Image description

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের মাঠের উত্তাপের মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক দল ও ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করতে যাচ্ছে। দলটির ইশতেহারে নাজুক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের চক্র ভাঙার ‘বিশেষ প্রকল্পের’ অঙ্গীকার থাকবে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

দলীয় সূত্র মতে, নতুন দল হিসেবে এবারই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এনসিপি। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে, বিশেষ করে তরুণ সমাজকে এই কাজে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করতে নির্বাচনী ইশতেহারে বিশেষ আকর্ষণ রাখা হচ্ছে। ইশতেহারের মূল স্লোগান বা মটো হতে পারে ‘সুশাসন, সংস্কার ও সার্বভৌমত্ব’। সেখানে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকছে। বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা ‘সরকারি বরাদ্দ’ ও ‘লক্ষ্যভিত্তিক প্রকল্প’ নেওয়ার ঘোষণা থাকছে।

এনসিপির ইশতেহারে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে থাকছে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে দলটি সরকারি ও বেসরকারি— উভয় খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিশেষ করে আইসিটি খাতে তরুণদের দক্ষ করে তোলা এবং বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করতে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। বেকারত্ব দূর করতে খাতভিত্তিক স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এনসিপি বিশ্বাস করে, তরুণরাই হবে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মূল চালিকাশক্তি, তাই তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করাকেই দলটির ইশতেহারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে

এ প্রসঙ্গে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এনসিপি একটি জোটের শরিক হিসেবে যৌথভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। ফলে ইশতেহারে মূলত দলের রাজনৈতিক আদর্শ, কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে নীতিগত কী কী পরিবর্তন আনা হবে, তার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন থাকছে। বিশেষ করে, সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে— এমন জনবান্ধব কর্মসূচিগুলোই এখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।’

সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারে যা থাকতে পারে / ছবি- ঢাকা পোস্ট 

‘এনসিপির ইশতেহারে একটি বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল দাবিই ছিল তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এনসিপি তরুণ প্রজন্মের মেধাকে জাতি গঠনের কাজে লাগাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’

‘দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এনসিপি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে’—  উল্লেখ করে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, ‘বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে ঢেলে সাজানো অপরিহার্য। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) বিকাশে সহজ শর্তে অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও ইশতেহারে থাকছে। সর্বোপরি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদ্যমান খাতগুলোকে কীভাবে আরও টেকসই ও শক্তিশালী করা যায়, সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা দেবে এনসিপি।’

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এনসিপি একটি শক্তিশালী সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে ঢেলে সাজানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে দলটি জানিয়েছে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে উচ্চবিত্তদের ওপর যৌক্তিক কর আরোপ করা হবে, তবে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে। এছাড়া, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের হিসাব একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হবে। এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করাই এনসিপির মূল লক্ষ্য

শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন ও পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করতে একটি বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে— বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগে তরুণ প্রজন্মকে আইসিটি খাতে দক্ষ করে তোলা এবং বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করতে এনসিপির ইশতেহারে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা থাকছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীদের প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে দেশের কর্মসংস্থান সমস্যার একটি টেকসই সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে।’ 

সামাজিক সাম্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে— উল্লেখ করে আলাউদ্দিন মোহাম্মদ জানান, সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে তাদের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করা হবে। লক্ষ্য কেবল সাময়িক সহায়তা নয়, বরং দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে তাদের জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করা। এ উদ্দেশ্যে বিশেষ সরকারি বরাদ্দ ও কার্যকর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।

গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিশাল জমায়েতের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি / ফাইল ছবি

জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী কার্যক্রমে আরও গতি আনতে তোড়জোড় শুরু করেছে এনসিপি। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সেক্রেটারি মনিরা শারমিনের অনুমোদনক্রমে গঠিত হয় বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক উপ-কমিটি। এরই ধারাবাহিকতায় ‘ইশতেহার বিষয়ক উপ-কমিটি’র ঘোষণা দেওয়া হয়, যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান এহতেশাম হক এবং সেক্রেটারি করা হয় ইশতিয়াক আকিবকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— জাহিদ আহসান, তৌকির আজিজ, আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল, মুনা হাফসা, সাইফুল ইসলাম ও তুহিন মাহমুদ।

সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে এনসিপি ‘মোবাইল অ্যাম্বুলেন্স’ সেবার এক অনন্য পরিকল্পনা করছে। প্রতিটি উপজেলায় বিশেষায়িত এই অ্যাম্বুলেন্স থাকবে, যাতে রোগী তোলার সাথে সাথেই প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করা যায়। সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য এই অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে পোর্টেবল আইসিইউ (ICU) ও সিসিইউ (CCU) সুবিধা থাকবে। অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চেয়ে তাৎক্ষণিক জীবন রক্ষাকারী সেবা সহজলভ্য করাকেই দলটি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া, প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যগত তথ্য সংরক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য ডাটাবেজ স্থাপন করা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত বাজেটের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য খাতকে এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে কোনো নাগরিককেই চিকিৎসার অভাবে বা যাতায়াতের দেরিতে প্রাণ হারাতে না হয়

ইশতেহার উপ-কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে জানান, ইশতেহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। তবে, এবারের ইশতেহারে তরুণ প্রজন্মের উন্নয়ন এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের আমূল সংস্কার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং আইসিটি খাতের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তরুণদের সম্পৃক্ত করার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা এতে থাকছে। জনকল্যাণমূলক সেবার পরিধি বাড়াতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রতিটি উপজেলায় মোবাইল অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু, প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা সহজ ও স্বচ্ছ করা এবং এভিয়েশন খাতের আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও যুক্ত হতে পারে সেখানে।

দলীয় সূত্র মতে, ২০২৫ সালে ঘোষিত এনসিপির ২৪ দফার আলোকেই নির্বাচনের জন্য একটি হালনাগাদ ইশতেহার তৈরি করা হচ্ছে। যদিও জামায়াতসহ ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের ভাবনার সঙ্গে এনসিপির ইশতেহারের অনেক ক্ষেত্রে মিল থাকতে পারে, তবে দলীয় আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং দেশের বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে জাতিকে একটি আধুনিক ও বাস্তবমুখী নির্বাচনী ইশতেহার উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে উপ-কমিটি।

কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে এনসিপি ‘কমিউনিটি মার্কেট’ বা ‘এক্সচেঞ্জ মার্কেট’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। এর ফলে কৃষকরা ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি পণ্যের দাম যাচাই করতে পারবেন এবং উৎপাদনস্থল থেকেই ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এটি একদিকে যেমন কৃষকের মুনাফা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে শহর ও গ্রামের বাজারের সংযোগ ঘটিয়ে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম নাগালে রাখবে। পাশাপাশি, সমাজের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে টেকসইভাবে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনতে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য কেবল সাময়িক ত্রাণ বা সহায়তা নয়, বরং তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য ইশতেহারে বিশেষ সরকারি বরাদ্দ ও কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচির ঘোষণা থাকছে

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিশাল জনসমুদ্র থেকে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ বা ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ২৪ দফার ঐতিহাসিক ইশতেহার ঘোষণা করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ‘নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার’ শিরোনামে এই রূপরেখাটি তুলে ধরেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সেই ইশতেহারে একটি আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা; ছাত্র-জনতার বিপ্লবের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা; গণতন্ত্র ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং একটি সেবামুখী জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা; বিচার বিভাগ ও আইন ব্যবস্থার সংস্কার; জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গঠন এবং শক্তিশালী নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকাশ নিশ্চিত করা; তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতা পৌঁছে দিতে ‘গ্রাম পার্লামেন্ট’ ধারণা প্রবর্তন ও স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালীকরণ; জাতিগঠনে আধুনিক শিক্ষানীতি, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা; নারী-পুরুষের সমঅধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সব ধর্ম, সম্প্রদায় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মর্যাদা রক্ষা করা; তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং শ্রমিক-কৃষকের ন্যায্য অধিকার আদায়ের মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা; বহুমুখী বাণিজ্য নীতি গ্রহণ এবং টেকসই কৃষি ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিতকরণ; পরিকল্পিত নগরায়ন, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং নদী-সমুদ্র রক্ষা; জাতীয় সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, প্রবাসীদের মর্যাদা রক্ষা এবং বাংলাদেশপস্থি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণসহ জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে একটি বাস্তবমুখী ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ফুটে ওঠে এনসিপির ওই ২৪ দফার ইশতেহারে।

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম শরিক হিসেবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এনসিপি / ফাইল ছবি 

এনসিপি’র নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখ্য সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. তারিকুল ইসলাম দলের আসন্ন ইশতেহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করেছেন। তার ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের সুশাসন নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে ইশতেহারটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনসিপির ‘নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার’-এ জনকল্যাণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত যুগান্তকারী প্রস্তাবনাগুলো থাকছে—

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা

• নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি (মন্ত্রী-এমপি) এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের হিসাব একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা হবে। এই তথ্যগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে যাতে জনমনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও বৈষম্য নিরসন

• কর কাঠামো : এশিয়ার মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের কর-জিডিপি (Tax-GDP Ratio) অনুপাত বৃদ্ধির বিশেষ পরিকল্পনা থাকছে।

• নাগরিক স্বস্তি : নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা কমাতে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হবে। বিপরীতে, উচ্চবিত্ত ও ধনীদের ক্ষেত্রে করের হার যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা হবে।

শ্রম অধিকার ও কর্মসংস্থান

• ন্যূনতম মজুরি : শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ প্রথা প্রবর্তন করা হবে।

• পরিকল্পিত কর্মসংস্থান : বেকারত্ব দূর করতে খাতভিত্তিক স্বল্প (৫ বছর), মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবমুখী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

• মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি : কর্মক্ষেত্রে মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ৬ মাসের বাধ্যতামূলক মাতৃত্বকালীন এবং ১ মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান রাখা হবে।

• ডে-কেয়ার সেন্টার : কর্মজীবী মায়েদের পেশাগত সুরক্ষা ও শিশুদের যত্নে সারা দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় এনসিপি ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ প্রথা প্রবর্তনের ঘোষণা দিচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি ১ মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটির বিধান রাখা হবে। কর্মজীবী মায়েদের পেশাগত সুরক্ষা ও শিশুদের যত্নে সারা দেশে পর্যাপ্ত আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে। অন্যদিকে, দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সম্মানে প্রবাসীদের জন্য থাকছে বিশেষ ‘গুচ্ছ পরিকল্পনা’। প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করা এবং এভিয়েশন সেক্টরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা ইশতেহারে স্থান পাচ্ছে। শ্রমিকবান্ধব এবং জনমুখী এই নীতিগুলো এনসিপিকে একটি কল্যাণকামী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা

স্বাস্থ্য খাতে ‘মোবাইল আইসিইউ’ ও জরুরি সেবা

• উপজেলা ভিত্তিক সেবা : প্রতিটি উপজেলায় বিশেষায়িত ‘মোবাইল অ্যাম্বুলেন্স’ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর লক্ষ্য হলো দুর্গম এলাকার রোগীদের দোরগোড়ায় জরুরি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া।

• অ্যাম্বুলেন্সে চিকিৎসা : রোগী তোলার সাথে সাথেই অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হবে। সংকটকালীন অবস্থার জন্য প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে থাকবে পোর্টেবল আইসিইউ (ICU) ও সিসিইউ (CCU) সুবিধা।

• বাস্তব চাহিদা পূরণ : অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে রোগীর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ও জীবন রক্ষাকারী সেবা সহজলভ্য করার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত বিপ্লব

• জাতীয় ডিজিটাল সার্ভার : প্রশাসনিক কাজকে গতিশীল করতে ‘জাতীয় ডিজিটাল সার্ভার’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

• স্বাস্থ্য ডেটাবেজ : প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যগত তথ্য সংরক্ষণে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য ডেটাবেজ স্থাপন করা হবে।

প্রবাসী ও এভিয়েশন খাতের আধুনিকায়ন

• বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ ‘গুচ্ছ পরিকল্পনা’ ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

• সহজ বিদেশ যাত্রা : প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী এবং হয়রানিমুক্ত প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার রূপরেখা থাকছে।

• শ্রমিকবান্ধব এভিয়েশন : বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরকে এমনভাবে সাজানো হবে যাতে এটি সরাসরি দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

কৃষি বাজার ও ‘কমিউনিটি এক্সচেঞ্জ’ প্রবর্তন

• সরাসরি বাজার প্রবেশ : কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে ‘কমিউনিটি মার্কেট’ বা ‘এক্সচেঞ্জ মার্কেট’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

• ডিজিটাল কৃষি তথ্য : কৃষকরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি নিজের পণ্যের বাজারমূল্য যাচাই করতে পারবেন এবং উৎপাদনস্থল থেকেই বিক্রির সুযোগ পাবেন।

• সিস্টেম লস হ্রাস : শহর ও গ্রামের বাজারের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে ‘সিস্টেম লস’ কমিয়ে আনা হবে, যাতে কৃষক সঠিক মূল্য পায় এবং ভোক্তার জন্য দাম নাগালে থাকে।

অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন যে, এই ইশতেহার কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ।

তিন নেতা ও শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে এনসিপি / ফাইল ছবি 

দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, আসন্ন নির্বাচনী ইশতেহার কেবল একটি প্রতিশ্রুতিপত্র নয়, বরং এটি হবে দলের আগামীর রাজনীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ভবিষ্যৎমুখী দিকনির্দেশনা। তার মতে, ‘আমাদের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা। যদি আমাদের জোট সরকার গঠন করতে পারে, তবে এনসিপি ইশতেহারে বর্ণিত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে সরকারের ওপর শক্তিশালী নীতিগত প্রভাব বজায় রাখবে। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হবে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আলোকে দেশ পরিচালনা নিশ্চিত করা।’

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এনসিপি আত্মপ্রকাশ করে। নানা নাটকীয়তা ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে ওই বছরের ২৬ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন দলটিকে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক দিয়ে নিবন্ধন প্রদান করে।  প্রতিষ্ঠার মাত্র এক বছরের মাথায় দলটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যতম শরিক হিসেবে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এনসিপি।