Image description

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, পূর্বনির্ধারিত ব্যস্ততার কারণে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারিনি। এ জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

 

এই বইটির সঙ্গে আমার একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। পুরো পাণ্ডুলিপিটি সম্পাদনা করার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমার প্রধান কাজ ছিল এর অনেকটা বর্ণনাধর্মী ও ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার আদলে লেখা অংশগুলোকে আরও একাডেমিক, বিশ্লেষণধর্মী ও সুসংবদ্ধ রূপ দিতে সহায়তা করা। লেখকের কিছু বক্তব্য, ব্যাখ্যা ও অবস্থানের সঙ্গে আমার দ্বিমত ছিল; এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন সম্পাদক হিসেবে আমি সচেতনভাবে তাঁর মূল যুক্তি ও সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করিনি। তাঁর একাডেমিক স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করেছি। বইটিতে আমার লেখা একটি ভূমিকা (Preface)-ও রয়েছে।

 

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে থাকতে না পারলেও পরে দেখলাম, সেখানে বেশ সমৃদ্ধ একটি বক্তা ও আলোচক প্যানেল ছিল। তবে একটি বিষয় আমাকে কিছুটা বিস্মিত করেছে: জামায়াতের কোনো প্রতিনিধিকে সেখানে দেখিনি। বইটির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যেহেতু জামায়াতকে নিয়ে (কখনো সমালোচনামূলকভাবে, কখনো গঠনমূলকভাবে) তাই জামায়াতের একজন প্রতিনিধি আলোচনায় থাকলে বিতর্কটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ, প্রাণবন্ত ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারত।

 

বইটি নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কিছু প্রতিবেদনও আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো বইটির কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় (বিশেষত ১৯৭১-সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গ, এবং জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া নিয়ে তালবাহানা) বেছে নিয়ে এমনভাবে সামনে এনেছে, যাতে জামায়াত-সমালোচনাই প্রধান বার্তা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। অথচ বইটির পরিসর এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এতে জামায়াতের রাজনীতি, সংগঠন, চিন্তা, ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ রয়েছে। লেখক যে সংস্কারগুলোর কথা বলেছেন, তার কয়েকটি ইতোমধ্যেই জামায়াতের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব বিষয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম জায়গা পেয়েছে।

 

আমার পাঠে, এই বইটি জামায়াতকে কেবল সমালোচনা বা হেয় করার জন্য লেখা হয়নি। বরং এটি দলটির সঙ্গে একধরনের critical but constructive engagement—সমালোচনামূলক কিন্তু গঠনমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ। লেখক কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন, কিছু বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন, আবার একই সঙ্গে জামায়াত কীভাবে পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিজেকে আরও সংস্কার, অভিযোজন ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে নিতে পারে, সে বিষয়েও ভাবনার খোরাক দিয়েছেন।

 

একটি বইকে তার সবচেয়ে বিতর্কিত দুই-চারটি বক্তব্য দিয়ে বিচার করলে বইটির সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পটি হারিয়ে যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে selective reading বা বাছাই করা পাঠ খুব সহজেই মূল বক্তব্যকে আড়াল করে দিতে পারে।

 

তাই আমার মনে হয়, জামায়াতেরও এই বইটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত; প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের মানসিকতা নিয়ে। লেখকের সব বক্তব্য মেনে নিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তাঁর সঙ্গে দ্বিমত থাকলে সেই দ্বিমত তথ্য, যুক্তি ও পাল্টা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকাশ করা যেতে পারে।

 

একটি রাজনৈতিক সংগঠনের পরিপক্বতার পরিচয় শুধু প্রশংসা গ্রহণে নয়; বরং সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে তা নিয়ে যুক্তিনিষ্ঠ সংলাপ করার সক্ষমতার মধ্যেও নিহিত।

 

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইটি সেই সংলাপের একটি উপলক্ষ হতে পারে। সংবাদমাধ্যমের নির্বাচিত শিরোনাম নয়, বইটি পড়েই বইটির বিচার হোক। আর মতপার্থক্য থাকলে তা থেকেই শুরু হোক একটি গভীর, শালীন ও ফলপ্রসূ বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা।

 

- মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম