Image description

জাসদের জন্মের পেছনে ছিল স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ নিয়ে গভীর অসন্তোষ। তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রনেতাদের আকৃষ্ট করা দলটির লক্ষ্য ছিল ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’। কিন্তু পাঁচ দশকে বিপ্লবী রাজনীতি, সশস্ত্র কৌশল, ধারাবাহিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে দলটি নানা ধারায় বিভক্ত হয়। এমনকি আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বিরোধিতার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া জাসদ হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গী হয়ে ওঠে

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ভেতরের মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক কর্মীদের আকৃষ্ট করা দলটির লক্ষ্য ছিল ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু পাঁচ দশকের বেশি সময়ের পথচলায় জাসদের রাজনৈতিক চরিত্রে নানা রূপান্তর দেখা গেছে। বিপ্লবী রাজনীতি, সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, সশস্ত্র রাজনৈতিক কৌশল, ধারাবাহিক দল ভাঙন, সংসদীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন এবং জোটনির্ভরতার মধ্য দিয়ে দলটি একাধিক ধারা ও সংগঠনে বিভক্ত হয়েছে।

একই রাজনৈতিক ধারায় গড়ে ওঠা নেতাদের কেউ সংসদীয় ও জোটের রাজনীতিতে গেছেন, কেউ আলাদা বাম রাজনৈতিক পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন, আবার কোনো কোনো নেতা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বা বিএনপির মতো বড় দলে যুক্ত হয়েছেন। এমনকি আওয়ামী বিরোধিতার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া জাসদ হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। ১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে দলটি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার অংশীদার ছিল এবং হাসানুল হক ইনু সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন।

জাসদের জন্মের পেছনে ছিল স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ নিয়ে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) একটি অংশের গভীর অসন্তোষ। স্বাধীনতার পর পরই তৎকালীন ছাত্রলীগের ভেতরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য তীব্র হয়ে ওঠে। একদিকে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনির অনুসারীরা, অন্যদিকে সিরাজুল আলম খানকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি পৃথক ধারা। ১৯৭২ সালের ডাকসু নির্বাচন এবং একই বছরের জুলাইয়ে ছাত্রলীগের পৃথক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এ বিভাজন স্পষ্ট রূপ নেয়। কয়েক মাস পর, ৩১ অক্টোবর মেজর এমএ জলিল ও আ স ম আবদুর রবকে সামনে রেখে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ।

সিরাজুল আলম খান ছিলেন জাসদের নতুন রাজনৈতিক ধারার অন্যতম প্রধান চিন্তক ও সংগঠক। প্রকাশ্য নেতৃত্বে এমএ জলিল, আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজসহ অন্যরা সামনে থাকলেও দলের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সাংগঠনিক চিন্তায় তার প্রভাব ছিল গভীর। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিরোধিতা করে জাসদ দ্রুত রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।

তবে জাসদ খুব দ্রুতই সংসদীয় বিরোধিতার গণ্ডি পেরিয়ে যায়। সশস্ত্র বিপ্লবের ধারণা দলটির রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে। গড়ে তোলা হয় গণবাহিনী; পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও বিপ্লবী সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা চলে। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গুলিতে জাসদের কয়েকজন কর্মী নিহত হন এবং শীর্ষ নেতাদের অনেকে আটক হন। এর পরের বছর একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা চালুর পর অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো জাসদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতার পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে জাসদের মতো একটি দলের জন্ম অনিবার্য ছিল বলে মনে করেন লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ওই সময়ে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার জন্য একটি সক্রিয় বিরোধী দলের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য, সাংবিধানিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বিরোধী রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশকে চরম ব্যাহত করে। রাজপথের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পথ রুদ্ধ হয়ে আসায় তারা অস্ত্র হাতে নেয়, গণবাহিনী তৈরি করে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের পতন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর সরাসরি রাজনৈতিক আবির্ভাবে জাসদের পুরো কাঠামোটিই রাতারাতি রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।’

