Image description

সালাম ও শুভেচ্ছা রইলো। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি শপথ নিয়েছেন ১৭ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে। সেই হিসেবে আজ রোববার (যখন লিখতে বসেছি) পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিন। এই অল্প সময়ে আপনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন যা সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। সরকারি গাড়ির পরিবর্তে নিজের গাড়ি ব্যবহার করছেন। প্রটোকলে ১২টি গাড়ি ব্যবহারের পরিবর্তে ৪টি গাড়িতে নামিয়ে এনেছেন। আপনার চলাচলের সময় রাস্তায় এবং মোড়ে মোড়ে আইনশঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দাঁড়িয়ে থাকার রেওয়াজ ভেঙে দিয়েছেন। গাড়িতে কেবল রাষ্ট্রীয় অতিথি বা বিদেশি প্রধানদের সফরের সময় জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন। নিয়মিত চলাচলে পতাকা থাকবে না। মন্ত্রীরা আর বিলাসবহুল সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না। তাঁরা সাধারণ সাদা টয়োটা গাড়িতে চলবেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত পরিবহনব্যবস্থাই ব্যবহার করবেন। সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত চালক বা সরকারি জ্বালানি তাঁরা ব্যবহার করবেন না। এগুলো নিঃসন্দেহেই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এসব পদক্ষেপ প্রশংসা কুড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে সড়কপথে প্রটোকলের জনভোগান্তি দূর করার বিষয়টা এক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেখা গেছে, ভিভিআইপি প্রটোকলের নামে দীর্ঘক্ষণ পথ আটকে রাখা হতো। এতে যে জানজটের সৃষ্টি হতো এর প্রভাব পড়তো ওই দিন গোটা শহরেই। প্রতিটি সড়কে দিনভর যানজট লেগে থাকতো। শুধু ভিভিআইপি-ই নয়, এই উছিলায় মন্ত্রীদেরসহ অন্য অনেক ভিআইপিকে অতিরিক্ত প্রটোকল দিতে গিয়ে রাজধানীর সড়কপথের বারোটা বেজে যেতো।

আপনার এ পদক্ষেপের কারণে আশা করা যায়, প্রটোকলজনিত ভোগান্তি থেকে নগরবাসী অনেকটাই মুক্তি পাবে। তবে শুধুমাত্র প্রটোকলই যে রাজধানীর যানজটের একমাত্র কারণ- তা নয়। গাড়ির চাপ, বিশৃঙ্খলা, আইন না মানা, ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা ও ঘুষের লোভ প্রভৃতি কারণে যানজট লেগেই থাকছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাটারিচালিত রিকসার যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে গেছে, তা থেকে নগরবাসীকে কীভাবে মুক্তি দেবেন এ নিয়ে ভাবা উচিত। এ ইস্যুটি নিয়ে যাদের ভাবার কথা, তাদেরই একজন হলেন সড়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ‘টক শো’ ক্রাইটেরিয়ায় তিনি মন্ত্রী হয়েছেন বলে কথা উঠেছে। টিভিতে কথা বলার অভ্যাস এমন করে ফেলেছেন যে, কোনো কিছু বলতে আর মুখে বাধছে না তাঁর। শুরুতেই সরকারকে বিপাকে ফেলেছেন চাঁদা ইস্যুতে ‘সমঝোতায় টাকা নেওয়ার’ কথা বলে। এ বক্তব্যে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, আপনি যা কিছুটা অর্জন করেছেন সবটাই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন ইঁচড়ে পাকা এই মন্ত্রী। গণমাধ্যমগুলোয় এমন প্রতিবেদনও তুলে ধরা হয়েছে, “সড়কে চাঁদাবাজির বৈধতা দিলেন মন্ত্রী!” আমি মনে করছি, এসব ব্যাপারে আপনাকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। মন্ত্রীদের বা দলের কারো অতি বাড়াবাড়ি, ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অপকর্মের দায় আপনার, দলের বা সরকারের নেওয়া উচিত হবে না। এতে জনপ্রিয়তার ওপর আঘাত আসে। জনপ্রিয়তা এভাবেই কিন্তু ক্রমান্বয়ে এক পর্যায়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। ফামিলি কার্ড, খাল খনন, সরকারী প্লট-শুল্কবিহীন গাড়ী না নেওয়া- এ পদক্ষেপগুলোও চরমৎকার শুভ সূচনা। আপনি বাবা-মায়ের ছবির পরিবর্তে কালেমা টাঙিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে, এটাও নিঃসন্দেহেই প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।

কেমন হলো মন্ত্রিসভা?
আপনার নতুন মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, কেমন হলো? শুরুর দিকে শোনা গিয়েছিল, মন্ত্রিপরিষদের আকার তেমন একটা বড় হবে না, মাঝারি গোছের হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ১০ উপদেষ্টাসহ মন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়ালো ৫৯-এ। এত বড় সাইজের মন্ত্রিসভা সরকারের শুরুতেই হবে, এমনটি কেউ মনে করেনি। বিশেষ প্রয়োজনে মন্ত্রিপরিষদে পরবর্তীতে নতুন কাউকে নেবেন সেই সুযোগও আর থাকলো না। উপদেষ্টাদের কথা বাদ দিলেও ৪৯ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ৪০ জনই প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেন। অর্থাৎ মাত্র ৯ জন মন্ত্রীর পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। ২৫ মন্ত্রীর মধ্যে ১৬ জন এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সকলেই নতুন মুখ। এদের অনেকে আছেন, জাতীয় সংসদে নতুন এমপি হয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ আছেন, যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ে এই প্রথম ঢুকলেন। এদেরই একেক জনকে দেওয়া হয়েছে দুই-তিনটি করে মন্ত্রণালয়। এই নতুন মন্ত্রীদের অনেকেরই দুই-তিনটি করে মন্ত্রণালয়, আবার প্রতিমন্ত্রীদেরও দুই-তিনটি করে মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছে। অনেকটা অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতোই পরিস্থিতি হয়েছে। এতে মন্ত্রীরা কোনো মন্ত্রণালয়েই সঠিকভাবে সময় দিতে পারছেন না। পাশাপাশি নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় যেতে হবে তাদের। অন্যথায় নির্বাচনী এলাকার মানুষ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। ভোটাররা দোষারোপ করে বলবেন, ভোট নিয়ে চলে গেছেন মন্ত্রী। আর দেখা নেই।

আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, অধিকাংশ মন্ত্রিসভা বৈঠক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নয়, সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সরকার এবং প্রশাসনে গতি আনার জন্য এটি কার্যকর উদ্যোগ নিঃসন্দেহেই। তবে এমন সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে, আপনি এখন থেকে নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করবেন। এবং তা শুরু করেছেনও। এতে প্রশাসন সর্বক্ষণ তটস্থ থাকবে, কর্মচাঞ্চল্যতা বজায় থাকবে। সেদিক থেকে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এর নেতিবাচক দিকও কম নয়। আপনি সচিবালয়ে অফিস করার কারণে মন্ত্রীরা এলাকায় যাওয়ার সুযোগ কম পাবে। তাতে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশংকা বাড়বে। বাইরের যারা ব্যক্তিগত কাজকর্মে সচিবালয়ে আসতেন তাদের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। তাছাড়া আপনার সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অসতর্কতা থেকেই বিপদাপদের সূত্রপাত হয়।
আমি মনে করি, সরকার এবং প্রশাসনে কর্মচাঞ্চল্য বা গতিশীলতা আনার জন্য নিজের সার্বক্ষণিক উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। জবাবদিহীতা আদায় করাটাই একমাত্র উত্তম পন্থা। আজকালকার যুগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ঘরে বসেই জবাবদিহীতা আদায় করা যায়। যাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হলো তিনি যথাসময়ে সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করছেন কিনা, এ জবাবদিহীতাই যথেষ্ট।

আপনার সামনে রয়েছে, দুর্নীতির টুটি চেপে ধরা, ন্যায় ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো পাহাড়সম বড় বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য যোগ্য প্রশাসন গড়ে তোলা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে জবাবদিহীতা আদায় করার কাজে হাত দিতে হবে আপনাকে। নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে শুরুতেই ফ্যামিলি কার্ড-এর কর্মসূচিতে হাত দিয়েছেন। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়েও আপনাকে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। আশংকা রয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ নিয়ে অনিয়ম ও বৈষম্যের। তাছাড়া এটি সরকারের জন্য নতুন একটি বড় রকামের ব্যয়ের খাত। এমনিতে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারের জন্য ২৩ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা রেখে গেছে। কর্মসংস্থান, আয় ও উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে নতুন সরকারকে। এ কাজগুলো মোটেই সহজ নয়।

