Image description
[হাসিনা পালানোর সাথে সাথে কতো কতো দিবসও যে পালিয়ে গেলো। তথাপি প্রত্যাবর্তনপ্রত্যাশীর তো আর অভাব নাই। ভোট দিলে ভাই ইয়ের ইসে, ফিরবে আপা আবার দেশে। প্রত্যাবর্তনের সবুজ বাতি আজও লাল হয় নাই। স্বর্ণমীনের স্মৃতি আমাদের। তাই এসব দিবসের প্রাসঙ্গিকতাও একেবারে হারায় নাই। আজকে ছিল মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। আর এমনই এক দিবসে আরেকজন সদ্য প্রত্যাবর্তনকারী নেতার উদ্দেশ্যে মাহমুদুর রহমান কিছু মোক্ষম তিক্ত সত্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি যা বলেছেন তার প্রাসঙ্গিকতা ও প্রেক্ষিত বুঝতে এই পুরানা খিচুড়ি কিছুটা সহায়ক হবে বলে ধারণা করি।]
০১.
“... শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা এবং জাতির পিতার পরিচিতি নিয়ে ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ সনে ঢাকায় আসেন। উল্লেখ্য তিনি ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ অবধি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্যে আলোচনা চালিয়ে গেছেন। তিনি স্বাধীনতা চাননি। তরুণেরা তারুণ্যবশে আবেগ-বশবর্তী হয়ে স্বাধীনতার দাবি ও সঙ্কল্প তাকে দিয়ে জোর করে তার মুখে উচ্চারণ করিয়েছিল তার আপত্তি ও পরিব্যক্ত অনীহা সত্ত্বেও। তার বাড়িতেও ওরাই স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল তার হাতেই। মানুষের বিশেষ করে বাঙালীর স্বভাব হচ্ছে হুজুগে। তাই তারা কাক-শিয়ালের মতো বুঝে না বুঝে শেখ মুজিবকে স্বাধীনতা সংগ্রামী বলে মেনে নিল। সেভাবেই তার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আনুগত্য নিবেদন করল।
শেখ মুজিব কিন্তু তার দলের লোকদের নিয়ন্ত্রণে ও শাসনে অনুগত রাখতে পারলেন না। তার রক্ষীবাহিনীর, তার অনুচর, সহচর, সহযোগীর লুন্ঠনে, পীড়ন-নির্যাতনে, অত্যাচারে, শাসনে-শোষণে দেশে দেখা দিল নৈরাজ্য, প্রতিষ্ঠিত হল ত্রাসের রাজত্ব। দেখা দিল দুর্ভিক্ষ, মরল লক্ষাধিক মানুষ। এ সুযোগে উচ্চাশী মুশতাক ও অন্যরা হল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। অস্থিরচিত্ত ও অনভিজ্ঞ রাজনীতিক নীতি আদর্শেও হলেন অস্থির। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতে তার মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগের একটি উচ্চাশী ক্ষুদ্রদল তাকে সপরিবার-পরিজন হত্যা করল। সম্ভবত: শেখ মণিই ভাবী শত্রু তাজউদ্দীনকে মুজিবের প্রতিদ্বন্ধী বলে মুজিবের কান-মন ভারী করে তাকে পদচ্যুত করিয়েছিল। রাজত্বটাও প্রায় পারিবারিক হয়ে উঠেছিল - সৈয়দ হোসেন, সারনিয়াবাদ, শেখ মণি, কামাল, জামাল তখন সর্বশক্তির আধার কার্যত।
আজো শেখ মুজিব ও স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধই শহুরে চাটুকারদের ও স্থূলবুদ্ধির লোকদের মুখে সগর্ব-সগৌরব উচ্চারিত। এর মধ্যে দেশ-মানুষ নেই। স্বদেশী স্বজাতি স্বধর্মী স্বভাষী স্বজনের শাসনে মানুষ স্বাধীন হয় না। মৌল মানবাধিকারে স্বপ্রতিষ্ঠ হলেই কেবল ব্যক্তি মানুষ স্বাধীন হয়। ভাত-কাপড়ে জন্মগত অধিকার পেয়ে দেহে-মনে-মগজে-মননে স্বাধীন থেকে জীবনযাপনের অধিকারই স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতা চাইতে শেখেনি আমাদের মানুষ॥”
— আহমদ শরীফ / আহমদ শরীফের ডায়েরি : ভাব-বুদ্বুদ ॥ [ জাগৃতি প্রকাশনী - ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ১৯৯-২০০ ]
০২.
“... দশ তারিখ ভোর ৮টায় শেখ মুজিব দিল্লী পৌঁছেন এবং বেলা দেড়টায় ঢাকা আসেন। বিমান-বন্দরে সুবিশাল জনসমুদ্র তাহাকে অভ্যর্থনা জানায়। তিনি ওইখান হইতে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে আসিয়া জনতার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। সেই বক্তৃতায় দৃঢ়কন্ঠে কল্পিত বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন - তাহাদিগকে নির্মূল করিবেন, নি:শেষ করিবেন - এমনি ধরণের ভীতিজনক ভাষা ব্যবহার করেন।
রাত্রে তাহাকে ফোন করি। তিনি আমাকে পরদিন ভোরে যাইতে বলেন।
সেইমতো আমি গেলে তাহার সাথে অত্যন্ত আন্তরিক আলাপ-আলোচনা হয়। শেখ মুজিব আমাকে একযোগে কাজ করিতে বলিলেন। আমি বলিলাম, আমি কোন পদ বা মর্যাদা চাই না। আমি আপনার পাশে বসিয়া থাকিব এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা দিয়া আপনাকে সাহায্য-সহায়তা করিব। অভিজ্ঞতার কোনও বিকল্প নাই।
শেখ বলিলেন : ঠিক আছে, আপনাকে গাড়ী পাঠাইয়া আনাইব ইত্যাদি।
বলিলাম: গাড়ী আমারই আছে, শুধু ফোন করিলেই উপস্থিত হইব।
.
কিন্তু মুজিব আর কোনদিন আমাকে ডাকাডাকি করিবার প্রয়োজন বোধ করেন নাই। উপযাচক হইয়া দুই-একবার পরামর্শ ও দাবী-দাওয়া পেশ করিয়াছি। কিন্তু তেমন কোন ফল হয় নাই। তিনি তাহার পথে চলিয়াছেন আর আমি আমার পথে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখ এইখানে আর করিতে চাহি না। কেননা তাহা আলাদা প্রসঙ্গ। বিপুল আশাভঙ্গ এবং সীমাহীন রক্তদান ও ত্যাগ ব্যর্থ হইয়া যাইবার সেই কাহিনী আমাদের ইতিহাসকে নতুন উপাদান যোগান দিয়াছে। অবশ্য বাংলাদেশ আছে, আছে এই দেশের স্বাধীনতা প্রিয় মানুষ। জিন্দাবাদ বাংলাদেশ। লং-লিভ ফ্রীডম॥”
— আতাউর রহমান খান (প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী) / অবরুদ্ধ নয়মাস ॥ [ নওরোজ কিতাবিস্তান - ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ । পৃ: ৮০ ]
০৩.
“... পাকিস্তানের কয়েদখানা থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা ফেরার পথে দিল্লীতে থেমেছিলেন, সেখান থেকে আমি তার বিমান সঙ্গী হবার বিরল সুযোগ পাই। পথে তার সাথে নানা ব্যাপারে কথা হচ্ছিল। প্লেনটা ঢাকার আকাশে পৌঁছে বিমান বন্দরের ওপর খানিকক্ষণ ঘুরছিল। তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অসংখ্য মানুষ দেখে শেখ সাহেব কেঁদে ফেলে বললেন, 'এত মানুষ এসেছে আমাকে দেখতে, এরা আমাকে এত ভালবাসে, কিন্তু আমি এদের খাওয়াব কি করে'? তিনি একথা কেন বলছেন প্রশ্ন করাতে তিনি উত্তর দিলেন যে, 'পাকিস্তানীরা সব খাদ্য গুদাম পুড়িয়ে দিয়েছে, দেশে তো খাবার নেই'। তাকে আবারও প্রশ্ন করলাম,' তিনি একথা কিভাবে জানলেন'। বললাম, 'আমরা তো বাজারে চাল দেখে এসেছি'। শেখ সাহেব বললেন, 'আমাকে যে ঢাকা থেকে লন্ডনে ফোন করে বললো'।
অর্থাৎ দেশের নেতা দেশে ফেরার আগেই তাকে ভয় দেখান হয়েছে যে, সদ্য স্বাধীন দেশ ও জাতি ভীষণ বিপদের মধ্যে পড়েছে, কাজেই সাহায্য চাইতে হবে বহির্বিশ্বের কাছে। বস্তুত:পক্ষে দিল্লী যাবার কয়েকদিন আগেই ঢাকায় দেখে গিয়েছিলাম সরকারীভাবে সাহায্য চাইবার এন্তেজাম হচ্ছে। এই সাহায্য চাইবার নীতি ও ধরণ নিয়ে উচ্চতম নেতৃত্বের পর্যায়ে বিভ্রান্তি শুরু হয়ে গিয়েছিল খুবই তাড়াতাড়ি। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ দেশ মুক্ত হবার পরপরই বলেছিলেন যে, যেসব দেশের সরকার আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে তাদের কারো কাছ থেকে কোনো (অর্থনৈতিক) সাহায্য নেয়া হবে না।