১৯৭৫-পরবর্তী সাড়ে চার দশকে জাসদের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর এবং নতুন করে গণভিত্তি তৈরি করার একাধিক ঐতিহাসিক সুযোগ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল মন্তব্য করে মহিউদ্দিন আহমদ আরো বলেন, ‘মূল নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও সুদূরপ্রসারী রাজনীতির অভাবে দলটি সে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। জেল থেকে ফিরে আসার পর সিরাজুল আলম খান মূলধারার রাজনীতি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি আর জাসদকে ধারণ করতেন না। এরপর কিছুদিন কাজী আরেফ আহমেদ দলকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে হাসানুল হক ইনুরা জাসদের ক্রমান্বয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুবিধাবাদী রাজনীতির সঙ্গে আপস করেন। এর জেরে দলটি তার স্বকীয় অস্তিত্ব হারিয়ে ক্ষমতানির্ভর একটি প্রভাবহীন রাজনৈতিক নামে পরিণত হয়। বারবার বিভাজনের ফলে দলটি ঐতিহাসিকভাবে নিঃশেষিত মুসলিম লীগের মতো খণ্ড-বিখণ্ড রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় এবং সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি তার প্রাসঙ্গিকতা পুরোপুরি হারিয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবমুক্ত নথিগুলোতে স্বাধীনতার পর পরই জাসদকে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের শেষদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি মূল্যায়নে নতুন গঠিত জাসদকে আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রাখা হয়। সেখানে এমএ জলিল ও আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, জাসদ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং ভারতের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনছিল। এর কয়েক মাস পর, ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২ মার্চ সিআইএর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জাসদকে ছাত্রভিত্তিক শক্তিশালী বাম বিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেখানে বলা হয়, আ স ম আবদুর রব ছাত্রলীগের একটি বামপন্থী অংশের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ তার সঙ্গে যাবে—এমন তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ছিল। দলটি আওয়ামী লীগের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলেও মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে তুলে ধরা হয়।

নির্বাচনের পর সিআইএর একটি ফ্যাক্টবুকে ১৯৭৩ সালের ভোটের হিসাবেও জাসদকে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের ভোট ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ, ন্যাপ (মোজাফফর) ৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং জাসদের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ দেখানো হয়। সংসদে মাত্র একটি আসন পেলেও মার্কিন মূল্যায়নে জাসদের ভোটভিত্তিকে একেবারে প্রান্তিক হিসেবে দেখা হয়নি। এমনকি ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের ঠিক আগ পর্যন্তও মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে জাসদকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। এর বাইরে ১৯৭৬ সলে সিআইএর ফ্যাক্টবুকে রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত ও নিষিদ্ধ থাকার প্রেক্ষাপটেও জাসদকে ‘পলিটিক্যাল প্রেসার গ্রুপ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। আশির দশকেও সিআইয়ের বাংলাদেশবিষয়ক মূল্যায়নে জাসদকে বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক কাঠামোর একটি অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল।

মূলত আশির দশকের শুরুতে জাসদের ভেতরের মতপার্থক্য ক্রমে সাংগঠনিক বিভাজনে রূপ নেয়। ১৯৮০ সালে দলের একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ গঠন করে। এর মধ্য দিয়ে জাসদের বড় ধরনের বিভাজনের শুরু। পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকটি প্রশ্নে দলটি ভাঙনের মুখে পড়ে। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এমএ জলিল জাসদ ছেড়ে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন করেন। একই সময়ে এরশাদ সরকারের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্যের পর আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে পৃথক জাসদ গড়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নেও নতুন বিভক্তি তৈরি হয়, শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বে আলাদা ধারা সৃষ্টি হয়।

১৯৮৮ সালে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বর্জন করলেও আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন অংশ নির্বাচনে যায় এবং রব সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হন। পরে তিনি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে মন্ত্রীও হন। অন্যদিকে শাজাহান সিরাজের রাজনৈতিক ধারার একটি অংশ পরে বিএনপিতে যুক্ত হয়। নব্বইয়ের দশকে বিভক্ত জাসদকে আবার একত্র করার উদ্যোগও ছিল। ১৯৯৭ সালে আ স ম আবদুর রব ও হাসানুল হক ইনুসহ কয়েকটি ধারা এক হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই ঐক্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০০১ সালের পর রব ও ইনুর নেতৃত্বে আবার পৃথক রাজনৈতিক ধারা তৈরি হয়।

২০০৪ সালে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ আওয়ামী লীগসহ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) অন্যান্য দলের সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটে যুক্ত হয়। যে আওয়ামী লীগের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে জাসদের জন্ম হয়েছিল, কয়েক দশক পর সেই দলের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটেই জাসদের একটি প্রধান অংশ জায়গা করে নেয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে জাসদ সংসদে প্রতিনিধিত্ব পায়। হাসানুল হক ইনু পরে শেখ হাসিনার সরকারে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বহুল বিতর্কিত নির্বাচনেও জাসদ জোটের অংশ হিসেবে সংসদে যায়। ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে বিরোধের পর ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ আবার ভেঙে যায়। শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধানের নেতৃত্বে বিদ্রোহী অংশ পৃথক হয়ে পরে বাংলাদেশ জাসদ নামে রাজনীতি শুরু করে। এ অংশ পরবর্তী সময়ে ১৪ দলীয় জোটও ছেড়ে দেয়।

