Image description

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের পরিচয় কেবল দলীয় রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের কর্মজীবন বিস্তৃত হয়েছে বিজ্ঞান, শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, পরিকল্পনা, পরিবেশ, প্রযুক্তি, সংসদীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির নানা পরিসরে।

প্রফেসর ড. আবদুল মঈন খান তাদেরই একজন- যার বর্ণময় জীবনপথে একই সঙ্গে দেখা যায় বিজ্ঞানীর অনুসন্ধিৎসু মন, শিক্ষকের জ্ঞানচর্চা, নীতিনির্ধারকের দূরদৃষ্টি, রাজনীতিকের দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রচিন্তকের বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি।

একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি; আবার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পরিকল্পনা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন- মঈন খানের কর্মজীবন যেন এক জীবনে বহু জীবনের সমন্বিত প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তিত্ব জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। ২০২৬ সালে পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। 

 

তিন প্রজন্মের শিক্ষক পরিবারের সন্তান আবদুল মঈন খানের বেড়ে ওঠার পরিবেশেই ছিল শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও জনসেবার গভীর আবহ।

তার পারিবারিক ইতিহাসও বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। তাঁর দাদা ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এর কারণে স্কুলশিক্ষকের চাকরিও হারিয়েছিলেন। তার বাবা কলকাতা সরকারি কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীতে ব্রিটিশ ভারতের সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছান। পরে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জিয়াউর রহমানের সরকারের মন্ত্রিসভায় খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

এমন একটি পরিবারেই মঈন খানের মেধা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও জনসেবার মানসিকতার ভিত গড়ে ওঠে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার সময়ই তার অসাধারণ মেধার পরিচয় মেলে। পদার্থবিজ্ঞানের পাশাপাশি গণিত ও পরিসংখ্যানেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গোল্ড মেডেল বা স্বর্ণপদক অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মেধাক্রমে অবস্থান করেন এবং তৎকালীন ‘সেরা বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক পুরস্কার’ অর্জন করেন।

এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল ও মৌলিক ক্ষেত্র-দুর্বল ও সবল আন্তঃক্রিয়ার মধ্যবর্তী তাত্ত্বিক পরিসর।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সময় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছিল তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে পাকিস্তান সরকার তার বৃত্তি ও নাগরিকত্ব বাতিল করে। কিন্তু প্রতিকূলতা তার শিক্ষাযাত্রাকে থামাতে পারেনি।

ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তায় তিনি যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি তিনি সম্পন্ন করেন তার ডক্টরাল গবেষণা।

এই অধ্যায় তার ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে-জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশের সংকটময় সময়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট রাখার দৃঢ়তা।

মঈন খানের বৈজ্ঞানিক জীবনের পরিধি ছিল আন্তর্জাতিক। কলম্বো পরিকল্পনা, সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার ফেলোশিপ তার গবেষণাজীবনকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেয়।

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী আবদুস সালামের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তার বৈজ্ঞানিক জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি বিজ্ঞানী এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অতিথি শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বাংলাদেশের একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে এ ধরনের সম্পৃক্ততা তার কর্মজীবনের বিশেষ অর্জন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে মঈন খান শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না; গবেষণাকেও তিনি জ্ঞানচর্চার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখেছেন।

নিউক্লীয় পদার্থের গঠন নিয়ে কম্পিউটারভিত্তিক মডেল তৈরি ও সম্ভাব্যতাভিত্তিক অনুকরণ পদ্ধতিতে গবেষণায় তার সম্পৃক্ততা ছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলনে বক্তৃতা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে তার গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থসামাজিক সমন্বিত গ্রাম গবেষণা দলের সদস্য হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও কম্পিউটারভিত্তিক গবেষণার ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেন।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের পরিচালক হিসেবে পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভবিষ্যৎ পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের জন্য ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বা জিআইএস ব্যবস্থার উন্নয়নেও তার ভূমিকার কথা জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে। 

আজ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন যখন বাংলাদেশের জাতীয় নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তখন কয়েক দশক আগে এ বিষয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের অবদান নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

মঈন খানের জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে, আশির দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে পৃথক পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে তিনি জনসচেতনতা তৈরি ও সংগঠিত করার কাজে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার কথা সেখানে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের যে ধারণা আজ রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি অনেক আগেই কাজ শুরু করেছিলেন।

রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পরও বিজ্ঞানী মঈন খানের পরিচয় কখনো আড়ালে যায়নি। বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে এসে তার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা পেয়েছে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্র।

বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে তার সময়ে সাবমেরিন কেবল ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন, বাংলাদেশ-কোরিয়া তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, ঢাকায় গ্রহ-নক্ষত্রবিষয়ক জ্ঞানকেন্দ্র, জাতীয় বৈজ্ঞানিক তথ্যকেন্দ্র, নিউক্লীয় চিকিৎসা অবকাঠামো এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগ এগিয়ে যায় বলে তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতি এবং সাইবার আইন প্রণয়নেও তার ভূমিকার কথা জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ আছে।

প্রযুক্তিকে শুধু আধুনিকতার প্রতীক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, শিক্ষা, গবেষণা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি-মঈন খানের মন্ত্রিত্বে তারই প্রতিফলন দেখা যায়।

নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সময় তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে পরিকল্পনা-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে স্থানীয় সরকার কাঠামো নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিশনের সদস্য হিসেবেও কাজ করেন।

