Image description

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সহ-সভাপতি আবরার শাহরিয়ারের নেতৃত্বে। এরপর থেকে গণঅভ্যুত্থানের আগপর্যন্ত চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, হয়রানি ও শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ছাড়া করতে ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে অগ্রভাগে ছিলেন নিষিদ্ধ সংগঠনটির এই নেতা।

জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। ১৫ জুলাই চবির শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় হওয়া মামলার ৪ নম্বর আসামি চবি ছাত্রলীগের এই নেতা। ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও সাংবাদিক মারধরের অভিযোগে চবির ৮৪ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। সেই বহিষ্কৃতদের তালিকাতেও রয়েছে আবরার শাহরিয়ারের নাম।

চবির অর্থনীতি বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের কনকর্ড গ্রুপের নেতা আবরার শাহরিয়ার ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের।

জানা গেছে, আবরার শাহরিয়ারের দাদার বাড়ি বান্দরবান হওয়ায় তিনি সেখানকার ভোটার হলেও তার পৈতৃক নিবাস কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নে। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে আবরার শাহরিয়ার সবার বড়। স্কুল ছিলো চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠ। বর্তমানে বান্দরবান জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি পদে সক্রিয় রয়েছেন আবরার শাহরিয়ার। একই সাথে চবি ছাত্রলীগেরও সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন আবরার।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর চবি ছাত্রলীগের পলাতক নেতাকর্মীদের মধ্যে সর্বাধিক সক্রিয় থাকা এই নেতা আলোচনায় থাকতে বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিকর্তিত মন্তব্য, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হুমকি এবং বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলে অংশ নিতে দেখা গেছে। তার আইডির বায়োতে লেখা রয়েছে- “ফুলের বদলে বাড়াবো ফুল, বুলেটের বদলে বুলেট নির্ভুল”।

ফেসবুকে নিয়মিত হুমকি দেন বিভিন্ন পক্ষকে

১ নভেম্বর এক ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদলকে উদ্দেশ্য করে আবরার শাহরিয়ার লিখেছেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল যদি মনে করে তারা ছাত্রশিবিরের ধারায় রাজনীতি করবে, তবে তাদেরকেও শিবিরের মতোই ট্রিটমেন্ট দেওয়া হবে। বেশি বাড়া বাড়া ভালো না। ইশারা দিলে ব্যানার ধরার লোকও কিন্তু পাওয়া যাবে না।” সংবাদ দেখুন এখানে।

একইদিন ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হুমকি দিয়ে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সমাজসেবা সম্পাদক অর্ক সাহার উপর হামলাকারী ছাত্রদল সন্ত্রা/সীদের পরিচয়। ৫ আগস্টের এই শিক্ষাটা গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মানেই আওয়ামী লীগ ভাবার দিন শেষ। সকল কুকুরের সাথে মুগুরের ভাষাতেই কথা বলতে হবে।”

পোস্টে তিনি ঢাবির ৭ জন শিক্ষার্থীর নাম পরিচয় উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে- অর্জুন শীল, নিত্যানন্দ পাল, ঋষিকেশ কুন্ডু, প্রান্ত পাল, প্রতীক কুমার নন্দী অন্তু, প্রসেনজিৎ বিশ্বাস এবং ধ্রুব রায়।

গত ৩০ অক্টোবর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক দেওয়ান শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্সকে আটকের ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, “এসআই জাকারিয়া ও এসআই ফরিদ। নির্যা*তনকারীদের তথ্য ওয়েবসাইটে লিপিবদ্ধ হচ্ছে।”

২৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া এক পোস্টে আবরার লিখেছেন, “চার ঘন্টার মধ্যেই শিবির নেতাদের কুৎসিত ওয়েলকামের বিপরীতে হোলসাম উপঢৌকন পাঠালাম। যে বাইকে শোডাউন দাও সে বাইকের চাবি আমাদের হাতে, যে হলে থাকো সে হলে যেকোন সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে আমাদেরই ইশারাতে! চবি ছাত্রলীগ, ওকে?”

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজকে ম্যানশন করে দেওয়া এক পোস্টে এই ছাত্রলীগ নেতা লিখেছেন, “আবরার ফাহাদ করতো শিবির, তারে মারছে গুপ্ত শিবির, খুনীদের আইনজীবী হইছে শিবির, আবার সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগার ভেঙে রেস্কিউও করছে শিবির। সেই একই মেটিকুলাস ডিজাইন। অথচ এই শূয়রের বাচ্চা এখনো পড়ে আছে ধানমন্ডি বত্রিশ নিয়ে। শোন মাছ রাজাকারের ভাই গাছবলদ রাজাকার— আওয়ামী প্রেতাত্মারা সুযোগ পেলে শুধু কাহিনি করবে না, রাজাকার আল লাল বদরের ঘাড়ের রক্তও খাবে।”

কেএনএফ কানেকশন

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার নয়টি উপজেলার (বম, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং) ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য পৃথক স্বাধীন বা স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র বা অঞ্চল গঠন করতে চাওয়া সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে এই ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত একটি সংবাদে উঠে আসে বিষয়টি। সেই সংবাদে উল্লেখ করা হয়, “হাসিনা পালানোর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বান্দরবানে আশ্রয় নেন এই ছাত্রলীগ নেতা। পরবর্তীতে পার্বত্য অঞ্চলের স্বাধীনতা চেয়ে ফেসবুকে দেওয়া তার একটি স্ট্যাটাস ঘিরে ব্যাপক আলোচনা হয়। সমালোচনার মুখে নিজের ফেসবুক আইডি ‘Abrar shariar’ ডিঅ্যাক্টিভ করে দেন। এরপর থেকে নতুন আইডি ‘আবরার শাহরিয়ার’ থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠেন আবরার।”

আমার দেশের সেই সংবাদে আরও উল্লেখ করা হয়, “গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তার সঙ্গে রয়েছে কেএনএফ কানেকশন। তাকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে গহিন এলাকায় থাকায় তাকে ধরতে বেগ পেতে হচ্ছে। সেখান থেকে প্রতিদিন ফেসবুকে গুজব ছড়াচ্ছেন তিনি।”

চবিতে গোপনে কার্যক্রম

গত ২৮ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের বিভিন্ন মিছিল ও কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে চবির রসায়ন বিভাগের ২০২৪–২৫ সেশনের শিক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম অপুকে আটক করা হয়। হাসিবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মুঠোফোন থেকে কল দেওয়া হলে আবরার শাহরিয়ার ভিডিও কলে আসেন। যা হাসিবুলের সাথে এই ছাত্রলীগ নেতার যোগাযোগের প্রমাণকে স্পষ্ট করে।

একইদিন চবির এফ রহমান হল থেকে আটক হন মুনতাছির মারজু নামের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের এক শিক্ষার্থী। তাকে ক্যাম্পাসে সাংবাদিকতা করার জন্য ছাত্রলীগ থেকে ‘নিযুক্ত’ করার প্রমাণ পাওয়া যায়।

ছাত্রলীগ নেতা আবরার শাহরিয়ার হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভয়েস ম্যাসেজে মুনতাছির মারজুকে বলেন, ‘মেহেদী (মেহেদী হাসান ইমন, সমকাল পত্রিকার চবি প্রতিনিধি) একটা ছোট ভাই আছে, সাংবাদিক। তুমি চিনলেও চিনতে পারো। ওর নাম্বার দিচ্ছি। ওর সাথে দেখা কইরো। আর ওর সাথে আগের পরিচয় আছে কিনা, পরিচয় না থাকলেও কোনো প্রবলেম নাই। আমার রেফারেন্সটা দিবা। ওর সাথে দেখা করে কথা বইলো, আড্ডা-টাড্ডা দিও সাংবাদিকতার বিষয়টা নিয়ে।’

গত ৯ আগস্ট ফেসুবকে দেওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আবরার শাহরিয়ার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি সড়কে ভোর সকালে ফাঁকা রাস্তায় কয়েকজন কর্মীকে নিয়ে মিছিল করছেন। মিছিলে অংশ নেওয়া প্রায় সবাই ছিলেন মাস্ক পরিহিত। তবে মিছিলটির ভিডিও কত তারিখে ধারণ করা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এছাড়া গত ৭ জুন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পেজ থেকে “চবির শাটল ট্রেনে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মিছিল” দাবিতে প্রচার করা একটি ভিডিওতে আবরার শাহরিয়ারকে দেখা যায়। তবে চলন্ত ট্রেনটি চবির শাটল ট্রেন কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।