Image description

তিস্তা অববাহিকায় অবস্থিত লালমনিরহাট জেলায় নির্বাচনের আমেজ এখন তুঙ্গে। সেখানে প্রার্থীরা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নদীভাঙন রোধ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় ভোটাররা তিস্তা ইস্যুকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, যা নির্বাচনি প্রচারে বড় প্রভাব ফেলছে। এই জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন রয়েছে।

তফসিল ঘোষণার পর আসন্ন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে লালমনিরহাট জেলার ৩ আসনেই ভোটের মাঠ সরগরম হয়ে উঠেছে। ভোটের মাঠে লড়াইয়ের প্রস্তুতি কেমন হবে, কোন দলের অবস্থান ভালো—এসব বিষয়ে ঘরে-বাইরে চলছে নানামুখী আলোচনা। প্রার্থীদের পক্ষে চলছে কর্মী-সমর্থকদের কৌশলী প্রচার।

এক সময় জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটের অতীত এখন স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে জেলার রাজনীতিতে এক নতুন উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে। লালমনিরহাট-৩ আসন ও লালমনিরহাট-১ আসনে বিএনপি থেকে একক প্রার্থী বেশ আগেই ঘোষণা করা হলেও লালমনিরহাট-২ আসনে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেওয়ায় প্রার্থী ঘোষণা প্রথমে স্থগিত রাখে দলের হাই কমান্ড। যদিও নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় জেলা বিএনপির সহসভাপতি রোকন উদ্দিন বাবুলকে।

এ আসনে অনেক আগে থেকেই জামায়াতে ইসলামী শক্তভাবে মাঠে রয়েছে। তবে জাতীয় পার্টি কার্যত সাংগঠনিকভাবে বিবর্ণ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে জেলার তিনটি আসনে জাতীয় পার্টি ছিল দৃঢ় অবস্থানে। তবে সময়ের ব্যবধানে দলটি লালমনিরহাটে হারিয়েছে সাংগঠনিক জৌলুস ও জনসম্পৃক্ততা। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দলটির কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই এ জেলায়।

লালমনিরহাট-১

দুটি উপজেলা, একটি পৌরসভা ও ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনের ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৩ জন। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, তিনবিঘা করিডোর ও ত্রিদেশীয় সংযোগস্থল বুড়িমারী স্থলবন্দর হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো এ আসনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আসনটি জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও বিএনপি এবার মাঠে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি এ আসনটি মিত্র দল জামায়াতে ইসলামীর জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। ২০০৮ সালে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান ৭৪ হাজার ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। এবারও জামায়াতের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। দলটির শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগের কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট আনোয়ারুল ইসলাম রাজু নিয়মিত ইউনিয়নভিত্তিক সভা ও হাটবাজারে গণসংযোগ করছেন। জামায়াত নেতারা বলছেন, কোভিডকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে রাজুর এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচনি প্রচারে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তার নেতৃত্বে জামায়াতের সংগঠন এখন তৃণমূল পর্যন্ত প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

এদিকে এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান রাজীব প্রধান। বর্তমানে মাঠে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পাড়া-মহল্লায় ব্যাপক গণসংযোগ করছেন।

এছাড়াও এ আসনে আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন—ইসলামী আন্দোলনের ফজলুল করিম শাহরিয়ার, এবি পার্টির আবু রাইহান রছি। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করবেন শিহাব আহমেদ, রেদওয়ানুল হক সন্ধান ও জাতীয় পার্টির মশিউর রহমান রাঙ্গা।

লালমনিরহাট-২

এই আসন (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ২৬ হাজার ১৭৯ জন। তন্মধ্যে কালীগঞ্জে ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ২২ হাজার এবং আদিতমারীর ভোটার সংখ্যা দুই লাখ চার হাজার ১৭৯ জন। স্বাধীনতাপরবর্তী সময় থেকে এ আসনটি জাপার সাবেক এমপি মজিবুর রহমানের দখলে ছিল। তিনি পরপর সাতবার এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে এ আসনের দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন মহাজোট প্রার্থী ও কালীগঞ্জ উপজেলা আ.লীগের সভাপতি নুরুজ্জামান আহমেদ এ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১৮ সালের বিতর্কিত রাতের ভোটেও বিএনপির প্রার্থী রোকন উদ্দিন বাবুলের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে এমপি নির্বাচিত হন নুরুজ্জামান আহমেদ। তিনি প্রথমে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও পরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হন।

এদিকে আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী ফিরোজ হায়দার লাভলু অনেক আগে থেকেই মাঠ গরম করে রেখেছেন। এ আসনে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও তাকে ভাবা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন বাস্তবতায় জেলার রাজনীতি মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর তাদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সাবেক মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। অনেক নেতাকর্মী হাজতে আছে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী লাভলু তার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নিয়মিত সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। এলাকার দরিদ্রপীড়িত অসহায় মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা, চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। এতিম শিশুদের পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে যাচ্ছেন। তিনি এ আসনটির প্রত্যেকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাটবাজার থেকে শুরু করে প্রতিটি পাড়া-মহল্লার লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের দুঃখকষ্টের কথা শুনছেন এবং তার সাধ্য অনুযায়ী সমাধান করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে জাপার সাবেক এমপি মজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র শামীম কামাল জনতার দল নামে নিজেই একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তার বাবার জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তি ইমেজে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। মানুষ আশা করে, তিনি তার বাবার মতোই এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন এবং জনগণের পাশে থাকবেন। আসন্ন নির্বাচন ঘিরে তিনি নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ও হাটবাজারগুলোতে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

সদ্য মনোনয়ন পাওয়া রোকনউদ্দিন বাবুল ছাড়াও এ আসন থেকে বিএনপির আরো তিন নেতা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে অনেক আগে থেকেই গণসংযোগে মাঠে ব্যস্ত ছিলেন। তারা হলেন—সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সালেহ উদ্দিন আহমেদ হেলাল, কৃষিবিদ ড. রোকনুজ্জামান এবং কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম। দলীয় সূত্রে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখনো পুরোপুরি মেটেনি। মনোনয়নবঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এদিকে ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থী মুফতি মাহফুজুর রহমানও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লালমনিরহাট-২ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন একাধিক। এ কারণে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে দলটি। মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির এই বিভক্তির ক্ষোভের কারণে জামায়াতে ইসলামী অনেক বেশি সুসংগঠিত।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নির্বাচনি মাঠে নেই। জাপারও কোনো প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে না। তাই এ আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জনতার দলের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

লালমনিরহাট-৩

লালমনিরহাটের সদর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-৩ আসনটি। তবে এ আসনে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে। এ আসনে জাপার জিএম কাদের দীর্ঘদিন এমপি ছিলেন।

বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলু এ আসনে দলের একক প্রার্থী। তিনি ২০০১ সালের ভোটে সংসদ সদস্য নিবাচিত হয়ে প্রথমে যোগাযোগ উপমন্ত্রী এবং পরে খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এ আসনে অন্য দুটি আসনের চেয়ে বিএনপির অবস্থান বেশ ভালো। একসময় আসনটিতে জাতীয় পার্টির একছত্র আধিপত্য ছিল। বর্তমানে দলটির ইমেজ সংকটের কারণে জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে।

এ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আবু তাহের ব্যক্তি হিসেবে ক্লিন ইমেজের। তিনি এ আসনের প্রত্যেকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাটবাজার থেকে শুরু করে প্রতিটি পাড়া-মহল্লার লোকজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভোট চাইছেন। প্রত্যেক এলাকার মসজিদের মুসল্লিদের সঙ্গে কুশল বিনিময়সহ বিশেষ করে জানাজার নামাজে রয়েছে তার সরব উপস্থিতি। তাকে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে এ আসনের ইসলামী আন্দোলনের লালমনিরহাট জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোকছেদুল ইসলামও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইনিয়নের শিক্ষক দবিয়ার রহমান বলেন, মানুষ এখন উন্নয়নমুখী তাই তারা সৎ-যোগ্য নেতৃত্ব চায়।

আদিতমারী উপজেলা সদরের পশ্চিমপাড়া গ্রামের গোলাপ মিয়া, মরিয়ম বেগমসহ আরো অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, দ্রব্যেমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মাদকের ছোবলে সমাজ সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছে। তাই মাদকমুক্ত লালমনিরহাট গড়তে যিনি ভূমিকা রাখতে পারবেন, সে প্রার্থীকে আমরা ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করব।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের আবিদা বেগম বলেন, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত লালমনিরহাট চাই। এজন্য এবারের নির্বাচনে আমরা সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করব। একই এলাকার তরুণ ভোটার কামাল মিয়া বলেন, কর্মসংস্থান না হলে তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই যারা কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেবে তাদের ভোট দেব।