২০০১ সালে টানা চতুর্থবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছেন। ২০০৯ ও ২০১৬ সালে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নির্বাচিত হওয়া তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতারই প্রতিফলন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৯৩ সালে পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর মঈন খান উন্নয়ন পরিকল্পনায় তৃণমূলের মানুষের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন ।

তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল একটি সহজ কিন্তু গভীর ধারণা- উন্নয়ন পরিকল্পনা শুধু রাজধানী বা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকে তৈরি হলে হবে না; যাদের জন্য উন্নয়ন, তাদেরও পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।

এই দর্শনের প্রতিফলন পাওয়া যায় ‘বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা’ শীর্ষক ১২ খণ্ডের সংকলনে।

তার বিশ্বাস ছিল, স্থানীয় মানুষকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করা গেলে প্রকল্পের প্রতি তাদের মালিকানাবোধ বাড়বে এবং বাস্তবায়নও হবে অধিক কার্যকর।

জাতীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নেও তার নেতৃত্বের কথা জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা হয়েছে। মঈন খানের রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি তার আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড।

১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোর ধরিত্রী সম্মেলনে সংসদ সদস্যদের বৈশ্বিক কর্মজোটের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও ঋণ পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে বক্তব্য রাখেন।

১৯৯৩ সালে কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক সংকট নিরসনেও আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে কাজ করার কথা তার জীবনবৃত্তান্তে রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সংসদ সদস্যদের একই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার উদ্যোগে তার ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ, ইউনেস্কো, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ফোরামে বক্তা, প্রতিনিধি কিংবা আলোচক হিসেবে অংশ নিয়েছেন তিনি।

এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির একজন প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী পরিসরেও নিজের উপস্থিতি তৈরি করেছেন মঈন খান।

বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকের পরিচয়ের পাশাপাশি মঈন খানের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন।

গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিশেষ করে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পর বিরোধী দলের আন্দোলনে তার ভূমিকা রয়েছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থেকে দলীয় রাজনীতি, সংসদীয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

রাজনীতির মাঠে তার উপস্থিতির ধরনও ছিল অনেকাংশে তার ব্যক্তিত্বের মতো- আবেগের চেয়ে যুক্তি, তাৎক্ষণিক উত্তেজনার চেয়ে বিশ্লেষণ এবং দলীয় অবস্থানের পাশাপাশি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে কথা বলার প্রবণতা। 

বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান, জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।

১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ কার্যক্রমে তার পরিবারের প্রতিষ্ঠিত খান ফাউন্ডেশনের সম্পৃক্ততার কথাও জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে সমাজের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার যে প্রবণতা, তার জীবনপথে তারও ধারাবাহিকতা রয়েছে।

মঈন খানের বহুমাত্রিক পরিচয়ের আরেকটি অনন্য দিক সাহিত্য। বিজ্ঞান ও রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার পাশাপাশি কবিতাতেও তিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দীপান্তরে নির্বাসিতা’। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নিজ দেশে পরবাসী’। এছাড়া ‘ডিজিটাল লাইফ’ নামে তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

একজন নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিকের পাশাপাশি একজন কবির উপস্থিতি তার ব্যক্তিত্বকে দিয়েছে আরও মানবিক ও বহুমাত্রিক মাত্রা। 

প্রফেসর ড. আবদুল মঈন খানের জীবনকে একটিমাত্র পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। তিনি একই সঙ্গে বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, পরিবেশচিন্তক, প্রযুক্তিনীতিবিদ, পরিকল্পনাবিদ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক এবং সাহিত্যিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র থেকে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক; নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করা থেকে অক্সফোর্ড ও ক্যালটেকের একাডেমিক পরিসরে বিচরণ; বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব; পরিকল্পনাবিষয়ক নীতিচিন্তা থেকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চ- তার জীবন যেন বাংলাদেশের একজন মেধাবী নাগরিকের রাষ্ট্রসেবায় নিজেকে নিবেদনের দীর্ঘ অভিযাত্রা।

তার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণতন্ত্রের আন্দোলন, সংসদীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব। আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি নীতি, সাইবার আইন, সাবমেরিন কেবল, গবেষণা অবকাঠামো ও বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার নানা অধ্যায়।

সবকিছু মিলিয়ে প্রফেসর ড. আবদুল মঈন খানের জীবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে।

তিনি দেখিয়েছেন- রাজনীতি কেবল ক্ষমতার চর্চা নয়; রাজনীতি হতে পারে জ্ঞান, গবেষণা, রাষ্ট্রচিন্তা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং মানুষের কল্যাণকে এক জায়গায় মিলিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর ক্ষেত্র।

বিজ্ঞান তাকে দিয়েছে যুক্তির শক্তি, শিক্ষকতা দিয়েছে জ্ঞান বিতরণের দায়, গবেষণা দিয়েছে অনুসন্ধিৎসু মন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দিয়েছে বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি আর রাজনীতি দিয়েছে সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্র ও মানুষের কাজে প্রয়োগের সুযোগ।

এই বহুমাত্রিক পথচলাই প্রফেসর ড. আবদুল মঈন খানকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে যেখানে একজন রাজনীতিকের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে আছে বিজ্ঞানীর প্রজ্ঞা, শিক্ষকের দায়িত্ববোধ, রাষ্ট্রচিন্তকের দূরদৃষ্টি এবং জনসেবকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

বিজ্ঞানী থেকে রাষ্ট্রনায়ক- এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় প্রফেসর ড. আবদুল মঈন খানের সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত একটাই: জ্ঞানকে জনকল্যাণে এবং অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রসেবায় কাজে লাগানোর এক নিরলস প্রয়াস।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর পরপরই মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ড. আবদুল মঈন খান।