সরকার গুপ্ত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে- প্রশাসনে হতাশা!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শহীদ প্রেসিডেন্টে জিয়াউর রহমানের সাধারণ জীবন-যাপন, কৃচ্ছতা সাধনের নীতিকে আপনি অনুসরণ করেছেন- এটা নিঃসন্দেহেই বড় রকমের ইতিবাচক দিক। কিন্তু শীর্ষকাগজের বিগত সংখ্যার মন্তব্য প্রতিবেদনে আপনার উদ্দেশ্য যে কথাগুলো তুলে ধরেছিলাম তা থেকে আপনি এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছেন বলে মনে হচ্ছে। “জনাব তারেক রহমান, সরকার পরিচালনায় কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যোগ্য কর্মকর্তা বাছাই করুন” শিরোনামে ওই লেখায় আমি যোগ্য কর্মকর্তা বাছাইয়ের বিষয়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের কর্মপদ্ধতিকে অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছিলাম। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আপনি সেদিকে নজর দেননি এখনো।

প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর কাজে আপনি হাতই দেননি। যদিও এটা সবার আগে প্রয়োজন। সবকিছুর আগে হাত দেওয়া উচিত সৎ, দক্ষ, যোগ্য, কর্তব্যনিষ্ঠ ও স্থিতিশীল প্রশাসন গড়ে তোলার কাজে। আমি আশা করছি, এ বিষয়ে দ্রুতই পদক্ষেপ নেবেন। অন্যথায় সরকারের কোনো কর্মসূচিই সঠিকভাবে এগোবে না।

