আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে জমে উঠেছে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বাগযুদ্ধ। দুদলই দিচ্ছে হরেক রকমের প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে বিএনপি এখন মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান। জামায়াতকে ঘায়েল করতে বিএনপির মূল অস্ত্র 'মুক্তিযুদ্ধ' ও 'যুদ্ধাপরাধ' ইস্যু। অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন ও গণতন্ত্রের পথে জনগণের পথচলা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখার কথা বলছেন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বিভিন্ন নির্বাচনি সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন। গত ২৭জানুয়ারি পর্যন্ত তার বিভিন্ন সভার বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্বাচনি প্রচারে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ বেশ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছেন তিনি। বিভিন্ন জেলায় দেওয়া তার বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, জামায়াতের সমালোচনা করতে 'মুক্তিযুদ্ধ'কে প্রধান ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার বক্তব্যে 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান' প্রসঙ্গ ঠাঁই পেলেও, অতটা গভীরভাবে নয়।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বা মরহুম খালেদা জিয়ার সঙ্গে অতীতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক মৈত্রী থাকলেও বর্তমান নির্বাচনি মাঠে 'মুক্তিযুদ্ধ কার্ড' ব্যবহার করেই ইসলামপন্থি দলটিকে চেপে ধরতে চাচ্ছেন তারেক রহমান। বিভিন্ন জনসভায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে জাতির শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরছেন তিনি। গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দানে জনসভায় তিনি বলেন, 'যাদের কর্মকাণ্ডের কারণে (১৯৭১ সালে) লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, অসংখ্য মা-বোন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিচয় জনগণ ইতোমধ্যেই জানে।'
মৌলভীবাজারের জনসভায়ও মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার প্রসঙ্গ তোলেন তারেক রহমান। চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে ২৫ জানুয়ারির জনসভায় তারেক রহমান বলেন, 'চট্টগ্রাম সেই পবিত্র ভূমি যেখানে ১৯৭১-এ স্বাধীনতার ঘোষণা ও লড়াই হয়েছে।'
তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানকেও স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ১৮ জানুয়ারি ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে তিনি বলেন, '১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম আর ২০২৪ সালে দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম।'
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের জনসভায় তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী শ্রমিক, কৃষক, নারী-পুরুষ ও ছাত্রদের ১৯৭১ সালের আদর্শ অনুসরণকারী হিসেবেও তুলে ধরেন।
অর্থাৎ তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ভূমিকার ওপর বিশেষভাবে জোর দিচ্ছেন এবং নির্বাচনি প্রচারে তাদের সাম্প্রতিক কৌশলের সমালোচনা করছেন। মুক্তিযুদ্ধকে তারেক রহমান নির্বাচনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে জামায়াতের নেতিবাচক ভূমিকা উল্লেখ করছেন।
বিএনপির এ রাজনৈতিক অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ধারাবাহিক বক্তব্যে।
২৩ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বিভিন্ন নাগরিক ও নির্বাচনি সমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ সামনে এনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, আর তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ে দেশকে স্বাধীন করেছেন। তার বক্তব্যে তিনি সতর্ক করেন, যারা তখন (১৯৭১) দেশকে বিপদে ফেলেছিল, তাদের হাতে দেশ গেলে বাংলাদেশ টিকবে না। ফখরুল বলেন, স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরাই আবার নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে, অথচ বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি সব সময় ১৯৭১ সালকে মাথায় তুলে রাখে এবং যে দল দেশ ও স্বাধীনতাকে বিশ্বাস করে না, তাদের ভোট দিলে দেশের সর্বনাশ হবে।
অস্ত্র। বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির নির্বাচনি বয়ানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধই প্রধান রাজনৈতিক জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিএনপি একচেটিয়াভাবে একাত্তরের ইতিহাস ব্যবহার করছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন, রাজনৈতিক মুক্ত পরিবেশ এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে-সে ঘটনা বিএনপির বক্তব্যে গৌণ। জুলাই আন্দোলনকে কোনো বক্তব্যেই স্বাধীনতার সমতুল্য রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়নি। বিএনপির রাজনৈতিক বয়ানে মুক্তিযুদ্ধ একটি কেন্দ্রীয় ও একচেটিয়া জায়গা দখল করে আছে। বিপরীতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, যার ফলেই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্ভব হয়েছে; সে আন্দোলন বিএনপির বক্তব্যে প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও জামায়াতের নির্বাচনি প্রচার জামায়াতে ইসলামীর প্রচারে গুরুত্ব পাচ্ছে জুলাই বিপ্লব, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধীতা ও নতুন বাংলাদেশের রূপরেখার প্রসঙ্গ। গত ২৪ জানুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত ও পরিবার আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। পরে তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, 'ওরা (জুলাই আন্দোলনের শহীদরা) যে স্বাধীন, দুর্নীতিহীন, বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায্য বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্নগুলো পরণ করার জন্য জামায়াতে ইসলামী কাজ চালিয়ে যাবে। আমাদের কোনো নিজস্ব স্বপ্ন নেই; তাদের স্বপ্নই আমাদের স্বপ্ন।'
শফিকুর রহমান বলেন, 'জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদ ও তার সঙ্গে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তারা আমাদের এক প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব সেই বিশ্বাস ও স্বপ্নকে রক্ষা করা। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে দুর্নীতি, উগ্রবাদ বা হেজেমনির হরেক রকমের আধিপত্যের জায়গা থাকবে
নাধাধীনতার কথা বলে।
২৫ জানুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় জামায়াতের জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ভোটারের ভূমিকা নিয়ে বলেন, নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়ে কেউ যদি অন্ধকার গলিপথ' বা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন, এটা শুভ পরিণতি দেবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান সম্পর্কে ডা. শফিকুর বলেন, শহীদদের স্বপ্ন রক্ষা করতে জামায়াত কাজ চালাবে এবং উন্নয়ন, বৈষম্যহীন ও ন্যায্য বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম করে যাবে। শহীদদের দর্শন বা স্বপ্নই জামায়াতের কাজের মূল এবং তাদের স্বপ্ন পূরণের সংগ্রামে ঐক্য প্রয়োজন। বিএনপির 'মুক্তিযুদ্ধ কার্ড' ব্যবহারে সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। গত ২৩ জানুয়ারি খুলনার মিয়াজাহান এলাকায় জনসভায় তিনি বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দোষারোপগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনকি দশক পরও জামায়াতের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি না থাকায় এ অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।'তিনি বিএনপির দাবিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আমার দেশকে বলেন, তারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মতোই মুক্তিযুদ্ধের কার্ড ব্যবহার করছে। এসব বিষয় শুনতে শুনতে মানুষ বিরক্ত। নির্বাচনে এসবের জবাব দেবেন ভোটাররা।
নির্বাচনি প্রচারে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গকে হাইলাইট করা হলেও জুলাই বিপ্লবের প্রসঙ্গ খুবই কম আসছে এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল একাত্তর প্রসঙ্গে কোনো কথা বলেননি। তবে জুলাইযোদ্ধাদের পাশে থাকার বিষয়ে আলোচনা চলমান জানিয়ে তিনি আমার দেশকে বলেন, আমাদের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভায় জুলাই আন্দোলনের নেতাদের সম্মান ও তাদের বিপদে পাশে থাকার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে।