ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে চষে বেড়াচ্ছেন রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। প্রতিদিনই কমপক্ষে ৫-৭টি জনসভায় বক্তব্য রাখছেন তারা। দুই-একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা বাদ দিলে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে প্রচারণা। প্রার্থীদের ছবিযুক্ত পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে নির্বাচনি এলাকা। চলছে মাইকিং। মিছিল-স্লোগানে স্লোগানে মুখর পাড়া-মহল্লা।
অতীতে চূড়ান্ত প্রচারণার আগেই নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করতো দলগুলো। তবে এবার এখনও নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করতে পারেনি আলোচিত রাজনৈতিক দলগুলো। তাই নির্বাচনি মাঠে গৎ-বাঁধা বক্তব্য দিচ্ছেন। কিন্তু নিজেদের ইশতেহারভিত্তিক কোনও কথা বলছেন না। নেই পরিকল্পিত কোনও আশ্বাসও।
ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন, নির্বাচন কাছাকাছি এলেও রাজনৈতিক দলের ইশতেহার কোথায়? বিশেষ করে কার ইশতেহারে কী প্রাধান্য পাচ্ছে—এ নিয়েও কৌতূহলে রয়েছেন অনেকে। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা জানিয়েছেন, তাদের ইশতেহার তৈরি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে। কোনও কোনও দল ইতোমধ্যে ইশতেহার ঘোষণার তারিখও নির্ধারণ করেছে।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের কমপক্ষে ১২ দিন আগে নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছিল বিএনপি। তবে এবার দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশব্যাপী জনসভায় বক্তব্য রাখলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেনি দলটি।
এ বিষয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের ইশতেহার প্রস্তুতির কাজ চলমান। আশা করি, আগামী ৮-৯ জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত ইশতেহার ঘোষণা করা হবে।’’
তিনি জানান, ২০১৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া ঘোষিত ২০৩০ রূপরেখা ও তারেক রহমানের ৩১ দফা কর্মসূচির আলোকে হবে এবারের ইশতেহার। এতে ২০১৮ সালের ১৯ দফা ইশতেহারের অনেক বিষয়ও প্রাধান্য পাবে। আশা করি, এর মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথরেখা তৈরি হবে।
ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন পর্যন্ত নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেনি। তবে নির্বাচনে প্রচারণার আগে গত ২০ জানুয়ারি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পলিসি সামিটে দেশ গড়ার আগামীর পরিকল্পনা তুলে ধরেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা। অবশ্য নির্বাচনের আগে একটি ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘‘নির্বাচনে দলীয় ইশতেহার তৈরিতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত নিয়েছে তার দল। ইতোমধ্যে গঠনমূলক মতামতগুলো একসঙ্গে করে বাছাই করা হচ্ছে। আশা করি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন করে ইশতেহার ঘোষণা করা সম্ভব হবে।’’
এ বিষয়ে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনি মিডিয়া সেলের প্রধান মাহবুব আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইতোমধ্যে তাদের ইশতেহার প্রস্তুত হয়ে গেছে। ৩০ জানুয়ারি বিকালে গুলশানের লেকশো’র গ্র্যান্ড হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে তা ঘোষণা করবেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। মাহবুব জানান, প্রথমবারের মতো নির্বাচনি এ ইশতেহারের শিরোনাম হবে ‘তারুণ্যের মর্যাদার ইশতেহার’। এতে থাকবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি। এছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও থাকবে সহনশীলতার বার্তা। যেখানে পরমত সহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নারীবান্ধব সমাজ গড়ার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত ২৩ জানুয়ারি বাম রাজনৈতিক দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নিজেদের ১৮ দফা নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ইশতেহার ঘোষণা করেন জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ। এতে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্য সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চেতনা, যুবশক্তির বিকাশ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনে জোর দেওয়া হয়।
ঘোষণায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই সনদ অনুসারে গণভোটের পদ্ধতিকে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়েছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
এ বিষয়ে জোটের শরিক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দুর্নীতি, কালোটাকা ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চান তারা। সেই আলোকেই দেওয়া হয়েছে ইশতেহার।’’
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাচনি মিডিয়া সমন্বয়ক তাহসিন মাহমুদ জানান, তাদের কেন্দ্রীয় ইশতেহার ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে তা ঘোষণা করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম আহ্বায়ক সাকিব আনোয়ার জানান, তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করা হবে।
অপরদিকে ধর্মভিত্তিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইশতেহারও তৈরি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন দলটির প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলে করীম মারুফ। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) কেন্দ্রীয় নেতাদের বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন হবে এবং আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি তা প্রকাশ হতে পারে বলে তিনি জানান।
আরেক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক মাওলানা হাসান জুনাইদ জানান, তাদের ইশতেহারও ইতোমধ্যে চূড়ান্ত। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি তা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে বলে তিনি জানান।