Image description
খুলনার ছয়টি আসন

আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে খুলনার রাজপথে বইছে ভোটের হাওয়া। তবে এবারের নির্বাচনে খুলনার ৬টি আসনেই বিএনপির জন্য জয়ের পথ খুব একটা মসৃণ হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবার খুলনার ৫টি আসনে একক প্রার্থী দিয়েছে। পাশাপাশি জামায়াত জোটের একটি আসনে প্রার্থীও রয়েছে। বেশ কিছু আসনে হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতিতে ত্রিমুখী ও বহুমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

খুলনার ছয়টি আসনে এবার ১৪টি দল ও স্বতন্ত্রসহ মোট ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসনভেদে প্রার্থী সংখ্যার ব্যবধান এবং স্থানীয় রাজনৈতিক মেরুকরণ এবারের ভোটে দিচ্ছে নতুন মাত্রা। আসনগুলোতে বিএনপির ছয়জন একক প্রার্থী রয়েছেন। জামায়াত ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসের মতো একাধিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে বিএনপিকে।

খুলনা-১ (বটিয়াঘাটা-দাকোপ) : জেলায় সবচেয়ে বেশি ১২ জন প্রার্থী আছেন এই আসনে। এই উপকূলীয় অঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় প্রভাব রয়েছে। বিএনপির আমীর এজাজ খানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ জামায়াতের কৃষ্ণ নন্দী এবং একঝাঁক হিন্দু প্রার্থীর ভোট টানা। প্রার্থী সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে ভোট অনেক ভাগে বিভক্ত হতে পারে, যা মূল লড়াইকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ আসনের প্রার্থীদের মধ্যে আছেন আমীর এজাজ খান (বিএনপি), কৃষ্ণ নন্দী (জামায়াত), সুনীল শুভ রায় (ইসলামী ফ্রন্ট), মো. আবু সাঈদ (ইসলামী আন্দোলন), কিশোর কুমার রায় (সিপিবি), জিএম রোকনুজ্জামান (গণঅধিকার পরিষদ), প্রবীর গোপাল রায় (বিএমজেপি), প্রসেনজিৎ দত্ত (জেএসডি), মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (জাতীয় পার্টি), সুব্রত মন্ডল (বিইপি), স্বতন্ত্র রয়েছে অচিন্ত্য কুমার মন্ডল ও গোবিন্দ হালদার।

খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) : সবচেয়ে কম মাত্র ৩ জন প্রার্থী আছেন এ আসনে। কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে এটিই শীর্ষ আসন। বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলেও জামায়াতের শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এখানে সংগঠিত ভোটব্যাংকের ভরসায় লড়ছেন। মূলত সদর এলাকার এই লড়াইয়ে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ভোট কাটাকাটিই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে। এ আসনের প্রার্থীরা হলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু (বিএনপি), শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল (জামায়াত) এবং আমানুল্লাহ (ইসলামী আন্দোলন)।

খুলনা-৩ (খালিশপুর-দৌলতপুর-খানজাহান আলী) : শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনের বেশি প্রার্থী। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী যদি বড় ধরনের ভোট টানে, তবে ধানের শীষের জন্য এই ঘাঁটি রক্ষা করা কঠিন হবে। এ আসনের প্রার্থীরা হলেন রকিবুল ইসলাম বকুল (বিএনপি), মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান (জামায়াত), মো. আ. আউয়াল (ইসলামী আন্দোলন), মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন (জাতীয় পার্টি), জনার্দন দত্ত (বাসদ), শেখ আরমান হোসেন (এনডিএম)। স্বতন্ত্ররা হলেন এসএম আরিফুর রহমান মিঠু, মঈন মোহাম্মদ মায়াজ, মো. আবুল হাসনাত সিদ্দিক ও মো. মুরাদ খান লিটন।

খুলনা-৪ (রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া) : এ আসনের প্রার্থী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্যবিষয়ক সম্পাদক এসকে আজিজুল বারী হেলাল মাঠে বেশ সক্রিয়। এ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের এসএম সাখাওয়াত হোসেন। জামায়াত ইসলামী ও খেলাফতে মজলিসের ভোটব্যাংক জোট হলে এবং ইসলামী আন্দোলন নিজস্ব ভোটগুলো সংগ্রহ করতে পারলে বিএনপির ভোটব্যাংকে টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ আসনের প্রার্থীরা হলেন এসকে আজিজুল বারী হেলাল (বিএনপি), এসএম সাখাওয়াত হোসেন (খেলাফত মজলিস), ইউনুস আহমেদ শেখ (ইসলামী আন্দোলন) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম আজমল হোসেন।

খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) : পুরো জেলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এ আসনে দুই হেভিওয়েটের লড়াই হবে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের শক্ত অবস্থানের বিপরীতে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আলী আসগার লবী এক ইঞ্চিও ছাড় দিতে রাজি নন। লবী সম্পদের দিক থেকে জেলার সবচেয়ে ধনী প্রার্থী হলেও সাংগঠনিক শক্তির পরীক্ষায় পরওয়ার তাকে টেক্কা দিচ্ছেন। এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন শামিম আরা পারভীন (জাতীয় পার্টি) ও চিত্ত রঞ্জন গোলদার (সিপিবি)।

খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) : সুন্দরবনের কোলঘেঁষা উপজেলায় রাজনীতিতে আতঙ্ক জামায়াত। জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পির বড় চ্যালেঞ্জ এই এলাকায় জামায়াতের বিশাল ক্যাডার ও ভোটব্যাংক। স্বাধীনতার পর থেকে জামায়াত এখানে বারবার নিজেদের আধিপত্য দেখিয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় বাঁধে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এখানে ভোটের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে কয়রা উপজেলায় জামায়াতের বেশ শক্ত অবস্থান থাকায় এখানকার জামায়াত প্রার্থী মো. আবুল কালাম আজাদ শক্তিশালী প্রার্থী বলে দাবি কয়রাবাসীর। পাশাপাশি পাইকগাছায় সম্প্রতি ভালো অবস্থানে চলে গেছে বিএনপি। এ আসনের প্রার্থীরা হলেন এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পি (বিএনপি), মো. আবুল কালাম আজাদ (জামায়াত), প্রশান্ত কুমার মণ্ডল (সিপিবি), মো. আছাদুল্লাহ্ ফকির (ইসলামী আন্দোলন) এবং মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর (জাতীয় পার্টি)।

বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনার ৬টি আসনেই বিএনপি প্রার্থীদের জন্য এবারের ভোটটি হবে ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’। জামায়াতে ইসলামীর ৫ জন প্রার্থী এবং জেলায় মোট ৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর অবস্থান বিএনপির জন্য কেবল শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বড় ধরনের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।