Image description

আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। ঘোষণামতো প্রস্তুতিও নিচ্ছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তৃণমূলে এরই মধ্যে বইতে শুরু করেছে ভোটের হাওয়া। তবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য নির্বাচনে যাবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বিশেষ করে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে জোটটির নেতারা বলছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা নেই তাদের। নির্বাচন কমিশনের সংস্কার না হলে কিংবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করলে তারা ভোট বর্জনের মতো পদক্ষেপও নিতে পারেন।

জোটের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরিবেশ নিয়ে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। কমিশনের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংস্কার না হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে জোট। এ লক্ষ্যে শিগগিরই নির্বাচন কমিশন সংস্কার দাবিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সেই কর্মসূচি থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগসহ কমিশনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তনের দাবি তোলা হতে পারে। জোটটির এক নেতা আগামীর সময়কে বলছিলেন, দাবি পূরণ না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্জনের ঘোষণাও আসতে পারে।

নির্বাচন কমিশন নিয়ে জামায়াত জোটের অসন্তোষ অবশ্য নতুন নয়। ইসির অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমিশনের সঙ্গে মতবিরোধ আছে জামায়াতের। গত ২৯ জুলাই সিইসির সঙ্গে বৈঠক করে দলটি ৯ দফা দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু এসব দাবির বিষয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়া এবং সর্বশেষ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন জোটটির অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

১১ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের আরেক নেতা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই কমিশনের অধীনে নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। বর্তমান কমিশনের ওপর আমাদের আস্থা নেই। নির্বাচন কমিশনের ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। স্বয়ং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে। আমরা তার পদত্যাগসহ নির্বাচন কমিশন সংস্কার দাবিতে আন্দোলনের পরিকল্পনা করছি। সংস্কার না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বিষয়টিও ঘোষণা করা হতে পারে।’

জোটের নেতাদের এই অবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে। গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পান ৯৬ হাজার ৪৫৩ ভোট। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৬। তবে ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, কেন্দ্রে যেতে বাধা, প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব এবং ব্যালটে আগাম সিল মারার অভিযোগ
তোলে জামায়াত।

নির্বাচনের আগে এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি দলটির। ২৫ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াতের প্রতিনিধিদল ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ জানায়। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা মোতায়েনের দাবিও জানানো হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগের প্রতিকার না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করে দলটি।

দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কোথাও ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে জানতে পেরেছেন, তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। নির্বাচনী এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র না থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি। কয়েকটি ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল ও স্বাক্ষর করে রাখার অভিযোগও তোলেন।

গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হলেও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তোলা হলেও তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, একটি উপনির্বাচনেই যদি অনিয়মের অভিযোগ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কীভাবে নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

 

এ বিষয়ে আগামীর সময়কে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশন অনেকটা দলীয় ভূমিকা পালন করছে। এই কমিশনের ওপর আমাদের আস্থা নেই। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন এর অন্যতম উদাহরণ। আমরা নির্বাচনের আগে কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু সেসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা নির্বাচন কমিশনের সংস্কার চাই।’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন দলীয়করণ হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলছিলেন, ‘১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সুস্পষ্ট সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হবে। সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হবে।’

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলসহ কমিশনের কাছে জামায়াতের আগে দেওয়া ৯ দফা দাবিও আবার আলোচনায় আসছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের পদধারী নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া। এসব দাবির মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিবিধান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন চায় দলটি।