Image description

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের সিদ্ধান্ত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভেতরে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একের পর এক শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতারা দল ছাড়লেও তাদের ফেরাতে পারছে না কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

দলত্যাগী নেতারা নিজেদের অবস্থানে অনড়—জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না হলে ফেরার প্রশ্নই ওঠে না।

এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব দাবি করছে, তারা দলত্যাগী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে দলত্যাগী নেতাদের ভাষ্য ভিন্ন। তাদের মতে, এসব প্রচেষ্টা মূল আদর্শগত সংকট সমাধানে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

গতকাল পর্যন্ত সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহসহ অন্তত ১৫ জন শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতা পদত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আরও ছয়জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।

এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন এবং যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করলেও জামায়াতের সঙ্গে জোটের পর থেকে তারা দলীয় কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরা নেতাদের দলে ফেরানোর চেষ্টা করছি এবং তাদের সঙ্গে কথা বলছি।

তিনি বলেন, তারা শুধু হতাশা থেকে দল ছাড়েননি। এর পেছনে আরও কিছু অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে। সে কারণেই পুরো বিষয়টি সময়সাপেক্ষ।

তবে দলত্যাগী নেতারা এসব বক্তব্যকে 'মিথ্যা ও বানোয়াট' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে জনগণ ও দলীয় সমর্থকদের বিভ্রান্ত করতেই নেতৃত্ব এই বয়ান দিচ্ছে।

অন্তত পাঁচজন সাবেক নেতা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, প্রধান সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ফোন করলেও তাদের মূল আদর্শগত উদ্বেগ দূর করতে কোনো শক্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ কোনো ধরনের যোগাযোগের কথা অস্বীকার করে বলেন, আমাকে দলে ফেরানোর বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কারও সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি।

ভিন্নমতাবলম্বী নেতারা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগদানের প্রক্রিয়াকে অগণতান্ত্রিক ও পূর্বপরিকল্পিত বলে অভিহিত করেছেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক নেতা বলেন, এটি ছিল একটি 'খারাপ সমঝোতা', যার বিরোধিতা তারা শুরু থেকেই করে আসছিলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ডিসেম্বর নির্বাহী কমিটির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নির্বাচন কৌশল ও জোট নিয়ে আলোচনার জন্য একটি বৈঠকের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রায় ৪০ জন সদস্য ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তবে জোটের বিরোধিতা করা অনেকেই সেখানে ছিলেন না।

ফলে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে দুই-তিনজন ছাড়া সবাই জোটের পক্ষে মত দেন। উপস্থিতদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়েই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয় বলে জানান প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পরিচিত এক নেতা।

আরেক নেতা দাবি করেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য এই জোটের পথ আরও সহজ হয়ে যায়।

এনসিপির সাবেক আইসিটি সেল প্রধান ফারহাদ আলম ভূঁইয়া বলেন, এর আগে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। গণঅভ্যুত্থানের পর এনসিপিতে যোগ দিয়ে দেড় বছর আইটি খাতে কাজ করেছি। কিন্তু জামায়াত নেতৃত্বের সঙ্গে জোটের প্রক্রিয়া দেখে আমি সঙ্গে সঙ্গে একটি ভিন্নমত নোট দিয়ে প্রতিবাদ জানাই এবং প্রথমেই পদত্যাগ করি। তথাকথিত এই রাজনীতির অংশ আমি হতে চাইনি।

ফিরে আসার চাপ প্রসঙ্গে ফারহাদ বলেন, দলের শীর্ষ নেতারা যোগাযোগ করে আমাকে ফেরার অনুরোধ করেছেন। তবে আমি স্পষ্ট করে বলেছি, এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করলে আমি ফিরব না।

দলীয় সূত্র জানায়, পদত্যাগ করা নেতাদের পুনর্বহাল নিয়ে আলোচনার জন্য এনসিপি একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সময়সূচি ঠিক হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিষয়টি দলের বাইরে ফাঁস হয়ে যায়। ফলে বৈঠকটি হঠাৎ করেই বাতিল করা হয়।

তবে দলীয় নেতৃত্বের দাবি, নেতাদের ফেরার জন্য দরজা এখনও খোলা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির কর্মীদের নিয়ে গঠিত এনসিপি নানা ইস্যুতে এর আগেও অনেক নেতার বিচ্ছেদের সাক্ষী হয়েছে।