Image description

বিদেশের মাটিতে জুলাই বিপ্লবের পক্ষের লোকজনের ওপর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম থেকে শুরু করে সবশেষ অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছে। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে, বিশেষ করে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মামলা না হওয়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে হামলাকারী দুর্বৃত্তরা।

বিদেশের মাটিতে জুলাইযোদ্ধাদের ওপর এসব হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ। অনেকেই অভিযোগ করে বলছেন, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সরকার বিশেষ করে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোর পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরো জানান, অনেক ক্ষেত্রে সংঘটিত বিভিন্ন হেনস্তার ঘটনায় মামলা করারও সুযোগ থাকে না। গালিগালাজ করা, পানি ছিটানো, ডিম নিক্ষেপের মতো ঘটনায় মামলা দায়ের করা যায় না। তবে শারীরিকভাবে আক্রমণের ঘটনায় মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে এবং সেটি দণ্ডনীয় অপরাধ। যেমন অভিনেত্রী বাঁধনের ক্ষেত্রে হয়েছে।

এখন পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে জুলাইযোদ্ধাদের ওপর যেসব হামলা-আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কি নাÑজানতে চাইলে মন্ত্রণলায়ের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর বাইরে আমাদের আসলে তেমন কিছু করার নেই।

অভিনেত্রী বাঁধনের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, গত ৭ সেপ্টেম্বর ইতালির মেস্ত্রে এলাকার একটি পার্কে বাঁধনের ওপর আওয়ামী লীগের লোকজনের হামলার ঘটনা ঘটে। তাকে ঘিরে ধরে গায়ে পানি ও কোমল পানীয় ঢেলে দেওয়া এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা এই অভিনেত্রীকে জোরপূর্বক ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করে আওয়ামী দুর্বৃত্তরা। পরে স্থানীয় পুলিশ এসে বাঁধনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।

খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। পরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় এবং দেশটির পুলিশের উপস্থিতিতে থানায় আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী বাঁধন। তার এই মামলা পরিচালনায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, মামলার বিষয়টি ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে।

গত জুলাই মাসে এই ইতালিতেই আরেকটি জঘন্য হামলার ঘটনা ঘটে। জুলাই বিপ্লবে বিশেষ ভূমিকা পালনকারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বনি আমিনের ওপর গত ২১ জুলাই দেশটির রোম শহরে আক্রমণ হয়। আওয়ামী দুর্বৃত্তরা তাকে বেদম প্রহার করে। তবে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বনি আমিনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের না হওয়ায় পার পেয়ে গেছে তারা।

গত ১৫ জুন লন্ডনে হেনস্তার শিকার হন জুলাই বিপ্লবের সামনের সারির সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক। লন্ডনে হাসনাতের ওপর আওয়ামী দুর্বৃত্তরা ডিম নিক্ষেপসহ নানাভাবে হেনস্তা করে। ওই ঘটনায় হাসনাত আবদুল্লাহর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলা না করা হলেও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে লন্ডন পুলিশ তিন আওয়ামী দুর্বৃত্তকে আটক করে। অবশ্য পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী দুর্বৃত্তদের সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। ওই দিন নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং এনসিপি নেতা বর্তমান সংসদ সদস্য আখতার হোসেন ও জুলাইযোদ্ধা ডা. তাসনিম জারা। তাদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করাসহ নানাভাবে হেনস্তা করা হয়।

ওই ঘটনায়ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মামলা হয়নি। তবে আখতার হোসেন বিমানবন্দরের পোর্ট অথরিটি বিভাগে একটি মামলা দায়ের করেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে যুবলীগকর্মী মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আটক করে নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মামলা না করলেও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এই হামলা প্রমাণ করেছেÑআওয়ামী লীগ তার অতীতের অপকর্মের জন্য কোনো অনুশোচনা করে না।

 

২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে একটি বার্ষিকী সমাবেশ শেষে বের হওয়ার সময় আওয়ামী দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তার ওপর হামলার পাশাপাশি কনস্যুলেট ভবনের একটি কাচের দরজা ভাঙচুর করে আওয়ামী সন্ত্রসীরা। ওই ঘটনায় মাহফুজ আলমের পক্ষ থেকে মামলা না করা হলেও ভাঙচুরের ঘটনায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে নিউ ইয়র্কের মেয়রের কার্যালয়ে এবং মার্কিন এস্টেট ডিপার্টমেন্টে অভিযোগ দায়ের করা হয়।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন আওয়ামী দুর্বৃত্তকে তখন আটক করে নিউ ইয়র্ক পুলিশ। পরে তারা ছাড়া পায়। বাংলাদেশ কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও নিউ ইয়র্ক পুলিশ ঘটনার তদন্ত শেষ করে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপই নেয়নি বলে নিউ ইয়র্ক মিশনের কর্মকর্তারা আমার দেশকে জানিয়েছেন।

২০২৪ সালের নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানন্দরের বাইরে আক্রমণের শিকার হন তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। বিমানবন্দরের বাইরে তাকে ঘিরে একদল আওয়ামী সন্ত্রাসী ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগাান দিয়ে চড়াও হয় এবং নানাভাবে হেনস্তা করে। ওই ঘটনায়ও আসিফ নজরুলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের না করায় পার পেয়ে যায় আক্রমণকারীরা। তবে ঘটনার সময় উপস্থিত বাংলাদেশ মিশনের শ্রম উপদেষ্টা কামরুল ইসলাম উপদেষ্টাকে রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় জেনেভা থেকে তাকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়।