আসন সমঝোতা নিয়ে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একক নির্বাচনের পথে এগোতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। গত রাতে দলটি শুরা সদস্য ও সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ডেকে মতামত নিলে অধিকাংশই সমঝোতা থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে মত দেন বলে জানা গেছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ইসলামী আন্দোলনের শুরা সভা থেকে দলটির আমির, চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমকে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জোট ভাঙা-না ভাঙা ও টানাপোড়েনের বিষয়টি নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জামায়াত নেতা ও বগুড়া-০৩ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নূর মোহাম্মদ আবু তাহের।
`হ্যাঁ, সত্য এটাই- ১১ দলের সমঝোতা ভেঙে যাচ্ছে' শিরোনামে দেওয়া তার স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য—
ইসলামী আন্দোলন গত রাতে শুরা এবং সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ডেকে মতামত নিয়েছে। অধিকাংশের মত সমঝোতা থেকে বেরিয়ে একক নির্বাচন করার। প্রথমত, আমি ব্যক্তিগতভাবে ইসলামী আন্দোলনের সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। যেকোনো রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থ দেখবে এবং নিজ দলের জন্য বেস্ট অপশন বেছে নেবে। এই অধিকার ইসলামী আন্দোলনের আছে। দ্বিতীয়ত, আমি এখনও স্বপ্ন দেখি, সমঝোতা অক্ষুন্ন থাকবে। টানাপোড়েন শেষে একটা সমঝোতা হবে ইনশাআল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের শুরা সম্ভবত পীর সাহেবকে চূড়ান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
আজ ১১ দলের পক্ষ থেকে প্রেস কনফারেন্স হবে। এখনও চেষ্টা চলছে সেখানে যেন ইসলামী আন্দোলনও থাকে। যদি ইসলামী আন্দোলন না আসে, আমার ধারণা তাদের জন্য বরাদ্দকৃত আসন বাকি রেখেই হয়তো আজকের প্রেস কনফারেন্স হয়ে যাবে। আগামী ৩/৪ দিন সমঝোতার শেষ চেষ্টা চলমান থাকবে।
সমস্যাটা কোথায় আসলে?
ইসলামী আন্দোলনকে সমঝোতায় চূড়ান্তভাবে ৪৫টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের দাবি এখন ৬৫-৭০ আসনের মতো। নির্বাচন পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়েও স্পষ্ট ঘোষণা চায়। সরকার গঠিত হলে কে কোথায় থাকবে, এগুলো স্পষ্ট চায়।
ইতোমধ্যে অনেককিছু স্পষ্ট করা হয়েছে, যেগুলো আরও স্পষ্ট করা দরকার, সেগুলো নিয়ে আলাপ হতে পারে। মুশকিল হলো, ইসলামী আন্দোলনের তৃণমূলের প্রেসার তৈরি হয়েছে শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ওপর। স্বাভাবিকভাবেই সমঝোতায় বড়ো অংশ আসন ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এসব আসনের প্রার্থী এবং নেতাকর্মীরা স্বাভাবিকভাবেই নাখোশ।
১৯৯১ সালে ১৮টি আসন এবং ১৯৯৬ সালে ৩টি আসনের এমপি পদে জেতার পরেও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোট জামায়াতকে মাত্র ৩৭টি আসনে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়েছিল। তখন জামায়াতের বিভিন্ন আসনে মনঃকষ্ট তৈরি হয়েছিল। যেসব আসনে জামায়াত ১০/১৫ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছিল, সেসব আসনেও নির্বাচন করার সুযোগ পায়নি। দীর্ঘ ২৫ বছর জোটের কারণে নিজ দলের প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। এসবের প্রভাব জামায়াতের অভ্যন্তরেও ছিল।
কিন্তু দিনশেষে আমরা চারদলীয় জোটের প্রতি কৃতজ্ঞ। জোটের কারণেই আমরা রাষ্ট্রীয় সিস্টেমস এ্যান্ড কাস্টোমস শিখেছি। রাষ্ট্র কীভাবে ফাংশন করে, জেনেছি। বিএনপির সাথে এখন আমাদের জোট নেই, তবে কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। ইসলামী আন্দোলনের নিজস্ব সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতেই হবে। একইসাথে বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বিনীত অনুরোধ জানাই। জামায়াতকেও অনুরোধ করি, শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাবে নিশ্চয়। প্রয়োজনে আরও উদার হয়ে চেষ্টা করবে নিশ্চয়।
আজকের সিদ্ধান্তের আউটপুট (ভালো কিংবা খারাপ) আজকেই পাওয়া যাবে না; লম্বা সময় পরে উপলব্ধিতে আসবে। ইসলামী আন্দোলনের সংসদীয় রাজনীতিতে সজীব থাকা দেশের জন্যই জরুরি। হ্যাঁ, প্রত্যেক দল অনুভব করছে আমরা বেশি সাক্রিফাইজ করছি অথবা বেশি মজলুম হয়ে যাচ্ছি। আপনি যখন আগামী ১৫/২০ বছর নিয়ে চিন্তা করবেন, তখন অনেক সিদ্ধান্ত সহজ হয়ে যায়।
জামায়াতকে যেভাবে অবিশ্বস্ত সঙ্গী বিবেচনা করছেন, মোটেও এমনটা নয়। জামায়াত বিশ্বস্ততার সাথে সমঝোতার সঙ্গীদের সাথে সর্বোচ্চ ডেডিকেশন দিয়ে আচরণ করবে। এখন পর্যন্ত যারা সমঝোতায় আছে, তারা আগামীতে এর প্রমাণ পাবে ইনশাআল্লাহ। সোস্যাল মিডিয়াতে দেখছি, জামায়াত কিং ইসলামী আন্দোলন, উভয় শিবির একে অপরকে কামান দাগাচ্ছে। এটা বন্ধ করুন ভাইসকল প্লিজ। রাজনীতি লম্বা রেস। এমনও হতে পারে নির্বাচনের পরেই আমাদের আসন সমঝোতা করতে হচ্ছে।
আজ নেতাকর্মীরা যা বলছে, আগামীকাল অনেকের বোধের পরিবর্তন হতে পারে। একসময় জামায়াত-ইসলামী আন্দোলন অনেক বৈরিতা ছিল; বাস্তবতায় কাছাকাছি এনেছে। পরিস্থিতি হয়তো এখন একটু এলোমেলো, আগামীকাল আবারও সুন্দর ও গোছালো হতে পারে।
সবশেষে তিনি লিখেন, ‘সবাইকে শান্ত থেকে বেশি বেশি দুআ করা উচিত। আমি জামায়াতের একজন কর্মী এবং সংসদ সদস্য প্রার্থী। সমঝোতা চাই মনেপ্রাণে। সমঝোতা না হলেও ইসলামী আন্দোলনের জন্য দুআ করব। আমার আসনের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীর বাড়িতে যাব। তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করলে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে সম্মান করে যাব।
বিএনপি জোটে যাওয়া জমিয়তের জন্যও শুভকামনা জানাই। একটা আফসোস তো থাকবেই। হয়তো আমাদের জীবদ্দশায় একটা ইসলামী ঐক্য দেখে যেতে পারব না। তবে আমি নিশ্চিত, আগামী প্রজন্ম একদিন একসাথে মিলিত হবেই। আল্লাহ স্বাক্ষী, আমাদের অন্তরে উম্মাহ নিয়ে কী পেরেশানি আছে। এই পরিস্থিতিতে রাব্বুল আলামিন সবাইকে সমঝ দান করুন।’