ওদিকে পাকিস্তান থেকে থেকে লন্ডনে পৌঁছে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বললেন যে, এখন থেকে যেসব দেশ আমাদের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ ব্যবহার করবে তাদের সবার কাছ থেকেই সাহায্য নেয়া হবে।
শেখ সাহেবের সাথে আসতে আসতে তার সাথে কথোপকথনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বিষয় উঠেছিল। প্রসঙ্গ ছিল অবিলম্বে সংবিধান প্রণয়ন করার প্রয়োজনীয়তা। এই আলাপের সময় তাকে কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা শ্রী মনি সিংহের একটা প্রস্তাব জানিয়েছিলাম।
জানুয়ারী মাসের প্রথম দিকে কবি জসিম উদ্দীন সাহেবের বাসায় ঘটনাচক্রে শ্রী মনি সিংহের সাথে দেখা হলে তিনি বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের ত্ৎকালীন যে গণ-পরিষদ তার সদস্যরা সবাই নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৭০ সনের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে এবং একজন ছাড়া তারা সবাই ছিলেন আওয়ামীলীগের সদস্য। অথচ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে বহু দল ও সব মানুষ এবং এখন সংবিধান তৈরী হবে নতুন একটা স্বাধীন দেশের জন্য। নতুন দেশের সংবিধান রচনায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে কিন্তু আওয়ামী লীগের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে এমন দলগুলোর চিন্তা ও মতামত যাতে বিবেচিত হতে পারে সেজন্য গণ-পরিষদে এই সমস্ত দল থেকে সর্বমোট আট-দশজন প্রতিনিধিকে কো-অপট করে নেওয়া যেতে পারে। শ্রী মনি সিংহ যখন তার এই ভাবনার কথা বলেছিলেন তখন তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, এটা রাজনৈতিক বা আইনগত দিক থেকে অবৈধ হবে না এজন্য যে, গণ-পরিষদ আর জাতীয় সংসদ এক নয়; গণ-পরিষদ সংবিধান রচনা করেই ভেঙ্গে যাবে এবং তখন নতুন সংসদ নির্বাচন করা হবে। তদুপরি যেহেতু এই গণ-পরিষদ যুদ্ধ করে জেতা সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের তাই এর দায়িত্ব ও কর্তব্য আলাদা।
শেখ সাহেব আমার মুখে এসব কথা শুনে বললেন যে, কথাটা ঠিক, তবে গণ-পরিষদে সদস্য কো-অপট করা রাজনৈতিক দিক দিয়ে ঠিক হবে না। কারণ তাহলে নির্বাচিত ও অনির্বাচিত ব্যক্তিরা একই সংসদে বসবেন। সেক্ষেত্রে তিনি সংবিধান প্রণয়ন উপদেষ্টা কমিটি গঠন করে তাতে অন্যান্য দলের লোকদের রাখবেন তাদের মতামত জানার জন্য এবং তিনি দেখবেন যাতে এদের সুপারিশ সংবিধানে স্থান পায়। কিন্তু এই কাজটি পরে তিনি আর করেননি।
আরো একটি কাজ করতে শেখ সাহেব অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। সেটা ছিল জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক। শেখ সাহেব রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিলেন তখন তার প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনেই 'হলিডে' সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ খান তাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক কবে হবে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে, যেহেতু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই কমিটির আহবায়ক কাজেই তিনি যখন প্রয়োজন বোধ করবেন তখনই তিনি এর বৈঠক ডাকবেন। তিনি কোনদিনই এই কমিটির বৈঠক ডাকেননি।
