জামায়াত সিলেট অঞ্চলে শেষ পর্যন্ত যে দুটি আসনের ওপর চোখ রেখেছিল সে দুটি আসন হচ্ছে সিলেট-৬ ও সুনামগঞ্জ-২। জাতীয় রাজনীতিতে আলোচিত জামায়াতের দু’নেতা এ দুটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। এরা হলেন- ঢাকা উত্তর জামায়াতের আমীর সেলিম উদ্দিন ও জামায়াত নেতা ও আইনজীবী শিশির মনির। সেলিম উদ্দিন ভোটের মাঠে বিএনপি প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে কিছুটা লড়াই করতে পারলেও শিশির মনির কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেননি। সিলেট-৬ আসনের প্রেডিকশন আগে থেকেই ছিল দোদুল্যমান। বিএনপি’র প্রার্থী দেয়ার ক্ষেত্রে অধিকতর তরুণ নেতা জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরীকেই বেছে নেয়। সেটি অবাক করার সিদ্ধান্তই ছিল কেন্দ্রের। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলের পর বোঝা গেল ভুল করেনি বিএনপি। এমরান চৌধুরীকে প্রার্থী করাই ছিল দলের হাই কমান্ডের সঠিক সিদ্ধান্ত।
তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সেলিম উদ্দিন। কেন্দ্রের রাজনীতির জামায়াত নেতা। বাড়ি বিয়ানীবাজারে হলেও সেলিম উদ্দিন ছিলেন ভোটের মাঠে অচেনা। কারণ এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের রাজনীতি করছিলেন জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান। তিনি একাধিকবার এ আসনে নির্বাচনও করেছেন। গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত মুখ। হঠাৎ করেই জামায়াত এ আসনে সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী করে। পরবর্তীতে সিলেট-৬ আসন থেকে এনে সিলেট-১ আসনে প্রার্থী করে মাওলানা হাবিবুর রহমানকে। জামায়াতের এ সিদ্ধান্তে খোদ দলের ভেতরেই অনেকেই অবাক হয়েছেন। সূত্র বলছে; এতে কিছুটা হোঁচট খেয়েছে জামায়াত। এবার সিলেট-৬ আসনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে জামায়াত। এমরানের ভোট ব্যাংক তছনছ করেছে। রিভারবেল্টের ভোট টেনেছে। বিএনপি’র ভেতরে ফাটল ধরিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের ভোটে তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। যে কারণে শেষ মুহূর্তে প্রায় ১০ হাজার ভোটে সেলিম উদ্দিন পরাজিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের নীরব ভোটও পড়েছে এমরানের বাক্সে- এমনটি জানিয়েছে পর্যবেক্ষকরা। সুনামগঞ্জ-২ আসনে এবারো ভুল করেনি সংখ্যালঘু ভোটাররা। ভোটাররা জানিয়েছেন- গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে হাওর জনপদ সুনামগঞ্জ-২ আসনে যাওয়া-আসা শুরু করেন এডভোকেট শিশির মনির। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। আইন অঙ্গনসহ জাতীয় রাজনীতিতে রয়েছে তার প্রভাব। জামায়াত থেকে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন এটাই নিশ্চিত ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হয়েছেন। এ আসনে বিএনপি অনেকটা বেকায়দায়ই ছিল। প্রার্থী ছিলেন একাধিক। চ্যালেঞ্জ ছিল সবার জন্য। একমাত্র বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন ফ্যাক্টর। কিন্তু তিনি অসুস্থ। কী করবে বিএনপি? বিএনপি নেতা তাহিয়াত চৌধুরী পাভেলেও ছিল ভরসা।
কিন্তু বেশি ভরসায় ছিলেন নাছির উদ্দিন চৌধুরী। অবশেষে নাছির উদ্দিন চৌধুরীই পেলেন মনোনয়ন। আর বিশাল ভোটের ব্যবধানে তিনি হারিয়েছেন তরুণ প্রার্থী শিশির মনিরকে। এটা কী ম্যাজিক না অন্য কিছু। কী ঘটেছে দিরাই-শাল্লায় এমন বিশ্লেষণ চলছে। ভোটাররা জানিয়েছেন- নাছির উদ্দিন চৌধুরী বর্তমান সময়ে সুনামগঞ্জের সবচেয়ে সিনিয়র রাজনীতিক। তিনি প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গের খেলোয়াড়। সুরঞ্জিতকেও তিনি একবার হেসে-খেলে হারিয়েছেন। সুরঞ্জিতের মৃত্যুর পর নাছির উদ্দিন চৌধুরী পরিণত হয়েছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা হিসেবে। ফলে দিরাই-শাল্লার সংখ্যালঘু, হাওর জনপদের শ্রমিক জনগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক ভোটার তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধ ছিল। আর শিশির মনিরের পক্ষে ছিল আওয়ামী লীগের একাংশ। তারা এলাকায় নানা ভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার মাধ্যমে ভোট টানতে গিয়ে শিশির মনিরের পরাজয়কে ত্বরান্বিত করেছে।