আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কালীগঞ্জে এখন বইছে ভোটের উত্তাপ। একদিকে গণঅধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন রাশেদ খান। দলীয় প্রতীক নিয়ে রাশেদ খান দিনরাত চষে বেড়াচ্ছেন কালীগঞ্জের ভোটের মাঠ।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ও তৃণমূলের কাছে পরিচিত সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছেন। এদিকে বিএনপিজোট প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর পাশাপাশি জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আবু তালিব নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও অঙ্গীকারকে ভোটারদের সামনে মেলে ধরছেন। ভোটযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
রাশেদ খান বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ায় প্রথমদিকে বিষয়টিকে কালীগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা ভালোভাবে নেয়নি। আওয়ামী আমলে নির্যাতিত ও ত্যাগী বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন একজনকে মনোনয়ন দেওয়ায় তৃণমূলে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। শুরুতে এই নিয়ে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করে দলটির নেতাকর্মীরা। তবে দিন যত গড়াচ্ছে ততই বদলাচ্ছে ভোটের মাঠের চিত্র।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্থানীয় বিএনপির একটা বড় অংশের নেতাকর্মী এখন দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে রাশেদ খাঁনের সঙ্গে একাট্টা হয়ে মাঠে নেমেছেন। চালিয়ে যাচ্ছেন জোর নির্বাচনি প্রচার। রাশেদের অনুসারীরা স্থানীয় বিএনপি নেতা হামিদুল ইসলাম হামিদ ও বিএনপির প্রয়াত এমপি শহীদুজ্জামান বেল্টুর সহধর্মিণী মুর্শিদা জামানকে এখন মূল শক্তি হিসেবে দেখছেন। কালীগঞ্জে চাঁদাবাজি, মাদক, যাতায়াত, জলাবদ্ধতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধানের শীষের প্রার্থী রাশেদ ভোটারদের মন জয় করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, ব্যক্তিকে নয়, তারা ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেবেন। প্রার্থী যেই হোক না কেন সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়।
বিষয়খালী এলাকার ভোটার সাইফুল ইসলাম জানান, রাশেদ খাঁন ভোটের মাঠে প্রার্থী হিসেবে মন্দ নন। তবে শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন না দিয়ে তাকে আরো আগে দল মনোনয়ন দিলে স্থানীয় ভোটার ও সমর্থকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতো না।
জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী ঝিনাইদহ-৪ আসনের বিএনপির দলীয় প্রার্থী রাশেদ খাঁন জানিয়েছেন, তিনি তরুণ ভোটারদের কাছে আইকন। এবারের নির্বাচনে তারাই হবেন গেম চেঞ্জার। এজন্য তিনি তরুণ ভোটারদের গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে সমুন্নত রাখতে ধানের শীষ প্রতীককে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ঝিনাইদহ-৪ আসন কৃষক শ্রমিকের সমন্বয়ে গড়া বিএনপির ঘাঁটি। এখানে যিনি মনোনয়ন পাবেন তিনিই পাস করবেন। বিএনপি শহীদ জিয়ার আদর্শে গড়া গণতন্ত্র অনুশীলনের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এই প্ল্যাটফর্ম দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে জাগ্রত রাখবে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করবে, এটা নিশ্চিত হয়েই বিএনপির বিরুদ্ধে একটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তিনি সব যড়যন্ত্র মোকাবিলার জন্য ধানের শীষকে বিজয়ী করার জন্য কালীগঞ্জের ভোটারদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
এদিকে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ দীর্ঘদিন দলটির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তা এবং মাঠের রাজনীতিতে দৃশ্যমান উপস্থিতির কারণে তিনি নিজ এলাকায় জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে কেন্দ্রীয় বিএনপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এর পরও ফিরোজ নির্বাচনি মাঠে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের একাংশ নিয়ে তিনি ভোটের প্রচার অব্যাহত রেখেছেন।
যদিও জেলা বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় একটি সূত্র দাবি করেছে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে দলের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে কারণে ফিরোজের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেকেই মনে করছেন, এ আসনটিতে ফিরোজের জনপ্রিয়তা উপেক্ষা করে মনোনয়ন দেওয়াটাই এই সংকটের মূল কারণ।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে নতুন করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রাশেদ খাঁন অন্যদিকে তৃণমূল রাজনীতি থেকে উঠে আসা ফিরোজ এই দুজনই ভোটের মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন। দলীয় কর্মী-সমর্থকরা শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্ত মানবেন, নাকি ফিরোজকে প্রাধান্য দেবেন সেটিই এখন তাদের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
তবে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ জানিয়েছেন, আমি দুঃসময়ে মানুষের পাশে ছিলাম। আগামীতে তাদের সঙ্গেই থাকব। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়েই বিজয় ছিনিয়ে আনব। যতই চাপ আসুক না কেন ১২ তারিখের ভোটেই সবকিছুর ফয়সালা হবে।
অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর দোলাচলে আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়ে বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। যতই দিন গড়াচ্ছে ততই জামায়াতের পাল্লা ভারি হচ্ছে বলে মনে করছেন উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ও জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা আবু তালিব।
তিনি জানান, মানুষ এ দেশে আবারো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসুক তা চায় না। এবারের নির্বাচন হবে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ও জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে। ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তিনি এলাকার মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন।