স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আগেই প্রার্থী ঠিক করেছে দলটি। সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হবে শিগগির। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে জয়ী হওয়া জামায়াতের প্রধান লক্ষ্য।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত আইনগুলো সংশোধন করেছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে। পরিবর্তন করা হয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশও। এসব অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ সংসদের অনুমোদন পেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় পদ্ধতিতে হবে।
এর আগে গত আওয়ামী লীগ সরকার সিটি ও পৌরসভার মেয়র, উপজেলার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দল মনোনীত প্রার্থীর বিধান করেছিল আইনে। বিএনপি এর বিরোধী ছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে স্থানীয় নির্বাচন আবারও নির্দলীয় পদ্ধতিতে ফিরে যাবে তারা। ঐকমত্য কমিশনের সংলাপেও বিএনপির অবস্থান ছিল নির্দলীয় পদ্ধতিতে হতে হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন চেয়েছিল জামায়াত, এনসিপি। বিএনপির বিরোধিতায় ভোট হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছে, দ্রুতই হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দল সংসদের আসন বণ্টনের সময়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাদের জোট স্থানীয় নির্বাচনেও থাকবে। এই সিদ্ধান্ত এখনও অটুট রয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
এক বছর আগে থেকে প্রস্তুতি
আইনে সংশোধন এনে ২০২৪-এর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভাগুলো ভেঙে দেয়। গত দেড় বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চালানো হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। শুধু ইউনিয়ন পরিষদ বহাল রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত অধিকাংশ চেয়ারম্যান পলাতক থাকায় সেগুলোতেও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় সরকারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, রমজানের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে, তা ধরে নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৭৭ আসন পাওয়া জামায়াত জোট প্রস্তুতি শুরু করেছে। ঢাকার দুই সিটির আওতাধীন ১৫টি আসনের ৭টিতে জয়ী হয়েছে জামায়াত জোট। একটি আসন কম পেলেও প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের চেয়ে ঢাকায় বেশি ভোট পেয়েছেন জামায়াত জোটের প্রার্থীরা।
স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সুযোগ থাকবে দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ভোটে নামার। গত বছরের জানুয়ারি থেকে পরের কয়েক মাসে ঢাকার দুই সিটির ১২৯টি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর বাছাই করেছে জামায়াত। এই নেতারা তখন থেকেই ওয়ার্ড পর্যায়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। সংসদ নির্বাচনের সময়েও নিজেদের প্রচার চালান। জামায়াত ঢাকা-৮ আসন এনসিপিকে ছেড়ে দিলেও এই আসনের আওতাধীন ওয়ার্ডগুলোর সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোটের প্রচার চালান। যেমন ঢাকা উত্তরের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য প্রার্থী জামায়াত নেতা আবদুস সাত্তার সুমন ব্যানার, ফেস্টুনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রচার শুরু করেছেন। দক্ষিণের ২০, ২১, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের জামায়াত সমর্থিত সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরাও প্রচার শুরু করেছেন।
জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম। তিনি সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে স্থানীয় বা জাতীয় যে কোনো নির্বাচনের প্রস্তুতি জামায়াত সারাবছর ধরেই নেয়। সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম নেই। তবে সবে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মেয়র পদে কারা সমর্থন পাবেন, তা এখনও ঠিক হয়নি।
জোট থাকবে, তবে মেয়র পদে ছাড় নয়
সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ১৫টি আসনের চারটি এনসিপিকে, একটি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দেয় জামায়াত। বাকি ১০টিতে লড়ে জামায়াত ঢাকা-৪, ঢাকা-৫, ঢাকা-১২, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫ এবং ঢাকা-১৬ আসনে জয় পেয়েছে। পাঁচ হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে ঢাকা-৭ এবং ঢাকা-১০ আসনে পরাজিত হয়েছেন জামায়াত প্রার্থীরা। ঢাকা-৮ আসনে এনসিপি এবং ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত তিন থেকে ছয় হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছে।
জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, রাজধানীর দুটি মেয়র পদেই দল সমর্থিত প্রার্থী থাকবে। ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন। তিনি সিলেট-৬ আসনে মাত্র ৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। তাঁকে সংসদীয় রাজনীতিতেই রাখা হবে। তাই জামায়াতকে উত্তরে নতুন একজন মেয়র প্রার্থী খুঁজতে হবে।
জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা দক্ষিণে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে হাজি মো. এনায়েত উল্লাকে। পুরান ঢাকার এই নেতাও এবারের নির্বাচনে স্বল্প ব্যবধানে হেরেছেন ঢাকা-৭ আসনে। বিএনপি প্রার্থীর এক লাখ চার হাজার ৬৬৬ ভোটের বিপরীতে তিনি ৯৮ হাজার ৪৮৩ ভোট পেয়েছেন।
সূত্র জানায়, জামায়াত জোটের শরিক এনসিপি ঢাকায় একটি মেয়র পদ চায়। দলটির ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিরুল ইসলাম ইতোমধ্যে নিজেকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। দক্ষিণে শোনা যাচ্ছে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম। তিনি এবার ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে সোয়া পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন।
তবে জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা সমকালকে বলেছেন, ঢাকায় মেয়র পদে জোট শরিকদের ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কাউন্সিলর পদে সমঝোতা হতে পারে।
২০০৩ সালের নির্বাচনে জামায়াত অবিভক্ত ঢাকায় একটি এবং ২০১৫ সালে উত্তরের একটি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে জয় পেয়েছিল। এ ছাড়া রাজধানীতে নির্বাচনী সাফল্য নেই দলটির। তবে এবার বিএনপির চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে দলটি জয়ের আশা করছে।
সংসদ নির্বাচন করতে না পারারা অগ্রাধিকার পাবেন
এবারের সংসদ নির্বাচনে ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে তিনটিতে এগিয়ে ছিল জামায়াত। ছয় সিটিতে বিএনপির বিপক্ষে হারলেও শক্ত লড়াই করেছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় বড় ব্যবধানে হেরেছে। বরিশালে প্রার্থী ছিল না। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, জোটের কারণে যেসব নেতা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, স্থানীয় নির্বাচনে তারা অগ্রাধিকার পাবেন।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন মহানগর সভাপতি আবদুল জব্বার। এনসিপিকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক এই সভাপতি নির্বাচন করতে পারেননি। তবে সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক সক্রিয় ছিলেন। এনসিপি এই আসনে জয় পেয়েছে। জামায়াত নেতাদের ভাষ্য, আবদুল জব্বারের তৈরি করা মাঠের কারণেই সংগঠন ও সাংগঠনিক শক্তি না থাকা এনসিপি জয়ী হয়েছে। নারায়াণগঞ্জ-৪ এবং নারায়াণঞ্জ-৫ আসন নিয়ে গঠিত সিটি করপোরেশনে জামায়াত সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হবেন আব্দুল জব্বার।
খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দেওয়া নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনেও মাত্র চার হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন জামায়াত জোটের প্রার্থী। বিএনপি প্রার্থী আবুল কালামের এক লাখ ১৪ হাজার ৭৯৯ ভোটের বিপরীতে খেলাফত মজলিসের এ বি এম সিরাজুল মামুন পেয়েছেন এক লাখ ১০ হাজার ১৯৬ ভোট।
জামায়াত নেতারা বলছেন, জয়ের সম্ভাবনা থাকার পরও জামায়াত দুটি আসনই জোট শরিকদের ছেড়ে দেয়। তাই সিটি নির্বাচনে জামায়াতেরই প্রার্থী থাকবে। আসন সমঝোতার সময় এভাবেই আলোচনা হয়েছিল।
রংপুর সিটিতে জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ছিলেন মাহবুবের রহমান বেলাল। তিনি এবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে মেয়র পদে নতুন প্রার্থী খোঁজা শুরু করেছে জামায়াত। বরিশালে মেয়র প্রার্থী হবেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াজ্জেম হোসেন হেলাল। চরমোনাই পীরের ভাই মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করীমের সম্মানে আসন ছেড়ে দেওয়ায় সংসদ নির্বাচন করতে পারেননি তিনি।
খুলনা-২ এবং খুলনা-৩ আসন নিয়ে গঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন। খুলনা-২ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে হারিয়ে জয়ী হয়েছে জামায়াত। খুলনা-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থীর ৭৪ হাজার ৮৪৫ ভোটের বিপরীতে ৬৬ হাজার ১০ ভোট পেয়ে জামায়াত প্রার্থী পরাজিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগরের চারটি আসনের একটিতেও জিততে পারেনি জামায়াত। এখানে মেয়র পদে দলের সমর্থন পেতে পারেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান।
বিএনপির সঙ্গে জোট থাকলেও ২০১৮ সালে সিলেটে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছিল জামায়াত। এহছানুল মাহবুব যোবায়ের মাত্র ১০ হাজার ৯৫৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। এবারের সংসদ নির্বাচনে সিলেট সিটি এবং সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনে টক্কর দিয়েছে জামায়াত। বিএনপি প্রার্থীর এক লাখ ৭৬ হাজার ৯৩৬ ভোটের বিপরীতে জামায়াত প্রার্থী এক লাখ ৩৪ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়েছেন। যদিও সিটি এলাকায় দুই দলের ভোট কাছাকাছি। জামায়াতের সিলেট অঞ্চলের পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়া এহছানুল মাহবুব আবারও মেয়র প্রার্থী হতে পারেন। তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি।
ময়মনসিংহ, গাজীপুর সিটি করপোশন এলাকায়ও বিএনপির সঙ্গে সমানতালে লড়েছে জামায়াত। রাজশাহীতে বিএনপির এক লাখ ২৫ হাজার ৬৪৭ ভোটের বিপরীতে জামায়াত ৯৭ হাজার ৪৬৬ ভোট পেয়েছে। চট্টগ্রামের বড় ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল শুধু কুমিল্লায়।
অতীত নজির
২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে ৩৬ উপজেলায় চেয়ারম্যান, ১২৬ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২৬ উপজেলায় নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছিল জামায়াত। এরপর তারা আর নির্বাচনে অংশ নেয়নি। দলটি নিবন্ধন হারালেও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭৯টিতে চেয়ারম্যান পদে জামায়ত সমর্থিত প্রার্থীরা জয় পায়। ২০১৯ সালে তারা চারটি পৌরসভায় জেতে।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু করতে জুলাই সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার হতে হবে। সংস্কার হলে জামায়াত অবশ্যই নির্বাচনে অংশ নেবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ভোটের জন্য প্রস্তুত।