Image description

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। বাংলাদেশের আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবারও 'না' ভোটের বিধান চালু করেছিল নির্বাচন কমিশন। তবে নির্বাচনী আইনে পরিবর্তন এনে 'না' ভোট চালু করা হলেও এবারের সংসদ নির্বাচনে সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে না।

এবার নির্বাচন কমিশন যে প্রক্রিয়ায় 'না' ভোট চালু করেছে সেটিকে বলা হচ্ছে 'হাইব্রিড নো ভোট'।

 

অর্থাৎ, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে সে সব আসনে একজন মাত্র প্রার্থী থাকবেন, শুধু সেখানেই ব্যালট পেপারে 'না ভোট' থাকবে।

আর যে সব আসনে একাধিক প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে সে সব আসনের ব্যালট পেপারে 'না' ভোট থাকবে না। যে কারণে না ভোটের এই পদ্ধতিকে হাইব্রিড না ভোট বলা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমরা মূলত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়া ঠেকাতেই এই পদ্ধতি চালু করেছি"।

বাংলাদেশে এর আগে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না ভোটের বিধান চালু হয়েছিল প্রথমবারে মতো। পরে বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সেই 'না' ভোটের বিধান নির্বাচন থেকে বাদ দিয়ে দেয়।

 

যে কারণে বিএনপি-জামায়াত জোটের অংশগ্রহণ ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেই নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ১৫৩ আসনে আওয়ামী লীগে জোটের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায়।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালে 'না' ভোটের বিধান যদি বাতিল না করতো তাহলে ২০১৪ সালের নির্বাচন 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার' ভোট হতো না।

২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কমিশন 'না' ভোট বিধান চালুর প্রস্তাব দেয় সরকারের কাছে।

তবে, এ এম এম নাসির উদ্দিনের নির্বাচন কমিশন 'না' ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনলেও সেটি সব আসনের জন্য প্রযোজ্য হচ্ছে না এবারের নির্বাচনে।

নির্বাচনে 'না ভোট' আসলো যেভাবে

২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এটিএম শামছুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় আমূল পরির্বতন আনে।

ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা চালু, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ না আরপিওতে ব্যাপক পরিবর্তন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনসহ বেশ কিছু পরিবর্তন আনে।

সে সময় আরপিওতে নতুন করে যুক্ত করা হয়- 'না' ভোটের নিধান। এর ফলে ওই বছর বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সবগুলো আসনের ব্যালটেই 'না' ভোট যুক্ত হয়।

এই বিধান চালুর কারণে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী পছন্দ না হলে একজন ভোটার ব্যালট পেপারে 'উপরের কাহাকেও নহে' লেখা একটা ঘরে সিল দিতে পারতেন।

আরপিও সংশোধন করে 'না' ভোটের বিধান চালু করে তখন যে আইন করেছিল সেই আইন অনুযায়ী- 'কোনো আসনে 'না' ভোটের সংখ্যা বাক্সে পড়া মোট ভোটের অর্ধেক বা তার বেশি হলে নতুন করে ভোট আয়োজন করতে হবে'।

তখনকার নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা ছিলেন জেসমিন টুলী। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "সেই সময় 'না' ভোট চালু করার পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। যদি কোনো আসনে 'না' ভোট জয় পেতো তাহলে নিয়ম ছিল ওই আসনে পুর্ননির্বাচনের আয়োজন করা"।

এর পেছনের দুটি কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলছিলেন, "যদি কোনো আসনে কোনো রাজনৈতিক দল যোগ্য, সৎ বা ভালো প্রার্থী না দেয় তাহলে সেখানকার ভোটাররা বিকল্প হিসেবে 'না' ভোট দিতে পারতেন। এতে রাজনৈতিক দলগুলোও চেষ্টা করতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী দেওয়ার"।

"দ্বিতীয়ত, এর পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বেশি সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি। অনেক সময় ভোটাররা পছন্দের প্রার্থী না দেখলে ভোটকেন্দ্রে যেতে চান না। সেদিক বিবেচনায় 'না' ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে তখন অনেক ভোটার 'না' ভোট দেওয়ার জন্য হলেও ভোট কেন্দ্রে যেতেন", যোগ করেন তিনি।

২০০৮ সালে নবম সংসদের ওই নির্বাচনে প্রায় সাত কোটি ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৩০০ আসনে 'না' ভোট দিয়েছিলেন তিন লাখ ৮১ হাজার ৯২৪ জন।

সবচেয়ে বেশি ৩২ হাজার 'না' ভোট পড়েছিল রাঙামাটি আসনে। তবে কোনো আসনেই মোট অর্ধেকের বেশি কিংবা কোনো প্রার্থীর চেয়ে 'না' ভোট বেশি পড়েনি। যে কারণে কোনো আসনেই পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজন হয়নি।

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "তখন 'না' ভোট চালুর মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল ভোটারের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি। যেন তিনি তার পছন্দের প্রার্থী না পেলে কাউকেই সমর্থন না করে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারতো"।

'না' ভোট বাদ ও দশম সংসদের অভিজ্ঞতা
২০০৮ সালের নবম সংসদের ওই নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট।

পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সংশোধন করা হয়। আরপিও সংশোধনের ফলে বাতিল হয়ে যায় 'না' ভোটের বিধান।

এর দুই বছরের মাথায় ২০১১ সালে আদালতের রায়ের পর জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানও বাতিল করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি-জামায়াত জোটসহ সে সময়ের নিবন্ধিত বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। একই সাথে তারা নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণাও দেয়।

এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। বিএনপি জামায়াত জোটের অংশগ্রহণ ছাড়া ওই নির্বাচনে ভোটের আাগেই ১৫৩ আসনে আওয়ামী লীগ জোটের প্রার্থীরা বিনাভাটে এমপি হয়ে যায়। ক্ষমতাও নিশ্চিত হয়ে যায়, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হয়।

নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আরপিও সংশোধন করে 'না' ভোট যদি বা না দেওয়া হতো তাহলে ২০১৪ সালের নির্বাচন এতটা বিতর্কিত হতো না। তখন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পাওয়ার সুযোগও থাকতো না"।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছিলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় গণভোটের বিধান রয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এর সুফল ভোগ করার আগেই তা বাতিল হয়ে যায়।

বিশ্লেষক আব্দুল আলীম মনে করেন, না ভোট চালু করে ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। যার ফলে একদিকে ভোটারদের যেমন অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে তেমনি নির্বাচন ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিলো।

এবার কেন 'হাইব্রিড নো ভোট'?
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এর মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন না ভোটের বিধান চালু করতে সুপারিশ করে। তখন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল, দেশের সবগুলো আসনে যতজন প্রার্থীই থাকুক এর পাশাপাশি 'না' ভোটও ব্যালট পেপারে থাকবে।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "আমরা সংস্কার কমিশন থেকে প্রস্তাব করেছিলাম 'না' ভোটকে ইউনিভার্সাল করা। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল ভোটারের অধিকারকে অক্ষুণ্ণ রাখা"।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পর নির্বাচন কমিশন গত বছর আরপিওতে বেশ কিছু সংশোধন আনে। এতে আবার যুক্ত করা হয় 'না' ভোটের বিধান।

তবে এবার এই 'না' ভোট ফিরেছে একটু অন্যরকমভাবে। অর্থাৎ যদি কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকে, তাকে বিনা ভোটে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে না। কোনো আসনে যদি একজন মাত্র প্রার্থী হন তাহলে তাকেও নির্বাচনে যেতে হবে।

সংস্কার কমিশনের আরেক সদস্য নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী বলছিলেন, "এই পদ্ধতিকে বলা হয় 'হাইব্রিড নো ভোট'। এটা ইউনিভার্সাল বা সার্বজনীন পদ্ধতি না"।

এর অবশ্য আরেকটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মি. আলীম। তিনি বলছিলেন, "এবার যে 'না' ভোট চালু হয়েছে এটি কিন্তু মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণ করে না। বিশ্বে এমন 'হাইব্রিড নো ভোট' নেই। কারণ কোনো ভোটারের একজন প্রার্থীও পছন্দ নাও হতে পারে, তখন সে কী করবে"?

গত ১১ই ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সবগুলো আসনেই মনোনয়ন দাখিল করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। মনোনয়ন যাচাই বাছাইও শেষ হয়েছে।

মনোনয়ন বাছাইয়ের পরও সারাদেশে ১৮শ'র বেশি প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। কোনো আসনেই একক প্রার্থী নেই। গড়ে প্রতি আসনে ছয়জন করে প্রার্থী রয়েছে।

এই 'হাইব্রিড নো ভোট' চালুর কারণে কোনো আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী জয়ের সম্ভাবনা নাই। ফলে এবারের ভোটে 'না' ভোট রাখতে হচ্ছে না।

নির্বাচন কমিশন কমিশন কেন 'ইউনিভার্সাল নো ভোট' চালু না করে হাইব্রিড পদ্ধতিকে বেছে নিল এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো তেমন হয়নি। ভবিষ্যতে যদি তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন আমরা ইউনিভার্সাল 'নো' ভোট চালু করতে পারি। আপতত 'হাইব্রিড নো ভোট' বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় ঠেকাতে পারবে"।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও মাত্র ছয়টি দল না মোট 'না' ভোটের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল। বাকি ৩২ দলের ভোট ছিল 'না' ভোটের চেয়ে কম।

এবারের সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোটে অংশ নিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে 'না' ভোটের বিধান থাকলে ভোটার উপস্থিতি বাড়তো বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।