আমার আজকের লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো, এখন পর্যন্ত যে কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন এদের সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরা। বিশেষ করে আপনার ব্যক্তিগত অনুবিভাগে প্রশাসনের যাদের নিয়োগ দিয়েছেন এরা হলেন একান্ত সচিব-১ মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী, সহকারী একান্ত সচিব-১ মোহাম্মদ মামুন শিবলী এবং প্রটোকল অফিসার-১ পদে মো. উজ্জল হোসেন। এই তিনটি পদকেই মূলতঃ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উইংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এই তিন কর্মকর্তাই এসেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। এ ব্যাপারে প্রথম কথা হলো, বিগত সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এরা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছিলেন- বিএনপির নাকি জামায়াতের? এ প্রশ্নের উত্তর কারো অজানা নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াত বেছে বেছে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এরা সবাই আপনার ভাষায় ‘গুপ্ত’ সংগঠনের সদস্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিগত সময়ে বিএনপির কোনো সুপারিশই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় শোনেনি। দেশব্যাপী জামায়াতের প্রশাসন সাজানোর কাজে এরা প্রত্যেকে ওই সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রথমে আসা যাক মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদীর বিষয়ে। সংক্ষেপে ‘ফরিদী’ নামেই পরিচিত তিনি। সারাদেশের জনপ্রশাসনে বহুল আলোচিত এ নামটি, যদিও তিনি আদতে প্রশাসনের নয়। ইকোনোমিক ক্যাডারের সদস্য এই কর্মকর্তা ২০১৮ সালে প্রশাসনে একীভূত হন। ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর আগে আওয়ামী লীগ আমলে পদোন্নতিতে কখনো বাদ পড়েননি। পদায়নেও গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। একমাত্র আওয়ামী লীগ এবং গুপ্ত জামায়াতেরই এ ধরনের পদায়ন পাওয়া সম্ভব ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পরে হঠাৎ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইংয়ের উনি-২ শাখায় পদায়ন পান এই ফরিদী। বলা হয়, তিনি নাকি আগে ছাত্রদল করতেন। ছাত্রজীবনে বুয়েট ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, এটা দাবি করে থাকেন ফরিদী। কিন্তু বুয়েটে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী বুয়েট শাখা ছাত্রদলের সঙ্গে মোটেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। বরং তিনি ছাত্রশিবিরের গুপ্ত সদস্য ছিলেন বলে বুয়েটের তার সহপাঠীরা দাবি করছেন। ওই সময়ের ছাত্রদল নেতারাও তাই বলছেন। সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে ফরিদী কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তার কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে দাবি করছেন- ওই সময় বুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি কে ছিল? সভাপতি-সহসভাপতি, এদের কারো সঙ্গে আপনার এখন যোগাযোগ আছে কি? উত্তর দিতে পারেননি ফরিদী।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত বিএনপি এবং জামায়াত যেহেতু একই জোটভুক্ত ছিল সেই সুবাদে ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে ফরিদী হঠাৎ বিএনপি হয়ে উঠার সুযোগ পান। এটা জামায়াতেরই কেন্দ্রীয় পর্যায়ের পরিকল্পিত কৌশল। জামায়াত ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর আগে আওয়ামী লীগের মধ্যে ছিল, গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপির মধ্যে ঢুকেছে। এটা সবারই জানা কথা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াতের আশীর্বাদ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কারোই পদায়ন পাওয়া অথবা পদায়নে বহাল থাকা সম্ভব ছিল না। অথচ দেখা গেছে, ফরিদী শুধু পদায়ন পাননি বা পদায়নে বহালই থাকেননি- উত্তরোত্তর তার ক্ষমতার অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। ড. মোখলেস উর রহমানকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার পর ভূমি সচিব সালেহ আহমেদের পদায়নের সারসংক্ষেপ তৈরি হয়েছিল জনপ্রশাসন সচিব হিসেবে। জামায়াতীরা ব্যাপক তদবির চালিয়ে সেটিকে বাতিলে করে দেয়, যদিও সালেহ আহমেদ বিএনপির নন। তারা চাইছিল একান্তই তাদের লোক। অবশেষে জনপ্রশাসন সচিব হিসেবে পদায়ন পান মো. এহছানুল হক। জামায়াতের ইচ্ছায়ই এই পদায়ন হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) পদ থেকে এরফানুল হককে বদলি করে খুলনার তখনকার বিভাগীয় কমিশনার ফিরোজ সরকারকে এই পদে পদায়ন করা হলে জামায়াতের পক্ষ থেকে ঘোর বিরোধিতা হয়। শুধু জামায়াতের বিরোধিতার কারণেই ফিরোজ সরকার অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) যোগ দিতে পারেননি। এহছানুল হক ঘোষণা করলেন, তিনিই একসঙ্গে সচিব এবং ‘অতিরিক্ত সচিব এপিডি’ পদ সামলাবেন। কিন্তু এটি আসলে বিএনপিকে ধোঁকা দেওয়া ছাড়া কিছুই নয়। পরবর্তীতে তা-ই প্রমাণিত হয়েছে। দেখা গেছে, ফরিদী অঘোষিতভাবে ‘অতিরিক্ত সচিব এপিডি’র ক্ষমতা ভোগ করেছেন। শুধু এপিডি’র ক্ষমতাই নয়, তিনি একক ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন। এখানেই আসল রহস্য। ফরিদীর এই অস্বাভাবিক উত্থান ও কর্তৃত্বকে জামায়াত সাদরেই মেনে নিয়েছে। কেন মেনে নিলো? ফরিদী আসলে এই সময়ে জামায়াতর হুবহু চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচনী প্রশাসন গড়ে তুলেছেন। যদিও তিনি মুখে দাবি করে থাকেন বিএনপিপন্থি বলে।
সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ ও শীর্ষনিউজ-এর পক্ষ থেকে ফরিদীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বসে আপনি তো শুধুমাত্র জামায়াতের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করছেন। আপনাকে দিয়ে বিএনপির কোন স্বার্থরক্ষা হয়েছে, এ প্রশ্নের জবাব তিনি দিতে পারেননি। তবে বিএনপির নয়, বিএনপি নামধারী কিছু ধান্দাবাজ ও মুনাফেক জাতীয় কর্মকর্তার ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণ করেছেন তিনি, এটা নিশ্চিত।
সহকারী একান্ত সচিব-১ মোহাম্মদ মামুন শিবলী। তিনি ঢাকা মেডিকেলে ছাত্র থাকাকালে ছাত্রদলের কমিটিতে সহসভাপতি ছিলেন বলে দাবি করে থাকেন। তবে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের যথাযথ উত্তর তার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া তার পরবর্তী কার্যক্রমেও এটা প্রমাণিত হয় না। চাকরিজীবনে মামুন শিবলীর ব্যাচের সদস্যরা তাকে শিবিরের ‘গুপ্ত’ সদস্য হিসেবেই জানেন। সর্বশেষ তিনি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের পিএস পদে। মনির হায়দার ঐকমত্য কমিশনে এবং এর আগে-পরে জামায়াতেরই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন বলে প্রমাণিত আছে। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত জামায়াতকে ক্ষমতায় আনার জন্য একান্তভাবে কাজ করেছেন। সরকারি অর্থ খরচ করে সরকারি কর্মসূচির নামে জামায়াতের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। মোহাম্মদ মামুন শিবলী ছিলেন মনির হায়দারের এসব কাজের একান্ত সহযোগী। জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে মামুন শিবলী গুপ্ত দলে যোগ দিয়েছেন। গুপ্ত দলের নেতা মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদীর অত্যন্ত বিশ^স্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। তাই ফরিদীই পছন্দ করে তকে এপিএস-১ পদে পদায়নের ব্যবস্থা করেছেন। যদিও এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী”।
এবার আসা যাক মো. উজ্জল হোসেন প্রসঙ্গে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এপিডি উইং-এ পদায়নে আছেন তিনি আওয়ামী লীগ আমল থেকে দীর্ঘদিন ধরে। আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুলের স্ত্রী কুখ্যাত সায়লা ফারজানার ডানহাত বলে পরিচিত ছিলেন এই উজ্জল হোসেন। তাকে তখন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবেই সবাই জানতো। গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি হঠাৎ বোল পাল্টে জামায়াতের সঙ্গে মিশে যান এবং রাতারাতি আবার ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। ১২ ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত ফরিদীর সঙ্গে গুপ্ত সংগঠনের সদস্য হিসেবে আনঅফিসিয়ালি বিভিন্ন কাজকর্ম করেছেন। নির্বাচনের পরে বিএনপি বনে গেছেন, গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় এই সুবাদে। কিন্তু বগুড়ায় বাড়ি- এই পরিচয়ে যদি অতীতের সবকিছু মুছে যাওয়ার সুযোগ থাকে আপনার সরকারে, সেক্ষেত্রে আমার বলার কিছু নেই। বগুড়ায় বাড়ি- এই উজ্জল হোসেন সম্পর্কে আরও যেসব সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে তিনি রং বদলানোর কাজে অত্যন্ত করিৎকর্মা। আওয়ামী লীগ আমলে শুধুমাত্র সায়লা ফারজানাই নয়, তৎকালীন সরকারি দলের অনেক রথি-মহারথিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। রথি-মহারথিরা তার সঙ্গে সেলফি তুলে আত্মতুষ্টিলাভ করতেন। শীর্ষকাগজ কর্তৃপক্ষের হাতে একটি ছবি এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি নজরুল ইসলাম বাবু নিজে উদ্যোগী হয়ে সেলফি তুলছেন। আরেকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তিনি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার ইউএনও থাকাকালে সরকারি প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানের ব্যানারে শেখ মুজিব, হাসিনা, রেহানা ও জয়-এর ছবি রাখতে বাধ্য করতেন। ব্যানারে এর নজির রয়েছে। এইচটি ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখছেন অনুষ্ঠানে।
ফরিদী, শিবলী ও উজ্জ্বলদের সঙ্গে আপনার দপ্তরে প্রশাসনের আরও একজন কর্মকর্তার পদায়ন হয়েছে, তিনি হলেন মো. মহিউদ্দিন আল হেলাল। আর্থিক কাজকর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উইং হলো গভর্ণেন্স ইনোভেশন ইউনিট। এই ইউনিটে উপ-পরিচালক পদে পদায়ন পেয়েছেন মহিউদ্দিন আল হেলাল। হেলালের পরিচয় হলো- বাড়ি ভোলা, ছাত্র জীবনে ছিলেন ছাত্র শিবিরের পদধারী। সর্বশেষ তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের পিএস পদে ছিলেন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ১৮ ফেব্রুয়ারি আপনার দপ্তরে তার পদায়ন হয়। এটা সবারই জানা কথা, ডা. সায়েদুর রহমান জামায়াত কোটায় বিশেষ সহকারী পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার ব্যক্তিগত অনুবিভাগের প্রধান তিনটি পদেই এমন কমকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যাদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং যারা অতীতে জামায়াতের হয়ে কাজ করেছেন। তারা যে গুপ্ত সংগঠনের সদস্য, সার্বিক ঘটনাবলীতে এর প্রমাণও রয়েছে। ‘একান্ত’ শব্দের অর্থ একেবারে নিজস্ব। এর বাস্তবতাও তাই। আপনার ব্যক্তিগত এবং অফিসিয়াল সবকিছুই এই তিন কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কারা বা কোন গোষ্ঠী এই তিন কর্মকর্তাকে সেখানে বসার ব্যবস্থা করেছেন এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নয়। তবে অত্যন্ত আশংকিত। শুধু আমিই নই, প্রশাসনের কমবেশি- বিশেষ করে বিএনপির শুভাকাঙ্খীদের মধ্যে এ নিয়ে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। চরম হতাশা, ক্ষোভ-অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। এ রকমের একটা কথা প্রচারিত আছে যে, ‘বিপ্লব’ সংঘটনের পরিকল্পনায় কাজ করছে জামায়াত। দেড় বছরের মধ্যেই তারা এটা বাস্তবায়ন করতে চায়। যদি তাই হয়, এই গুপ্ত সদস্যরা তাদের খুব কাজে দেবে। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন সরকারের ভেতরের লোকজন। সেই লক্ষ্যেই তারা এগোচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দখলে নিয়েছে। কথাগুলো সচিবালয়ে অনেকেই এখন বলছেন।

(সম্পাদক, শীর্ষনিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ)