যায্যতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার একটি বৈশ্বিক ভাষা। ১৯৬২ সালের উত্তাল মাঠ থেকে শুরু হয়ে ১৯৭০ বিশ্বকাপের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এই দীর্ঘ যাত্রাই ফুটবলকে করেছে আরও সংগঠিত, নিরাপদ এবং দর্শকপ্রিয়।
সূত্র: বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস