Image description

দেশের আর্থিক খাত লুটের অন্যতম হোতা চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত হাবিবুর রহমান এখনও ব্যাংকিং খাতে দোর্দন্ড প্রতাপের সঙ্গেই আছেন। পূর্ববর্তী কর্মস্থল ইউনিয়ন ব্যাংক লুটে এস আলমের সহযোগী হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে আওয়ামী লুটেরা সরকারের শেষের দিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে আসীন হন। এস আলমই তাকে এই পদে বসার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে এস আলম ও তার অন্য সহযোগীরা পালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বহাল-তবিয়তেই আছেন বহুল আলোচিত, ফ্যাসিস্ট চিহ্নিত এই দুর্নীতিবাজ ব্যাংকার।

৫ আগস্টের পরে তাকে এই পদে বহাল রাখতে নেপথ্যের শক্তি হিসেবে কাজ করছেন ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ। খবর নিয়ে জানা গেছে, এস আলম যখন ইউনিয়ন ব্যাংক লুটে মগ্ন তখন ওই ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিনিয়োগ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এই হাবিবুর রহমান। ইউনিয়ন ব্যাংকের পর তিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে যোগদান করেন। ৫ আগস্টের পর ইউনিয়ন ব্যাংক কেলেঙ্কারির তথ্য প্রকাশ পেলে তাকে ৯০ দিনের ছুটিতেও পাঠায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। কিন্তু হাবিবুর রহমানকে ছুটিতে পাঠানোর এই চিঠি কার্যকর করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ, তার পেছনে রয়েছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আবদুল আজিজসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। বরং পরবর্তীতে দেখা গেলো, তিনি রাতারাতি আরও ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন অদৃশ্য শক্তির জোরে। অথচ ইউনিয়ন ব্যাংকের বড় অংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে এই হাবিবুর রহমান সরাসরি জড়িত বলে প্রমাণাদি রয়েছে। এ দিকে তার বিরুদ্ধে দুদকের ইতিপূর্বের এক মামলায় চার্জশিটও হয়েছে। কিন্তু এতো কিছুর পরও তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থাকছেন, এমনকি মহাদাপটের সঙ্গেই আছেন।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান ছাড়াও বর্তমানে এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আরও বেশ কয়েকজন আওয়ামী স্বৈরাচারের দোসর রয়েছেন। এদিকে আরও একটি বিষয় বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব। সব মিলিয়ে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখন চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ২৯ শতাংশেরও বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ-৭ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের নামে পরিচালিত নাম সর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন ৩০টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিকে সর্বোচ্চ ১শ’ ৪৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়, সব মিলিয়ে যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৬শ’ ৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই পুরো টাকাটাই নাম সর্বস্ব বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, যা মোটেই আদায় হওয়ার মতো নয়। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউনিয়ন ব্যাংকের তৎকালীন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিনিয়োগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান এসব ঋণ অনুমোদনে “সরাসরি ভূমিকা” রাখেন। ঋণ প্রস্তাবের অফিস নোটে তার স্বাক্ষর পাওয়া গেছে, যা “প্রধান কার্যালয়ের প্রথম ও শেষ অনুমোদন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার চার্জশীটও রয়েছে। ২০০০ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ক্রেডিট বিভাগে দায়িত্বে থাকাকালে তিনি “প্যাট্রিক ফ্যাশনস” নামের এক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ গোপন করে নতুন করে আট কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের জন্য মিথ্যা তথ্য দেন। ওই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা হয়। মামলাটি বর্তমানে মেট্রোপলিটন স্পেশাল কোর্টে (মামলা নং ২৭২/২২) বিচারাধীন রয়েছে।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) হাবিবুর রহমান শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর থেকে এস আলম টাকা নিয়েছে এটা সবাই জানে। এসবের কারণে আমি কয়েকবার ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে রিজাইন (অব্যাহতি) দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। চাকরির সুবাদে আমরা সেখানে সাইন (স্বাক্ষর) করেছি। আমাদেরকে গান পয়েন্টে রাখা হয়েছে। তখন এসব দেখে আমি রেগুলেটরি অথরিটিতে (বাংলাদেশ ব্যাংক) কয়েকবার লিখিত অভিযোগ করেছি। এর প্রেক্ষিতে তারা আমাকে বলেন, তোমার এসব দেখতে হবে না যা করতে বলা হয়েছে সেটা করো। এসব নিয়ে আমাদের কিছুই করার ছিলনা।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে অনেক ব্যাংকের এমডিদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যা সবাই জানে। আমার ব্যক্তিগতভাবে লোন দেওয়ার কোন সুযোগ নেই, এটা দিতে পারে এমডি এবং বোর্ড। সেখানে কিছু দায়িত্বে থাকার কারণে অন্যান্যদের সঙ্গে আমাকেও স্বাক্ষর করতে হয়েছে।

