বাইপাস হয়েছে। শরীর তখনও পুরো ধকল কাটিয়ে উঠেনি। বাসার নিচে আসরের নামাজ পড়লেন। বের হয়েই সহকারীকে কী যেন ইশারা করলেন। গাড়ি থেকে নিয়ে আসা হলো একটি প্যাকেট। ক্ষাণিক পর দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। একদল শিশু ঘিরে ধরেছে তাকে। পরম মমতায় তিনি তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন চকলেট। এর মধ্যে এক শিশু দাবি করল বাড়তি চকলেটের। বলল, বাসায় বোনের জন্য নিয়ে যাবে।
এই দৃশ্য কাকে ঘিরে, নিশ্চয়ই এরই মধ্যে অনুমান করে ফেলেছেন। তিনি ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াতের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী আমির।
বিখ্যাত ক্রিকেট ভাষ্যকার জিওফ্রে বয়কট একবার বলেছিলেন, গ্রেট কথাটা অতিব্যবহারে ক্লিশে শোনায়। কিন্তু গ্রেট বিষয়টা আসলে কী, তা ব্রায়ান লারার ব্যাটিং দেখলে বোঝা যায়। ইতিহাস কথাটা আমার নিজের খুব প্রিয়। বারবার ব্যবহারে যা ক্লিশে শোনায় না।
ডা. শফিকুর রহমান জামায়াতের ইতিহাসে প্রথম আমির, যিনি ড্রইংরুম থেকে দলটির রাজনীতি নিয়ে গেছেন মানুষের দরজায়। আল জাজিরায় হেডলাইন দেখছিলাম—ডা. শফিকুর রহমান, যার সঙ্গে সবাই দেখা করতে চান। মূলত ভিনদেশি অতিথিদের মধ্যে তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া আগ্রহ বোঝাতেই এ কথা বলা হয়েছে। তবে গত এক দশক ধরে আমরা যেটা দেখছি, তিনি দিনরাত ছুটে গেছেন মানুষের কাছে। ইতিহাস নিয়ে কথা বলছিলাম। শফিকুর রহমানই জামায়াতের প্রথম আমির, যার নাম সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।
‘নতুন বাংলাদেশে’ দুই দফায় ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে কিছুটা লম্বা আলাপ হয়। তার রাজনীতির দর্শন বোঝার চেষ্টা করেছি। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। রাজনীতির শুরু জাসদ ছাত্রলীগে। পরবর্তীতে যোগ দেন ছাত্রশিবিরে। আজ পর্যন্ত যে দর্শনে তিনি থিতু আছেন। সিলেট মহানগর ঘিরেই দীর্ঘ একটা সময় কেটেছে তার। ছিলেন সেখানকার শীর্ষ নেতা। রাজনীতির বাইরে মনোযোগ দেন প্রতিষ্ঠান গড়ায়। মেডিকেল কলেজ থেকে মিডিয়া—সর্বত্র অবদান রাখার চেষ্টা করেছেন। নিজ প্রতিষ্ঠানের দরজা খোলা রেখেছেন সবার জন্য। সব ধর্ম-মতের মানুষের জন্য।
জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিতে শফিকুর রহমানের আসা এক বিশেষ পরিস্থিতিতে। দলটির জন্য সবচেয়ে বিপর্যয়কর এক সময়ে। যখন জামায়াতের প্রায় সব শীর্ষ নেতা কারাগারে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়। একে একে রায় হতে থাকে। সাজা হয় প্রায় সবার। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় প্রধান দুই নেতার।
অনেকটা আকস্মিকভাবে শীর্ষ নেতৃত্বে আসার পরই শফিকুর রহমান নিজস্ব ধারার রাজনীতি শুরু করেন। বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি ছুটতে থাকেন দেশের এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে। গ্রাম থেকে গ্রামে। যেখানে কোনো মানবিক বিপর্যয়, সেখানেই তিনি গেছেন। দলের পক্ষ থেকে সহায়তা করেছেন সাধারণ মানুষকে, যা দলটির নতুন ভাবমূর্তি তৈরিতে সহায়তা করে। ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে যেতে থাকেন তিনি। যদিও অনেক ক্ষেত্রে আসলে তার তেমন কিছু করার ছিল না। বারবার কারাগারে যেতে হয়েছে। কিন্তু নিজ রাজনীতিতে ছিলেন অবিচল।
