দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই বড় কোনো ব্যত্যয় না ঘটলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। নানা ঘাত–প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের মাঠে দলটির এই প্রত্যাবর্তন নতুন সম্ভাবনার প্রশ্নও সামনে এনেছে। একদিকে জাতীয় পার্টির দাবি, তাদের অংশগ্রহণ নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আনতে পারে। অন্যদিকে, নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে জাপার অংশগ্রহণ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছে দলটি।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলে জাতীয় পার্টির যে শক্ত ঘাঁটি ছিল, তা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকার কারণে বিভিন্ন আসনে সমঝোতার রাজনীতিতে যেতে হয়েছে, যা সাংগঠনিক ভিত্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে আসনে জয় পাওয়া কঠিন হলেও আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ ভোটের একটি বড় অংশ পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নেতৃত্ব সংকট ও মনোনয়ন বিতর্ক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দলটির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টিও সেই সময় থেকেই অভ্যন্তরীণ বিরোধ, মামলা ও অন্তঃকোন্দলে জড়িয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের শুরুতে দলটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও।
২০২৫ সালের শুরুতে জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আগে বহিষ্কৃত আরও কয়েকজন নেতা দলটির একটি নতুন অংশ গড়ে তোলেন। রওশন এরশাদপন্থী অনেক নেতাও পরবর্তী সময়ে এই অংশে যোগ দেন। তারা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের ক্ষমতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন এবং ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের প্রকৃত দাবিদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
২০২৫ সালজুড়ে দুই অংশের দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করে। লাঙ্গল প্রতীকের মালিকানা নিয়ে জটিলতা ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়ে দেয়, অন্তর্দলীয় বিরোধে তারা হস্তক্ষেপ করবে না। ইসির ভাষ্য ছিল, বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, দলকেই নিজ উদ্যোগে সংকটের সমাধান করতে হবে।
অক্টোবর মাসে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করলে নতুন বাস্তবতা সামনে আসে। ইসির ওয়েবসাইটে হালনাগাদ থাকা নেতৃত্বসংক্রান্ত তথ্যকেই কমিশন প্রাধান্য দিচ্ছে—এ বিষয়টি তখন স্পষ্ট হয়। জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নাম বহাল থাকলেও মহাসচিব হিসেবে ছিলেন মুজিবুল হক চুন্নু।
তফসিল ঘোষণার পর এই অবস্থানকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগান বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের। দলীয় সূত্র জানায়, ইসির নিবন্ধনে এখনো চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরের নাম থাকায় এবং মহাসচিব পদে মুজিবুল হক চুন্নুকে বহিষ্কার করে শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে নিয়োগ দেওয়ায়, কেবল চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরকেই বৈধ মনোনয়ন হিসেবে গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।
আইন অনুযায়ী দলীয় মনোনয়নপত্রে চেয়ারম্যান, মহাসচিব অথবা সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর থাকলেই তা বৈধ হওয়ার কথা থাকলেও ইসি জানায়, তাদের সংরক্ষিত দলীয় প্রধান ও কার্যনির্বাহী প্রধানের তালিকা অনুযায়ী কেবল দলীয় প্রধানের মনোনীত ব্যক্তির স্বাক্ষরই গ্রহণযোগ্য হবে। ইসির ভাষ্যমতে, সেই স্বাক্ষর জিএম কাদেরের।
এর ফল হিসেবে ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন দাখিলের পর ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি যাচাই-বাছাইয়ে দেখা যায়, রুহুল আমিন হাওলাদারের স্বাক্ষরে দাখিল করা জাতীয় পার্টির সব মনোনয়ন বাতিল হয়। বিপরীতে, জিএম কাদেরের স্বাক্ষরযুক্ত মনোনয়নগুলো বৈধ ঘোষণা করা হয়।
ত্রয়োদশ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে মোট ২২৪ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেন। এর মধ্যে ২৫ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে ইসির আপিল শুনানিতে ২৪টি আপিলের মধ্যে ২০টি মনোনয়ন পুনর্বহাল করা হয়। বাকি ছয়টি আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে, আর দুজন প্রার্থী উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আপিল শুনানিতেও বারবার মনোনয়নপত্রে কার সই আছে—তা যাচাই করা হয়। ইসি সূত্র জানায়, কেবল জিএম কাদেরের সই থাকলেই মনোনয়ন পুনর্বহাল করা হয়েছে।
