এক বুক বেদনা নিয়েই দেড় যুগ পর দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ভাই হারানোর বেদনা আর মৃত্যুশয্যায় থাকা মায়ের খবর-এই দুই গভীর বেদনা কাঁধে নিয়েই দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে। ফলে দেশে ফেরার পর তিনি যেমন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন, তেমনি শোকে মুহ্যমানও হয়েছেন। দেশে ফিরেই শয্যাশায়ী মাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে তাকে।
বিষাদের গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু দেশে ফিরেও তার হারানোর শোক ফুরোয়নি। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনতে হয় তারেক রহমানকে।
কৈশোর পেরোনোর আগেই বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারান তারেক রহমান। মা বেগম খালেদা জিয়া তখন দেশ ও মানুষের জন্য রাজনীতিতে ব্যস্ত ছিলেন। সে সময় থেকেই যেন নিজের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল তাকে। যার রক্তে দেশ ও মানুষ নিয়ে ভাবনা, তিনি কীভাবে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পারেন? তাই বেগম খালেদা জিয়া যখন চারদলীয় জোট সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন রাজনীতিতে সক্রিয় হন তারেক রহমান। দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি যখন আস্থার প্রতীকে পরিণত হন, তখনই শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার।
এরপর জীবনকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে থাকেন তারেক রহমান। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী জরুরি অবস্থার সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কারাবন্দি অবস্থায় তার ওপর চলে নির্যাতন। আইনজীবীদের আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে চিকিৎসক দল তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে নির্যাতনের চিহ্নের প্রমাণ পায়। পরে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ অবস্থায় কারাগার থেকেই নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার শর্ত হিসেবে দুই ছেলের মুক্তি দাবি করেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালের ৩ মার্চ তিনি কারাগারে থাকা অবস্থায় তারেক রহমান জামিনে মুক্তি পান। পরে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া মুক্ত হয়ে ছেলেকে হাসপাতালে দেখতে যান। সেদিনই চিকিৎসার জন্য তারেক রহমানকে লন্ডনে পাঠানো হয়।
যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা শেষে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি দেশটিতে অবস্থান করেন। যার অবসান ঘটে চলতি বছরের ২৫ ডিসেম্বর। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এই সময়ে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হাসিনার শাসনামলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, গুম ও খুনের অসংখ্য ঘটনা ঘটে। তারেক রহমান নিজেও ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে একাধিক মিথ্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হন।
এই প্রতিকূলতার মধ্যেই দীর্ঘ এক যুগ বিদেশে থেকে দল পরিচালনা করেন তারেক রহমান। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়াকে একটি মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এরপর থেকে প্রায় এককভাবেই দল পরিচালনা করে আসছেন তিনি। দীর্ঘ সময়ে নেতাকর্মীদের আগলে রাখার কারণে শত নির্যাতনের মধ্যেও বিএনপির ঐক্য অটুট থাকে এবং দল দুর্বল হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর উচ্চ আদালত থেকে একে একে সাজার রায় থেকে খালাস পেতে থাকেন তারেক রহমান। তবু তার দেশে ফেরা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। একাধিকবার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণার পরও দেশে ফেরা হয়নি।
সব ষড়যন্ত্রের দেয়াল ভেঙে অবশেষে ২৫ ডিসেম্বর ট্রাভেল পাস নিয়ে স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখেন তারেক রহমান। দেশে ফিরেই তিনি পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকায় বিএনপি আয়োজিত গণসংবর্ধনায় অংশ নেন। স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জনসভায় বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশ নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। মাকে দেখতে যাওয়ার আগে তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চান।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হলেও এই ফেরা তারেক রহমানের জন্য আনন্দের পাশাপাশি গভীর কষ্টেরও। দেশ ছাড়ার সময় বিএনপির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল মায়ের হাতে, জীবিত ছিলেন ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো। দেশে ফেরার সময় ভাই আর নেই, ভাইয়ের স্ত্রী বিধবা, সন্তানরা এতিম। আর মা ছিলেন অন্তিম শয্যায়। ফলে দেশে ফেরার আনন্দের চেয়ে শোকের সাগরেই যেন বেশি ভেসেছেন তিনি। মায়ের মৃত্যুর পর সেই কষ্ট যেন চরমে পৌঁছায়।
দেশে ফেরার প্রথম তিন দিনে অসুস্থ মাকে দেখা, বাবা ও ভাইয়ের কবর জিয়ারত এবং ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করেন তিনি। শোক সামলে ঘোষিত ‘প্ল্যান’ নিয়ে কাজ শুরুর প্রস্তুতির সময়ই আসে সবচেয়ে বড় আঘাত-৩০ ডিসেম্বর মায়ের ইন্তেকাল। এতে তিনি কার্যত একা হয়ে পড়েন। দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মায়ের জানাজা নিয়ে বৈঠকের সময় তার মুখে গভীর বিষণ্নতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩১ ডিসেম্বর মায়ের দাফন সম্পন্ন হয়। দেশ-বিদেশের অতিথি ও বিপুল জনসমাগমে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা। রাষ্ট্র ঘোষিত তিন দিনের শোক শেষ হয়েছে, দলের ঘোষিত সাত দিনের শোকও শেষের পথে। প্রতিদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গুলশানে গিয়ে সমবেদনা জানাচ্ছেন। মায়ের প্রতি মানুষের এই ভালোবাসা ও সম্মান তারেক রহমানকে শোক কাটিয়ে উঠতে কিছুটা শক্তি জোগাচ্ছে।
এ কারণে পারিবারিক জীবনে একা হয়ে যাওয়া তারেক রহমান পুরো দেশবাসীকেই নিজের পরিবার হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১ জানুয়ারি তার ফেসবুক পোস্টে সেই অনুভূতির প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে তিনি লেখেন, শোকের এই মুহূর্তে আমি আমার প্রাণপ্রিয় বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে স্মরণ করছি। আজ এত মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মনে হচ্ছে, নিকটজন হারানোর শূন্যতা পেরিয়ে পুরো বাংলাদেশই আমার পরিবার হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক জীবনের মতো পারিবারিক জীবনও তারেক রহমানের জন্য সুখকর ছিল না। শৈশবেই বাবাকে হারানো, দীর্ঘ নির্বাসনে মায়ের কারাবাস ও অসুস্থতা দেখা, ভাই হারানো এবং শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরেই মাকে হারানোর বেদনা তাকে বহন করতে হয়েছে।
তবে মানুষের ভালোবাসাই তাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করছে। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে তাকে নতুন দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে। সামনে জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। জাতিকে পথ দেখাতে হবে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। যে দলের দায়িত্ব মা ৪২ বছর কাঁধে বহন করেছেন, এখন তা পুরোপুরি তার কাঁধে।
সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুত থাকার কথাও তিনি ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, আমার মা সারাজীবন নিরলসভাবে মানুষের সেবা করেছেন। আজ তার সেই দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। একাগ্রতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি: যেখানে আমার মায়ের পথচলা থেমেছে, সেখানে আমি চেষ্টা করব সেই পথযাত্রাকে এগিয়ে নিতে। সেই মানুষদের জন্য, যাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস তাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শক্তি দিয়েছে, প্রেরণা জুগিয়েছে।