জুলাই অভ্যুত্থান জামায়াতের রাজনীতির সামনে নতুন সুযোগ নিয়ে আসে। যে অভ্যুত্থানে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা ছিল জামায়াত-শিবিরের। তার আগে বলে নেই, ডা. শফিকুর রহমানের রাজনীতির প্রধান তিনটি দর্শন এ লেখকের কাছে স্পষ্ট।
এক. তিনি মনে করেন, সহিংস রাজনীতি আখেরে কোনো ফল এনে দেয় না। সিলেটে জামায়াতের শীর্ষ নেতা থাকার সময়ও এ ব্যাপারে তার অবস্থান ছিল কঠোর।
দুই. অন্য কোনো দলের ছাতার নিচে থেকে জামায়াতের রাজনীতি বড় হতে পারবে না।
তিন. শফিকুর রহমান ইসলামের মানবিকতা এবং ইনসাফের দর্শনের ওপর জোর দিয়ে থাকেন।
গত কয়েক মাসে জামায়াতের রাজনীতিতে বেশ বড় পরিবর্তন দেখা যায়। এ সময় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত দেখা যায় নারীদের জামায়াতের রাজনীতিতে বিপুল অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। গত কয়েক দিনে সারা দেশে জামায়াতের হাজার হাজার নারী কর্মীকে মিছিল করতে দেখা গেছে, যা এক অভাবনীয় ঘটনা। জামায়াতের প্রচারণাতেও অন্যতম মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন নারীরা। এজন্য অবশ্য তাদের অনেক বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে। আরেকটি বিষয় দেখা যাচ্ছে, জামায়াতের রাজনীতিতে খুব সহজেই নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মিশতে পারছেন। এমনকি দলটিতে এবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রার্থীও দেখা গেছে।
ভদ্রমহিলা আমার পুরনো পরিচিত। পাশ্চাত্য পোশাক-আশাক পরেন। বিশ্বাস করেন আধুনিক জীবনদর্শনে। ক’দিন আগে দেখলাম ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে ফেসবুকে দীর্ঘ লেখা লিখেছেন। অনেকটা সময় অবিশ্বাস্য মনে হলো।
তবে ডা. শফিকুর রহমানের কিছু সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। বিশেষত, নারীরা কখনও জামায়াতের প্রধান হতে পারবেন না—এমন বক্তব্য অনেকেই গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে, দলের মজলিসে শুরার সিদ্ধান্ত ছাড়াই দৃশ্যত দুই দফায় তিনি জামায়াতের অতীত ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
রাজনীতিতে প্রায়শই এমনটা ঘটে। কোনো কোনো নেতা খুব অল্প সময়ে সব সমীকরণ পাল্টে দেন। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে, ডা. শফিকুর রহমানকে কেন্দ্র করে একধরনের ক্রেজ তৈরি হয়েছে। তিনি যেখানে যাচ্ছেন, জটলা তৈরি হচ্ছে। ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা তাদের প্রিয় দাদুর পেছনে ছুটছে।
জামায়াতের রাজনীতিতে বিপুল পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন ডা. শফিকুর রহমান। এটা দলটির জন্য ভালো না মন্দ হয়েছে—তার একটা এসিড টেস্ট হবে বৃহস্পতিবার। ভোটের দিন একজন রাজনীতিবিদের জন্য জাজমেন্ট ডে। আবেগ এবং পরীক্ষার সময়। জামায়াতের রাজনীতি স্বাভাবিক পরিক্রমায় চললে তার দলটির আমির হওয়ার কথা নয়।
নিয়তি তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। দেখা যাক, নিয়তি শেষ পর্যন্ত তার জন্য কী লিখে রেখেছে?