ঢাকা উত্তর বিএনপির নতুন কমিটিতে কারা আসছেন, তা নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। শীর্ষস্থানীয় দুই পদ— আহ্বায়ক এবং সদস্যসচিব পদে আলোচনায় মহানগরের সাবেক ও বর্তমান নেতারা। চাউর রয়েছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত এবং সরকারি দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের নাম। এর বাইরে হাইকমান্ডের ‘গুড লিস্টে’ আছেন কেন্দ্রীয় ও সহযোগী সংগঠনের সাবেক কয়েক নেতা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ে যোগাযোগ এবং নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াননি এমন নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর ছয় সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর ২৬ নভেম্বর তা ৫১ সদস্যে সম্প্রসারণ হয়। ২২ মাস পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর এই কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
আহ্বায়ক পদে একাধিক হিসাব
আহ্বায়ক পদে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক এই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের কাছে পরাজিত হন। বিএনপি সরকার গঠনের পর তাঁকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়।
বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্রের দাবি, দুই সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসকদের আগামী মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে তাঁর আলোচনা থাকলেও মিল্টনের পরবর্তী ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
একই পদে আলোচনায় রয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর। তেজগাঁও কলেজের সাবেক ভিপি জাহাঙ্গীর মহানগর উত্তর ছাত্রদল ও যুবদলের সভাপতি ছিলেন। সর্বশেষ মহানগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।
এস এম জাহাঙ্গীর স্ট্রিমকে বলেন, ‘দলের প্রতি সৎ, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ এবং লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকা নেতাদের নেতৃত্বে আনা উচিত। গত ১৭ বছর জেল-জুলুম ও নির্যাতন সত্ত্বেও যারা দলের সঙ্গে ছিলেন, তাদের মূল্যায়ন প্রয়োজন।’
মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরবের নামও রয়েছে আলোচনায়। নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। ওই নির্বাচনে পরাজিত হন নীরব। তবে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ভূমিকার কারণে তাঁকে নেতৃত্বে ফেরানোর পক্ষে রয়েছেন দলের কিছু নেতাকর্মী।
সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুনও আহ্বায়ক পদে আলোচনায় রয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রনেতা এফ রহমান হলের ভিপি ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান মামুন হাসান এবং বিলুপ্ত কমিটির নেতা আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের নামও শোনা যাচ্ছে।
সরকারি দায়িত্বে থাকা মামুন হাসান মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে আসার বিষয়ে বলেন, ‘আমি মহানগরের রাজনীতি করে যেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব দেবেন, তা পালন করব।’ একই সঙ্গে দলের দুঃসময়ে কাজ করা নেতাদের মূল্যায়নের প্রত্যাশা করেন তিনি।
অন্যদিকে বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক ও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হককেও নতুন কমিটির শীর্ষ পদে দেখতে চান নেতাকর্মীদের একটি অংশ। আমিনুল হককে নেতৃত্বে রাখার দাবিতে গত ৫ আগস্ট গুলশানে মিছিল করেন বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা।
সদস্যসচিব পদে তরুণরাও আলোচনায়
সদস্যসচিব পদে আলোচনায় রয়েছেন বিলুপ্ত কমিটির সদস্যসচিব মোস্তফা জামান ও যুগ্ম আহ্বায়ক আফাজ উদ্দিন। এ ছাড়া মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী ইউসুফ, সাবেক দপ্তর সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এবং আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ারের নামও উঠে এসেছে আলোচনায়।
এ পদে তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে রয়েছেন মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েল। তিনি স্ট্রিমকে জানান, দল তাঁকে যোগ্য মনে করে দায়িত্ব দিলে তা পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
এর বাইরে দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিক সাজুর নামও আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় তিনি বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
বদলাচ্ছে সাংগঠনিক চাহিদা
দীর্ঘদিন বিরোধী দল থেকে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসার পর বিএনপির সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জও বদলেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘আগে হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল প্রধান লক্ষ্য। এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলার পাশাপাশি জনগণের সমর্থন ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জুলাই পরবর্তী পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিজেদের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এনে জনআস্থার প্রয়োজন। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমেও শক্ত অবস্থান দরকার।’
তবে কবে নতুন কমিটি আসছে এবং কারা নেতৃত্বে আসবেন এ ব্যাপারে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির কেউ মন্তব্য করেননি।