এক, পিএসসির চেয়ারম্যান কয়েকদিন আগে পদত্যাগ করছেন। খুব সম্ভবত সরকারি দলের চাপের মুখে। সরকার এখন এই পদে নতুন নিয়োগ দেবে। পিএসসি সরকারের বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনা করে। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ যদি আমরা চাই, তাহলে পিএসসিকে দলীয় প্রভাবের বাইরে একটা প্রফেশনাল জায়গায় রাখতে হবে।
দুই, পিএসসি একটা সাংবিধানিক সংস্থা। সংবিধানে আলাদা করে আইন আছে পিএসসির গঠন ও কার্যক্রম বিষয়ে। বিএনপি তাদের ৩১ দফায় সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলছে। কিন্তু সংবিধানে তো আইন আছেই। তাহলে আবার প্রতিষ্ঠা করতে কেন হবে? কারন, বিএনপিও এটা মনে করে যে, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট আমলে এই আইনের অপব্যবহার হয়েছে, নির্লজ্জ দলীয়করণ হয়েছে। কাজেই আমাদের এখন নতুন নিয়ম লাগবে। ৩১ দফায় বিএনপি তাই নতুন নিয়মের আলাপ তুলছে। তারা প্রস্তাব করছে, শুনানির মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির ভেটিং সাপেক্ষে নিয়োগ হবে।
তিন, বিএনপির ৩১ দফার চাইতে আরও ভালো একটা সিস্টেমের প্রস্তাব জুলাই সনদে দেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদের প্রস্তাবে এই নিয়োগের জন্য ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কমিটিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দল থেকে মনোনীত), সরকার দলীয় প্রধান হুইপ, বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপ, দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের একজন প্রতিনিধি, সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষা/স্বাস্থ্য সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এই কমিটিতে থাকবেন। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, এই কমিটি সংসদের লোকজন নিয়ে হবে এবং সরকারি দল ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ থাকবে। এই বাছাই কমিটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ, শুধু সরকারি দলের লোকজন চাইলেই একা একা নিয়োগ দিয়ে দিতে পারবে না।
চার, এখনকার আইনে পিএসসির চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য সদস্যদের প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে। অর্থাৎ, একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় এবং পছন্দেই এই নিয়োগ হয়। বিএনপির ৩১ দফার প্রস্তাবে এই নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছার পরিবর্তে সংসদীয় কমিটির হাতে কিছুটা ক্ষমতা যাবে। যদিও সংসদীয় কমিটি সরকারি দলের লোকদের হাতেই থাকবে। জুলাই সনদের প্রস্তাবে এই ক্ষমতা একটি কমিটির হাতে যাবে যেখানে অন্তত একজন বিরোধী দলীয় লোকের সমর্থন লাগবে। ফলে তারা আলাপ-আলোচনা করতে বাধ্য হবে এবং দলীয়করণের সম্ভাবনা কমবে।
পাঁচ, আমেরিকান সিস্টেমে অনেক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের মনোনয়ন সংসদের উচ্চকক্ষে পাশ হতে হয়। উচ্চকক্ষে প্রেসিডেন্টের নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলে তাদের বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হয়। ভারত ও পাকিস্তানের বর্তমান নিয়োগে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে নিয়োগ দেন। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রীই একভাবে নিয়োগ দেন। পাকিস্তানে আগে এই ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে ছিল। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বাইরে তিনি নিয়োগ দিতে পারতেন। ২০১০ সালে তারা আইন পরিবর্তন করে এখনকার ব্যবস্থা করেছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে নিয়োগ হয়। সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট চাইলে প্রধানমন্ত্রীর মনোনয়ন ফিরিয়ে দিতে পারেন। অর্থাৎ, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি কোনো ক্যান্ডিডেটের ব্যাপারে একমত না হবেন, ততক্ষণ নিয়োগ হবে না। সাউথ আফ্রিকাতে সব দলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব থাকা একটি সংসদীয় কমিটি প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়। কাজেই, নিয়োগের ক্ষমতা যেন একমাত্র নির্বাহী বিভাগের প্রধানের হাতে না থাকে, এইটা অনেক দেশের সিস্টেমের মধ্যেই আছে। কোথাও সংসদ অথবা সংসদীয় কমিটি এই ব্যালেন্সের কাজ করে, কোথাও প্রেসিডেন্ট।
ছয়, প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কি পুরাতন আইনেই থাকবে? নাকি তাদের ৩১ দফা অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির শুনানির মাধ্যমে নিয়োগ দেবে? নাকি জুলাই সনদ অনুযায়ী নিয়োগ দেবে? নিয়োগ কমিটি যদি শুধু নিজেদের দলের লোক দিয়ে হয়, তাইলে শুধু একটা শুনানির মধ্য দিয়ে কোন কিছু অর্জন হবে না। সেই হিসেবে, জুলাই সনদের প্রস্তাব ৩১ দফার প্রস্তাবের চাইতে বেটার।
কিন্তু জুলাই সনদের প্রস্তাবে বিএনপি ডিসেন্ট জানিয়েছে। কাজেই এইটা তারা কোনভাবেই মানতে চায় না। এমনকি তাদের নিজেদের ৩১ দফাও তারা মানতে চাইতেছে না।
বিএনপি কি আমাদের শুধু পুরাতন বন্দোবস্তের মাঝেই ঘুরপাক খাওয়াবে?