Image description

রফিকুল আলম রঞ্জু 

No photo description available.

পাবনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর নতুন আমির নির্বাচিত হয়েছেন মো. নজরুল ইসলাম। গত শননিবার (৩১ অক্টোবর) জেলার সব রুকনের সরাসরি ভোটে তিনি নির্বাচিত হন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২০২৭-২০২৮ সেশনের জন্য ৭৭টি জেলা ও মহানগর শাখার আমিরের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচিত আমিরদের যে নাম ঘোষণা করা হয় তাতে পাবনা জেলা জামায়াতের আমির হিসাবে অধ্যাপক নজরুল ইসলামের নাম উল্লেখ রয়েছে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও আদর্শিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর এ নির্বাচিত হওয়াকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষকতা, ছাত্র আন্দোলন, জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন।
মো. নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৬০ সালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের মীরকামারী গ্রামে। তাঁর পিতা মো. মোসলেম উদ্দিন এবং মাতা আজিজা খাতুন। নওগাঁ, জয়পুরহাট ও পাবনায় বিভিন্ন পেশাগত ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক ও রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন।
শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকতা :
মীরকামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। মীরকামারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে এসএসসি, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ থেকে ১৯৭৭ সালে এইচএসসি ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনের শুরু নিজ গ্রামের মীরকামারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে। এরপর পাবনার দুবলিয়ায় হাজী জসীমউদ্দীন কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৫ সালে নওগাঁর আল-ফারুক ইসলামী একাডেমির প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে জয়পুরহাটের তালিমুল ইসলাম একাডেমি অ্যান্ড কলেজে প্রথমে স্যাচিবিক বিদ্যা এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে ২০২০ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন শেষে বর্তমানে তিনি অবসর জীবনযাপন করছেন।
ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব :
ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর আদর্শিক ও রাজনৈতিক পথচলা শুরু। ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটির কর্মী হিসেবে ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে শিবিরের সদস্য পদে শপথ নিয়ে রাজশাহী মহানগরীর একটি জোনের দায়িত্বশীল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান এবং ১৯৮৫ সালে সংগঠনের রুকন হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর নওগাঁ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। পরে জয়পুরহাট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হিসেবে প্রায় ১৪ বছর এবং সর্বশেষ দুই বছর জেলা নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে ২০১০ সালে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জয়পুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২১-২২ সেশনে পাবনা জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর জামায়াতের বগুড়া অঞ্চলের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে জেলার রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে পাবনা জেলা জামায়াতের আমির নির্বাচিত হয়ে নতুন সাংগঠনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
গুম ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা :
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় ২০১৩ সালের ১২ এপ্রিল। ওই দিন রাত ১২টার দিকে নিজ বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে যান বলে তাঁর অভিযোগ। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর ১৮ জুন পাবনা সদর হাসপাতালের গেটে তাঁকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। এ সময়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২২ সালে পাবনার দারুল আমান ট্রাস্ট থেকে তৎকালীন জেলা আমির অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডল, নায়েবে আমির অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, মাওলানা জহুরুল ইসলাম খান, বায়তুল মাল সেক্রেটারি মরহুম আব্দুশ শাকুরসহ ৬-৭ জন আটক হন। প্রায় তিন মাস কারাভোগের পর তাঁরা মুক্তি পান।
১৯৮৭ ও ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট আন্দোলনেও তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল।
সমাজসেবা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড :
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়ও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। নওগাঁয় অবস্থানকালে আল-ফারুক ইসলামী ট্রাস্টের সেক্রেটারি এবং জয়পুরহাটে দারুস সুফফা ট্রাস্টের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন।
তিনি মনে করেন, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন ও মানবকল্যাণে শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের বিকল্প নেই। গণমাধ্যমের ভূমিকাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। সমাজের অসংগতি তুলে ধরা, জনমত গঠন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাঁর বিশ্বাস।
আদর্শ ও রাষ্ট্রচিন্তা
মো. নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং মানবকল্যাণমুখী সমাজ গঠন। তিনি আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আদর্শে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করেন।
তাঁর মতে, রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের নৈতিক উন্নয়ন, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি আদর্শিক প্রচেষ্টা। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণ ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান মর্যাদা, অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, আইনের শাসন, কর্মসংস্থান এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বকে তিনি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য শর্ত মনে করেন।
পারিবারিক জীবন :
১৯৮৪ সালে লালপুরের (ঈশ্বরদী বিমানবন্দর-সংলগ্ন এলাকার) আলিমুদ্দিন সরকারের পরিবারের মেয়ে সালমা সুলতানার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা ও দুই পুত্রসন্তান রয়েছে। দুই মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। বড় ছেলে প্রকৌশলী এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। ছোট ছেলে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
শিক্ষা, আদর্শ ও নেতৃত্বের নতুন অধ্যায় :
দীর্ঘ শিক্ষকতা, ছাত্র আন্দোলন, নওগাঁ ও জয়পুরহাটে জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, গুম ও কারাবরণের অভিজ্ঞতা এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে মো. নজরুল ইসলামের জীবন বহুমাত্রিক।
জীবনের দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অতিবাহিত করার পর এবার পাবনা জেলা জামায়াতের আমির হিসেবে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। জেলার রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি যে আস্থা ও দায়িত্ব পেয়েছেন, তা পালনে তাঁর পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অবসর জীবনেও আদর্শিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা এই শিক্ষক ও রাজনৈতিক সংগঠকের সামনে এখন পাবনা জেলা জামায়াতকে নেতৃত্ব দেওয়ার নতুন চ্যালেঞ্জ। পেয়েছেন, তা পালনে তাঁর পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অবসর জীবনেও আদর্শিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা এই শিক্ষক ও রাজনৈতিক সংগঠকের সামনে এখন পাবনা জেলা জামায়াতকে নেতৃত্ব দেওয়ার নতুন চ্যালেঞ্জ।