হাইকোর্টের রুল ও নতুন শঙ্কা
জাতীয় পার্টির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাইকোর্টের একটি রুল। জুলাই অভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আয়োজিত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে জাপার নির্বাচনযোগ্যতা প্রশ্নে এই রুল জারি করা হয়। গত বছরের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনের প্রেক্ষাপটে এ রুল আসে, যেখানে জুলাই অভ্যুত্থানে গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধের কথা বলা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে জাপার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। তবে এখনো এই রুলে কোনো স্থগিতাদেশ বা চূড়ান্ত আদেশ নেই।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘যারা এই মামলা করেছে, তারা জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চায়। তবে আদালতের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। রুলের শুনানিতে জাপা প্রার্থীরা বৈধ ঘোষিত হবেন বলে আমরা আশাবাদী।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্টে অর্ডার না থাকা সত্ত্বেও আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যা করে নির্বাচন কমিশনের সামনে মিছিল ও হুমকি দেওয়া বিচার বিভাগের প্রতি অবমাননা এবং গণতন্ত্রবিরোধী।’
ভোটে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি ভোটে যাবে কি না—এটি আমাদের নিজস্ব দলীয় সিদ্ধান্ত। অন্য কেউ এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিকভাবে আমাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।’
তার দাবি, সুষ্ঠু ও সমান সুযোগের নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি ৪০ থেকে ৭০টি আসন পেতে পারে।
জাতীয় পার্টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দ্বিমত
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, রংপুর ও উত্তরবঙ্গ তাদের মূল শক্তির জায়গা। পাশাপাশি শরীয়তপুর, ফরিদপুর, খুলনা ও যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলেও ভালো জনসমর্থনের আশা করছেন তারা। সিলেটসহ কয়েকটি অঞ্চলেও জাপার প্রার্থীরা সক্রিয় রয়েছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের ভোটের একটি অংশ জাতীয় পার্টির দিকে আসতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. তানজিরুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হলেও অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেবে না—এমনটি বলা হয়নি। তফসিল ঘোষণার পর এটি আরও নিশ্চিত হয়েছে যে জাপা নির্বাচনের রেসে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যদি শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি নির্বাচনে থাকে, তবে তা বিশেষ করে রংপুর ও আশপাশের জেলাগুলোতে ভোটের হিসাব বদলে দিতে পারে। তারা নিজেদের ভোটের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের ভোটও পেতে পারে।’
তবে আসন জয়ের বিষয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ভোট পেলেও খুব বেশি আসনে জেতা জাতীয় পার্টির জন্য কঠিন হবে। তবে বিএনপি ও ইসলামিক দলগুলোর জোটের মধ্যে বিভক্ত হওয়া ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে জাতীয় পার্টি নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীও মনে করেন, জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের আগের সহিংসতায় জড়িত থাকার সরাসরি প্রমাণ বা কোনো মামলা না থাকায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এতে নির্বাচন আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।
তিনি নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বলেন, জাতীয় পার্টি আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। দীর্ঘদিন জোটে থাকায় সাংগঠনিকভাবে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবার ৫ আগস্টের পর তাদের গ্রহণযোগ্যতাও তেমন একটা নেই। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না।
তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক ইতোমধ্যেই বিএনপিকেন্দ্রিক বা জামায়াত-সমর্থিত জোটের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। যেমন বগুড়ায় শোনা যাচ্ছে, সাতটির মধ্যে দুইটি আসনে জামায়াত প্রার্থী জিতে আসতে পারে। কারণ স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থন জামায়াত পাচ্ছে। এভাবে দেশের অনেক জায়গা থেকেই এমন বক্তব্য আসছে যে জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোটের একাংশ পেতে পারে। তাই জাতীয় পার্টির প্রভাব সীমিতই থাকতে পারে।