অর্থাৎ গোড়া থেকেই ক্ষমতা একটি দলের হাতে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধ তাতে কোন পরিবর্তন আনেনি। পরবর্তীকালেও একদলীয় সংগঠন বাকশাল গঠন করার সময় বলা হয়েছিল যে, এটা সব দল ও মতের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম কিন্তু এর যে সর্বোচ্চ পরিচালনা পরিষদ বা স্টিয়ারিং কমিটি ছিল তার সব কজনই ছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্য।
বাকশাল গঠন করে যখন চারটি ছাড়া আর সবগুলো সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হলো তখন বিবিসি'র বাংলা বিভাগের প্রযোজক সিরাজুর রহমানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, "আমার দেশে ফ্রি-স্টাইল চলবে না"। তিনি আরও বলেছিলেন যে, খবরের কাগজের সংখ্যা কমিয়ে যে নিউজপ্রিন্ট বাঁচবে তা বিদেশে বিক্রি করে সেই পয়সা দিয়ে খাদ্যশস্য কিনে তিনি দেশের গরীব মানুষদের বাঁচাবেন। ততদিনে কিন্তু ১৯৭৪ সনের দুর্ভিক্ষ (যাতে ৩০ হাজার লোক মারা যাবার কথা সরকারীভাবেই স্বীকার করা হয়েছিল) পার হয়ে এসেছে বাংলাদেশ।
অর্থাৎ একা একা দেশ চালাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ আর শেখ সাহেব তখন খাবি খাচ্ছেন এবং তাদের হাতে আর কোন যুক্তিতর্ক অবশিষ্ট নেই তাদের যথেচ্ছাচার ব্যাখ্যা করার। একটি গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে গিয়ে এবং দলের ভিতর নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা বানচাল করার জন্য একজন খুব বড় নেতাকে দেবতা বানিয়ে দশজনের মতামত জানার ও পাঁচজনের বুদ্ধি নেবার প্রয়োজন উপেক্ষা করে চলতে চলতে তখন তারা তাদের অতীত প্রতিশ্রুতির কথা তো ভুলেই গেছেন, সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনাও হারিয়ে ফেলেছেন॥”
— আতাউস সামাদ (সাংবাদিক) [ 'বাংলাদেশ : দুই দশকের রাজনীতি' শীর্ষক আলোচনা সভায় / ২৯ জানুয়ারী - ৪ঠা ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৩ ইং ]
তথ্যসূত্র : Bangladesh : Past two decades and the current decade / Qazi Khaliquzzaman Ahmad (Editor) ॥ [ Bangladesh Unnayan Parishad (BUP) - June, 1994 । P. 456-458 ]
০৪.
“... এখানে অন্য একটি ঘটনার বিষয় আমার মনে পড়ল। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী যখন শেখ মুজিব লন্ডন-দীল্লি হয়ে ঢাকার তেজগাঁও বিমান বন্দরে অবতরণ করেন তখন টারমাক থেকে তিনি যখন তাজুদ্দীন ও মোস্তাকের ঘাড়ে দু'হাত দিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন তখন (বর্তমানে মরহুম) অধ্যাপক আফতাব আহমদ (তার জীবিত অবস্থায়) দাবী করেছিলেন যে, মুজিব তাজুদ্দীনকে কিছুটা নীচুস্বরে অনেকটা তিরস্কারের সুরে বলেছিলেন, ‘তাজুদ্দীন শেষ পর্যন্ত তোমরা পাকিস্তান ভেঙ্গে দিলে?' আফতাব সাহেব মন্তব্যটি শুনে নাকি খুবই হতাশ হয়েছিলেন।
মুজিবের এই মন্তব্যটি যদি আংশিকও তার মনের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হয়, তাহলে তা আরও প্রমাণ করে যে মুজিব সেই একাত্তরের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। তবে তার নাম ভাঙ্গিয়ে কে তার অনুপস্থিতিতে কি করেছে, সে তো ভিন্ন বিষয়। এ বিষয় তো ঐতিহাসিক সত্য যে, তিনি ১৯৭২ এর জানুয়ারীতে ডি-ফ্যাকটো বাংলাদেশ পেয়েছিলেন। ডি-জুরো বাংলাদেশ নয়॥”
— মোহাম্মদ তাজাম্মুল হোসেন / বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষক প্রসঙ্গ নিয়ে শেখ হাসিনা মুজিবকে ছোট করছেন ॥ জুলাই ৪, ২০০৯
০৫.
“... ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী শেখ মুজিব দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য তেজগাঁও বিমানবন্দরে লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল, স্বত:স্ফূর্তভাবে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে অভ্যর্থনা দেওয়ার জন্য তাজউদ্দীন সরকার য্থাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিল। মন্ত্রীসভার সবাই উপস্থিত ছিলেন। উচ্চপদস্থ কর্মচারীর মধ্যে ঢাকায় উপস্থিত সব সেক্টর কমান্ডারদের এক সারিতে প্লেন অবতরণের জায়গায় দাঁড় করানো হয়েছিল।
সে অভ্যর্থনার মূহুর্তটি ছিল খুব ভাবাবেগপূর্ণ। আমরা সবাই উদগ্রীব হয়েছিলাম শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখবার জন্য, তার সাথে করমর্দনের জন্য। ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খলই ছিল। প্লেনটি থামা মাত্রই দরজা খুলে শেখ মুজিবকে সরাসরি দেখামাত্রই লক্ষাধিক লোক জয়বাংলা ধ্বনি দেয়।
ঠিক এই মূহুর্তেই অত্যন্ত আকস্মিকভাবে দুই ছাত্রনেতা সম্ভবত: খসরু ও মন্টু এবং শেখ মুজিবের দেহরক্ষী সামরিক বেশে এবং কোমরে পিস্তল বহন করে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে শেখ মুজিবকে আলিঙ্গন করে। সেদিন রাষ্ট্রীয় প্রটোকল রক্ষা করা হয় নি। দাপট ছিল ছাত্র নেতৃবৃন্দেরই। এ ঘটনা অশোভনীয়, অমর্যাদাকর ছিল। নজরুল ইসলাম সাহেবের মর্যাদাও রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষুন্ন করা হয়েছিল।
যাহোক শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ঘটনাটি বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে, প্রবাদে বলে, morning shows the day। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ও স্বল্পশিক্ষিত ছাত্রদের প্রভাব যে অটুট থাকবে তার আভাস পাওয়া গেল। শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তনের দিনের ঘটনার জের আজো বর্তমান॥”
— কর্নেল (অব:) কাজী নূর-উজ্জামান / একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা ॥ [ অবসর - ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ৯ ]
০৬.
“... নয়া দিল্লীর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ একটি সংক্ষিপ্তসারের মাধ্যমে মি. ব্যানার্জীর উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। বিমানে বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী হিসেবে ১৩ ঘন্টা যাপন কালে তাঁকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাঁকে বলা হয়েছিল 'ভারতের অভিজ্ঞতার' ভিত্তিতে নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থা (parliamentary system) গ্রহণ করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে রাজী করাতে হবে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে॥”
— India's Security Dilemmas : Pakistan & Bangladesh / Sashanka S. Banerjee)
তথ্যসূত্র : আবদুল মতিন / বিজয় দিবসের পর : বঙ্গবন্ধু ও বাঙলাদেশ ॥ [ র্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশান্স - সেপ্টেম্বর, ২০০৯ । পৃ: ৪০ ]
০৭.
“... ঢাকা বিমান বন্দরে বঙ্গবন্ধু অবতরণ করলে অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন বিমান বন্দরে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতির সম্মানে সম্বর্ধনা দেওয়ান। বাসায় পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করার পর যখন তাজউদ্দিন একান্তে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন , তখন বঙ্গবন্ধু প্রথমেই কুপিত কন্ঠে বলেন, " জানি কোন কোন সময় ..... ঢুকাতে দিতে হয়, তাই বলে এভাবে গোটা ঢুকিয়ে দিতে দেওয়া উচিত?" বঙ্গবন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রভাব বাংলাদেশের ভিতর কি ভাবে আমূল ঢুকে গেছে সেটার ইঙ্গিতেই এ উক্তি করেছিলেন॥”
— মঈনুল আলম (সাংবাদিক) / সাংবাদিকতায় ৫০ বছর ॥ [ অনুপম প্রকাশনী - ফেব্রুয়ারী, ২০১২ । পৃ: ১০৯ ]