দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিএনপির বেশ কিছুসংখ্যক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দলটির জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৯ জন নেতাকে দলের প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকিদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। সাংগঠনিক জেলা শাখার নেতারাও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলছেন। তলব করা হতে পারে কেন্দ্রেও। তবে তফসিল অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলের পদে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলে বহিষ্কারের তালিকা আরও বাড়বে। যুগান্তরকে এমনটি জানিয়েছে বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, যারা দলের মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের বাইরে যদি কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হতে চায়, দল নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, দলীয় পদধারী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওই কেন্দ্রীয় নেতারা যুগান্তরকে আরও বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয়ভাবে ব্যাপক জনপ্রিয় এবং দলের জন্য পরীক্ষিত ত্যাগী নেতা। তবে কারণ যাহোক না কেন-সেক্ষেত্রে যাদের দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে, এখন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারে তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বোঝাতে হবে। দলের বৃহত্তর স্বার্থে ভোটের মাঠে ধানের শীষের পক্ষে সবাইকে একসঙ্গে মাঠে থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
তারা আশা করছেন, স্বতন্ত্র হিসাবে দলের যেসব নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, শিগগিরই তাদের কেন্দ্রে ডাকা হতে পারে। দায়িত্বশীল নেতারা প্রথমে তাদের বোঝাবেন এবং দল ক্ষমতায় গেলে বিভিন্নভাবে মূল্যায়নের আশ্বাস দেবেন। এতেও কাজ না হলে কঠোর হবে দল। সেক্ষেত্রে বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া যারা পদে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে ভোটের মাঠে কাজ করবেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ছিল ২৯ ডিসেম্বর। তবে দেখা গেছে ৬০টিরও বেশি আসনে দলীয় পদে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন শতাধিক প্রার্থী। রিটার্নিং অফিসার এখন মনোনয়নপত্র বাছাই করছেন, যা চলবে আগামী রোববার পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের তারিখ ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তির তারিখ ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি। ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি।
এদিকে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ ৯ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। বহিষ্কৃত অন্যরা হলেন-জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, হাসান মামুন, আব্দুল খালেক, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণ দে, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নিরব, সিলেট জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ।
দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলেন, মিত্রদের যেসব আসনে ছাড় দেওয়া হয়েছে তাদের আসনকে এই মুহূর্তে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে মিত্র দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে যারা ধানের শীষে মনোনয়ন পেয়েছেন তারাও রয়েছেন। এসব আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য যেসব আসনে বিদ্রোহী রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর হবে বিএনপি।
এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে একাধিক বিএনপি নেতা যুগান্তরকে বলেন, মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি। যে কারণে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের চাপে তারা প্রার্থী হয়েছেন। দলে তাদের অনেক ত্যাগ রয়েছে। দুর্দিনে নেতাকর্মী-সমর্থকদের পাশে থেকেছেন। হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সে বিবেচনায় দল তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে না বলেও আশা করেন এসব নেতা। আবার বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জানান, দলীয় শৃঙ্খলা মেনে শেষ পর্যন্ত চোখের জলে তারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন। তবে তার আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তারা দেখা করে কিছু কথা বলতে চান। এরপর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যে নির্দেশ দেবেন, তা তারা মাথা পেতে মেনে নেবেন।