জাসদের বারবার ভাঙন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুসতাক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাসদের বড় বিভাজনের প্রথমটি ঘটে ৭ নভেম্বরের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর। এর ধারাবাহিকতায় বাসদ গঠিত হয়। পরবর্তী বড় বিভাজনের ক্ষেত্রে এরশাদ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা এরশাদকে একটি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সরকার হিসেবে দেখেছিলাম। তার সরকারের মধ্যে কোনো ইতিবাচক দিক খোঁজার চেষ্টা আমরা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবাদী অবস্থান বলে মনে করেছিলাম। সে সময় আমরা যদি আ স ম আবদুর রবের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে নিজেদের আলাদা না করতাম, তাহলে জাসদের নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্বই সংকটে পড়ত। পরবর্তী সময়ে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে আমরা যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিলাম, তখনো রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা ছিল। বিশেষ করে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনীতির বিরুদ্ধে আমরা যদি অবস্থান না নিতাম, তাহলে জাসদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় আরো সংকুচিত হয়ে যেত।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন জাসদকে আবার নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। যে দল একসময় আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) তীব্র বিরোধিতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল, তারই একটি অংশ হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শরিক হয়ে ওঠে। হাসানুল হক ইনুকে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনটি অভিযোগে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়; সাজাগুলো একসঙ্গে চলবে বলে কার্যকর দণ্ড দাঁড়ায় ১০ বছর।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট প্রসঙ্গে জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহিল কাইয়ূম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৪ সাল থেকে আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের অংশ ছিলাম। এর ভিত্তিতেই সরকারে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমাদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। দলগতভাবে আমরা চেষ্টা করেছি সংসদ, সরকার এবং রাজপথে জনগণের ন্যায়সংগত দাবি ও অধিকারের কথা সমানভাবে তুলে ধরতে। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়ও আমাদের অবস্থান ছিল কোটার যৌক্তিকীকরণ ও সংস্কার। ফলে কোটা সংস্কারের দাবির প্রতি আমাদের সমর্থন ছিল।’ জাসদ ছাত্র আন্দোলন দমনে বল প্রয়োগের বিরোধিতা করেছিল দাবি করে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের অবস্থান ছিল বল প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন না করে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।’

গত ৫৪ বছরে বারবার জাসদের ভাঙন প্রসঙ্গে দলটির দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দল ভাঙনের ইতিহাসকে শুধু জাসদের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। পৃথিবীর যেসব কমিউনিস্ট দল বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের ইতিহাসেও বিভাজন ও মতপার্থক্য রয়েছে। লেনিনের দল, মাও সে তুংয়ের দল, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসেও নানা ধরনের বিভাজন ও পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন দলে নানা সময়ই ভাঙন হয়েছে। ফলে জাসদের রাজনৈতিক বিবর্তন, বিভাজন কিংবা পরিবর্তনকে শুধু দলীয় সংকট হিসেবে দেখলে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।’

১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৬ সালে কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। বর্তমানে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মান্না বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাসদ গঠনের পর পরই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, ত্রাণ চুরি ও খাদ্য সংকটের অভিযোগে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল দলটি। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর জাসদের রাজনৈতিক কৌশলেও পরিবর্তন আসে। গণ-আন্দোলনের বদলে আন্দোলনকে বিপ্লবী ও সশস্ত্র পথে নেয়ার প্রবণতা জোরালো হয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন কৌশল কার্যকর হওয়ার সুযোগ ছিল না। এটা ছিল জাসদের রাজনৈতিক হঠকারিতার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘একসময় আওয়ামী লীগের তীব্র বিরোধিতা করা জাসদ পরবর্তী সময়ে সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জোট করেছে। বিএনপির ক্ষেত্রেও দলটির অবস্থানে একই ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে।’ তার মতে, চূড়ান্ত বিরোধিতা ও পরে একই রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সখ্য—এই দুই মেরুর মধ্যে ঘুরপাক খেতে গিয়ে জাসদ একটি সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান দাঁড় করাতে পারেনি। হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদের আপাতত রাজনৈতিক সম্ভাবনা দেখছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত থাকার কারণে দলটির ভবিষ্যতেও সেই সম্পর্কের প্রভাব পড়বে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিণতি ইনু নেতৃত্বাধীন জাসদের ওপরও প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাসদ ও জেএসডি পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে; তারা তা কতটা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।’