বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মব করে হামলা ও নির্যাতনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সরকার সমর্থন করে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, বাংলাদেশ ও নতুন বাংলাদেশের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের ওপর বিদেশের মাটিতে এ ধরনের হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বাংলা একাডেমি মেলা প্রাঙ্গণে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়া স্মৃতি পাঠাগার আয়োজিত ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা-২০২৬’-এর আলোচনাসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতার প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে আওয়ামী লীগের যারা অবস্থান করছেন বা আত্মগোপনে রয়েছেন, তাদের কেউ কেউ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ও নতুন বাংলাদেশের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের ওপর দলবদ্ধভাবে হামলা ও নির্যাতন করছেন।
বিদেশের মাটিতে এমন কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ সরকার বা দেশের নাগরিকরা সমর্থন করে না। ’
সম্প্রতি ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে আওয়ামী লীগ ও দলটির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের প্রবাসী কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার প্রসঙ্গেই শামা ওবায়েদ এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘দেশে কিংবা বিদেশে কোথাও মব রাজনীতি ও মব কালচারকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।
অকারণে সন্ত্রাস সৃষ্টি করাও কাম্য নয়। নতুন বাংলাদেশে রাজনীতিকে স্বচ্ছ, সুস্থ ও মানবিক ধারায় নিয়ে যেতে হবে।
বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর গত ১৭ বছরে নির্যাতনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
অনেকে গাছের নিচে বা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দিন কাটিয়েছেন। পুলিশের নির্যাতনে অনেকে জেলে গেছেন এবং অসংখ্য মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে অনেকে খুন ও গুম হয়েছেন।
এসব নেতাকর্মীর আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের দেশ গড়া ও উন্নয়নের কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের আত্মত্যাগ ভুলে গেলে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেদের বিবেকের কাছে দায়ী থাকতে হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জিয়া উৎপাদন, উন্নয়ন, জনসেবা ও গণসেবার রাজনীতির পাশাপাশি ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা দিয়েছেন। নতুন বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক মূল্যবোধগুলো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। বর্তমানে সংসদ আবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও সংকট নিয়ে সংসদে আলোচনা হচ্ছে এবং দেশের মানুষ তা সরাসরি দেখতে পারছেন। ’
এ সময় রাজনীতিতে অশ্লীলতার বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, সমাজ ও গণমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে অশ্লীল কথাবার্তা ছড়ানো হচ্ছে, তা একজন অভিভাবক ও নাগরিক হিসেবে তাকে উদ্বিগ্ন করছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এত মানুষের আহত ও নিহত হওয়ার পর নতুন বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চান না তিনি।
সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকের অধিকার উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘নীতি বা কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারের সমালোচনা করা যাবে। গণমাধ্যমও বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্বাধীন। তবে সমালোচনার নামে অশ্লীলতা, গালাগালি ও অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ’ ভদ্র ও গঠনমূলক ভাষায় সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ক্যাবিনেট সভায় কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য ফার্মার্স কার্ড চালু করা হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য শিগগিরই প্রবাসী কার্ড চালুর কথাও জানান তিনি।
দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাত গত ১৭ বছরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দাবি করে শামা ওবায়েদ বলেন, এসব খাতকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে বর্তমান সরকার।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আগের সরকারের দুর্নীতি ও ভুল নীতির কারণে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার সেই সংকট মোকাবেলায় কাজ করছে। সংকটের কারণে জনগণের দুর্ভোগ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি।
আলোচনাসভায় জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের আহ্বায়ক সৈয়দা ফাতেমা সালামের সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি এবং বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
শীর্ষনিউজ