জানতে চাওয়া হলে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, হাবিবুর রহমানের নামে সব অভিযোগ মিথ্যা, যা বলা হচ্ছে এসব বাহিরের মানুষ বলছে। তিনি আরও বলেন, তবে উনার নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একটি কেইস (মামলা) রয়েছে সেটাও অনেক আগের এবং স্টে (কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত) হয়ে আছে।

সূত্র বলছে, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে পিতা-পুত্রের আধিপত্য নিয়েও চলছে অস্থিরতা। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ এবং ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন তারই পুত্র একেএম আবদুল আলিম। সাম্প্রতিক সময়ে এই বাবা-ছেলের দ্বন্দ্বে স্থবির হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম। ফলে ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ যে কোন সিদ্ধান্ত নিতেও হিমশিম খাচ্ছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদে একেএম আব্দুল আলিমের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর। অবশ্য তিনি ব্যাংকটির পরিচালক পদ ছাড়াও ব্যাংকটির শরীয়াহ সুপারভাইজার কমিটিতেও রয়েছেন।

এদিকে আবদুল আলিম নিজেকে জোরপূর্বক ব্যাংকটির চেয়ারম্যন হিসেবে ঘোষণা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৬ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে ৬ জন এক পক্ষ নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠি দিয়েছে। সেখানে বর্তমান ভাইস-চেয়ারম্যান একেএম আব্দুল আলিম নিজেকে চেয়ারম্যান দাবি করেন।

জানা যায়, আবদুল আলিম গ্রুপের সদস্যরা অধিকাংশই স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের দোসর। আর এদের পেছনে নাটের গুরু হিসেবে কাজ করছেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ। শেখ হাসিনা পালানোর পর তিনি চেয়ারম্যান পদ ছাড়লেও তার আশীর্বাদপুষ্টরা এখনও রয়েছেন বহাল-তবিয়তে।

জানা গেছে, নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা আবদুল আলিম সাবেক চেয়ারম্যান কাজী আকরামের ছেলে কাজী খুররম আহমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ব্যাংকটির পরিচালক জাহেদুল হক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। জালিয়াতির মাধ্যমে সৎ ভাইদের জমির ওপর গড়ে ওঠা চট্টগ্রামের একটি ভবন ব্যাংকের কাছে উচ্চ মূল্যে ভাড়া দেওয়ার তথ্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই জালিয়াতির দায়ে তিনি ব্যাংকের পরিচালক পদ হারাতে পারেন বলে জানা গেছে। এছাড়া পরিচালক কামাল মোস্তফা চৌধুরী, অশোক কুমার সাহা ও অসিত কুমার সাহা এবং ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক গোলাম হাফিজ আহমেদ রয়েছেন এই তালিকায়। গোলাম হাফিজের পরিবার ছিল আওয়ামী লীগের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের সচিব। সেই সুবাদে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে তিনি ২০১৪ সালে তিন বছরের জন্য জোরপূর্বক ন্যাশনাল ক্রেডিট এন্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের এমডি হন। পরবর্তী সময়ে একই কায়দায় ২০১৮ সালে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ নেন। নানা অভিযোগের কারণে সেখানে তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।

এদিকে, খেলাপি ঋণে নাজুক পরিস্থিতিতে থাকা ব্যাংকটির ব্যালেন্স শিটেও ধস নেমেছে। একদিকে যেমন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে টানাপোড়েন অন্যদিকে আর্থিক পরিস্থিতিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯শ’ ৬৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ। গেল চার বছর আগে এই হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৩ সালে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ১ হাজার তিনশ’ ৮৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত দাঁড়ায় ২০ হাজার একশ’ ২৫ কোটি টাকা এবং মোট বিনিয়োগ ২০ হাজার তিনশ’ ৬১ কোটি টাকা।

তবে চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ শীর্ষনিউজ ডটকমকে বলেন, খেলাপি ঋণ আমরা অনেক রিকভারি (আদায়) করছি। গত বছর আমি যা পেয়েছি তার থেকে ৩শ’ কোটি টাকা রিকভারি করতে পেরেছি। এবছর ইতোমধ্যে ৪শ’ কোটি টাকা আদায় করতে পেরেছি, আগামী মাসের মধ্যে আরও ১শ’ কোটি টাকা রিকভারি করতে পারব।

শীর্ষনিউজ