Image description

বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সফরে গিয়েছিলেন। তিনি তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময় খালেদা জিয়ার হোটেল স্যুটে গিয়ে সাক্ষাৎকার নেন নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক বারবারা ক্রসেট। সেই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত একটি ‘আলাপচারিতা’ একই বছরের ১৭ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হয়। মঙ্গলবার প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রতি সম্মান জানিয়ে সেই নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ এখানে প্রকাশ করা হলো। 

বর্তমানে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় সফরের অংশ হিসেবে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন তিনি। তাঁর চারপাশে থাকা মন্ত্রী ও অন্য লোকেরা বেশ গর্ব করে বলছিলেন– খালেদা জিয়াই প্রথম মুসলিম নারী, যিনি নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই স্বীকৃতিতে কম চমৎকৃত ছিলেন না।

নিউইয়র্কের হোটেল স্যুটে এই বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কেবল ‘হুমমম’ ধ্বনি দিয়েই এর উত্তর দিতে পেরেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের নয়, এশিয়ান ইসলামী পরিবেশে জন্মগ্রহণকারী খালেদা জিয়া এ বিষয় তুলে ধরতে আরও বেশি আগ্রহী ছিলেন যে বেশির ভাগ দক্ষিণ এশিয়ার নারীর মতো বাংলাদেশি নারীরা এখনও অনেক বঞ্চনার শিকার হলেও বাংলাদেশের নারীদের জনজীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের পথে আর অস্বাভাবিক কিছু নেই।

বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান হলেও সেখানে নারীদের বিচ্ছিন্ন করে দেখার জন্য চাদর মোড়ানোর ব্যবস্থা বা পর্দাপ্রথা নেই। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ উভয়ই নারী এবং সংসদ সদস্যদের অন্তত ১০ শতাংশ নারী।

 

‘আমরা নারীদের জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের অনুমতি ও উৎসাহ দিই’– ক্রিম রঙের সিল্ক শাড়ি পরে ৪৮ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী জিয়া বলেন। ‘গ্রামে নারীরা মাঠে কাজ করেন। শহরেও নারীরা তাদের ঘরের বাইরে কাজ করেন। নারীরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন; তারা অফিস ও সরকারি দপ্তরে কাজ করেন; ডাক্তার ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।’

১৯৮১ সালে নিহত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী তিনি। তাঁর স্বামী সেনাবাহিনীর জেনারেল ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য রাজপথে ৯ বছর কঠোর সংগ্রাম করেছেন। এ সংগ্রামে বেসামরিক রাজনীতিবিদদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি একজন ধৈর্যশীল ফার্স্ট লেডির ভাবমূর্তি ত্যাগ করে বাংলাদেশিদের অবাক করে দিয়েছেন। অবশেষে এই আন্দোলন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ.এম. এরশাদকে উৎখাত করতে সক্ষম হয়। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে এ আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটে। ওই আন্দোলনের পর অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করে তিনি ১৯৯১ সালের গোড়ার দিকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তাঁর স্বামী প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে এক সুস্পষ্ট বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।

এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া অনেকটা জোর করেই বিশেষ করে মেয়েদের জন্য শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন; নারীদের স্বনির্ভর করতে তাদের জন্য ক্ষুদ্র ও জামানতবিহীন ঋণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছেন। এগুলো বিশাল কাজ, যা বেনজির ভুট্টো তাঁর দেশের নারীদের জন্য করতে পারেননি; যখন তিনি প্রথম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৮৮-১৯৯০– এ দুই বছর পাকিস্তানের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনজির মুসলিমপ্রধান কোনো দেশেরও প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। 

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি পরিবেশিত তথ্য অনুসারে, খালেদা জিয়া যখন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন গড় বাংলাদেশিরা মাত্র প্রায় দুই বছরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেত এবং স্কুলছাত্রীদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মেয়ে ছিল। বাংলাদেশের ১২ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন; এক-তৃতীয়াংশেরও কমসংখ্যক নারী পড়তে পারেন। 
খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা এখন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যের ও বাধ্যতামূলক এবং মেয়েরা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন একটি প্রকল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি, যার অধীনে যে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাবে তাদের খাদ্যশস্য দেওয়া হবে।’

‘কখনও কখনও একজন অভিভাবক আমার কাছে এমন একজন মেধাবী মেয়েকে নিয়ে আসবেন, যিনি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য খুব দরিদ্র’– বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই ছেলের মা প্রধানমন্ত্রী বলছিলেন। ‘এই ধরনের মেয়েদের জন্য আমার একটি স্বতন্ত্র তহবিল আছে।’

প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শক্তিশালী বাংলাদেশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সাহায্য থেকে উপকৃত হয়েছেন। এ সংস্থাগুলো দুর্নীতিমুক্ত বিবেচিত। সামরিক শাসক এরশাদের আমলে ব্যাপক দুর্নীতি যখন সরকারি সাহায্য প্রকল্পগুলোকে দুর্বল বা পঙ্গু করে দিচ্ছিল, তখনও এরা ওই সরকারি দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হয়েছিল।

যদিও একটি জঙ্গিবাদী ইসলামী গোষ্ঠী নারীদের প্রকাশ্যে কাজ করার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, যার পিতা একজন প্রাদেশিক পর্যায়ের ব্যবসায়ী এবং একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ছিলেন, আত্মবিশ্বাসী যে বাংলাদেশিরা এহেন মৌলবাদী বার্তা প্রত্যাখ্যান করবে। তবে তাঁর সমালোচকরা বলছেন যে তিনি ইসলামী জঙ্গিদের কোণঠাসা করার জন্য আরও কিছু করতে পারেন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ ১৯৯১ সালে তাঁর রাজনৈতিক মিত্র হয়ে ওঠে।

‘আমরা অবশ্যই ধর্মবিশ্বাসী মানুষ’– খালেদা জিয়া বলেন। ‘কিন্তু আমরা চরমপন্থি বা ধর্মান্ধ নই এবং তাই আমরা আরও উদারপন্থি হতে পেরেছি এবং আমরা এটাও মনে করি যে আমাদের নারীরা আরও স্বাধীনতা ভোগ করেন। আমাদের অনেক নারী আছেন, যারা খুব বিখ্যাত গায়িকা এবং আমাদের মহিলারা মঞ্চ, সিনেমা ও নাটকে অংশ নেন।’

এসব অনেকাংশেই বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত; ভারতীয় উপমহাদেশের এই সমৃদ্ধ ভূখণ্ড উত্তর ও পশ্চিমের কঠোর সমতলভূমি জলপথে ঘেরা এবং তালের ছায়ায় ঢাকা পান্নাসদৃশ ধানক্ষেতে বিলীন হয়ে যায়। পূর্ব ভারতের কলকাতা এবং বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা উভয়ই বাণিজ্য ও বৌদ্ধিক তৎপরতাসমৃদ্ধ জীবনের কেন্দ্র।

১৯৪৭ সালে যখন বাংলা হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় রেখায় বিভক্ত হয়েছিল, তখন যা এখন বাংলাদেশ, তা ইসলামী পাকিস্তানের একটি দূরবর্তী অংশে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে ধর্মের চেয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশিরা পাকিস্তানের পরিবর্তে অনিশ্চয়তায় ভরা এক স্বাধীনতা বেছে নিয়েছিল। দ্রুতই দেশটি হতাশাজনক অনুন্নয়নে পতিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো বলছে, এখন, এক শতকের এক-চতুর্থাংশেরও কম সময় পরে, দেশটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, কেউই বাংলাদেশকে আর ‘বাস্কেট কেস’ বা অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ দেশ বলে না। যদিও এটি এখনও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুসারে, উন্নতমানের জীনযাত্রার প্রশ্নে কিছু ক্ষেত্রে আফ্রিকা এবং কয়েকটি এশিয়ান দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। 

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যা ৩ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তা ২.৪ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে– মধ্য আমেরিকা, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের গড় জন্মহারের চেয়ে কম, যদিও উত্তর আমেরিকার হারের চেয়ে এখনও তিন গুণ। তিন-চতুর্থাংশ বাংলাদেশি এখন কোনো না কোনো ধরনের মৌলিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে, যা ভারতের তুলনায় বেশি। এবং নারী স্বাস্থ্য সমবায়গুলো বেশির ভাগ শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনতে সাহায্য করেছে।

জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা এই মুসলিম সমাজে পরিবার পরিকল্পনার এত গ্রহণযোগ্যতা দেখে হতবাক, যার মধ্যে কিছু গর্ভপাত ও বন্ধ্যাকরণ অন্তর্ভুক্ত।
খালেদা জিয়ার মতে, ‘এটা ভুল ধারণা যে ইসলাম পরিবার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। ক্যাথলিকদের ক্ষেত্রে এটি সত্য হতে পারে, কিন্তু মুসলমানদের ক্ষেত্রে নয়। ইসলামে এমন কিছু নেই, যা এই (ক্যাথলিক) রীতি মেনে নেয়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বাংলাদেশে আমরা কোনো সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করছি না। পরিবার পরিকল্পনা এখানে ব্যাপক এবং দেশের প্রতিটি কোণে গৃহীত হয়েছে। নারী ও পুরুষরা এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন এবং তারা এটি অনুশীলন করছে। এ কারণেই আমাদের জন্মহার হ্রাস পেয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল এবং তাঁর প্রয়াত স্বামী সেনাপ্রধান থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে ভ্রমণের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব সম্পর্কে এখন যা জানেন, তার অনেক কিছু শিখেছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবেও জিয়াউর রহমান অনেক দেশ সফর করেন, যেখানে খালেদা জিয়াও ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মেধাবীদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে পরিচিত করার জন্য’ তরুণ বাংলাদেশিদের সরকারি সফরে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার নীতি তাঁর সরকারের রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘে যে প্রতিনিধি দল তাঁর সঙ্গে নিউইয়র্কে এসেছে, সেই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ঢাকার স্কুলে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া এক কিশোরী ও ছেলে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নেতা হিসেবে যেসব পুরুষের সঙ্গে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে, তাদের কারও কাছ থেকে তিনি কোনো বাধা বা প্রতিকূলতা অনুভব করেননি। সামরিক পরিষেবায় তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন কাজ করায় এবং ভিন্নমতাবলম্বী অফিসারদের হাতে তাঁর স্বামীর মৃত্যু থেকে সৃষ্ট সহানুভূতির কারণে অপ্রত্যাশিত হলেও সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে উচ্চ পদে যেসব নারী অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন, তাদের মতো তিনি এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা উভয়ই পুরুষ আত্মীয়দের উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ভারতের ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তাঁর পিতা ভারত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধানমন্ত্রীর বদৌলতে। বেনজির ভুট্টো ছিলেন তাঁর পিতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর উত্তরাধিকারী। শ্রীলঙ্কার ১৯৫৯ সালে নিহত পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েকের বিধবা পত্নী ছিলেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে। তবুও খালেদা জিয়া মনে করেন, নারীরা এখন বাংলাদেশে তাদের নিজস্ব ক্ষমতায় রাজনৈতিক পরিসরে দাঁড়িয়ে আছে।

‘আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ভোটাররা পুরুষ এবং নারীর মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন না,’ তিনি বলেন। ‘প্রার্থীরা যা বলেন তার ওপর ভিত্তি করে ভোটাররা প্রার্থীদের বিচার করেন। পারিবারিক সংযোগ ছাড়াই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের আসা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আমরা সমান।’