প্রস্তুতি শেষ। চলতি সপ্তাহে ঘোষণা হতে পারে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি। শেষ মুহূর্তে বেড়েছে পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক– প্রধান তিন পদে প্রায় দেড় ডজন নেতার নাম আলোচনায়। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের কাছে সংগঠনে নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরছেন তারা।
বিএনপি নেতারা বলছেন, আগস্টের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ব্যাপক রদবদল হবে। নেতৃত্ব বাছাইয়ে অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে শীর্ষ পদে আসবে একঝাঁক নতুন মুখ।
গত ১৩ আগস্ট রাতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরসহ শীর্ষ পাঁচ নেতা। নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে তাদের মতামত নেন তারেক রহমান। পাশাপাশি পদপ্রত্যাশীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক ভূমিকা ও ব্যক্তিগত বিষয়ে তথ্য নেন তিনি।
সূত্রের দাবি, ছাত্রদলের কমিটি গঠনে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা সম্ভাব্য নেতৃত্বের সংক্ষিপ্ত তালিকা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দিয়েছেন। তবে কারা শীর্ষ তিন পদে আসবেন, সে বিষয়ে তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
আলোচনায় দেড় ডজন নাম
সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আলোচনায় বর্তমান কমিটির সহসভাপতি খোরসেদ আলম সোহেল, মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ, এজাজুল কবির রুয়েল, এইচএম আবু জাফর, রিয়াদ রহমান; সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় এবার কমিটিতে অপেক্ষাকৃত জুনিয়ররা ঠাঁই পেতে যাচ্ছেন। এই বিবেচনায় আরোচনায় আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায়, ১ নম্বর সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন শাওন, সাংগঠনিক সম্পাদক নুর আলম ভূঁইয়া ইমন, ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামীম। তাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল, রাজু আহমেদ ও সাহিত্য সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, ডা. তৌহিদুল ইসলাম আওয়াল, জিয়া উদ্দিন বাসিত এগিয়ে আছেন।
পদপ্রত্যাশীদের ভাবনা
পদপ্রত্যাশী মমিনুল ইসলাম জিসান জানান, পদে পেলে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যাঁরা জীবনবাজি ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সাংগঠনিক পরিচয় নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারে তাদের সম্মানজনক অবস্থান তৈরিতে কাজ করবেন।
গাজী সাদ্দাম হোসেন জানান, ছাত্রদলকে তিনি মেধা, সৃজনশীলতা ও প্রতিশ্রুতিশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি আধুনিক এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চান। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, প্রজ্ঞা, মূল্যবোধ ও ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিটি ক্যাম্পাসে সংগঠনকে জনপ্রিয় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন গাজী সাদ্দাম।
আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক বলেন, ছাত্রদলে অনেক যোগ্য ও সম্ভাবনাময় নেতা রয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষ নেতৃত্বে আসার সুযোগ পাবেন হাতেগোনা কয়েকজন। তিনি নেতৃত্ব পেলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের আধুনিকায়ন এবং অনুমোদনের উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।
অতীতের পদ বাণিজ্যকে ইঙ্গিত করে অনিক এবার প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। দায়িত্ব পেলে তিনি ‘কমিটিক্স’ (কমিটি গঠনে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা) রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ছাত্ররাজনীতির পরিসরে ছাত্রদলকে কার্যকর, দায়িত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলবেন বলে জানান।
নাছির উদ্দিন শাওন বলেন, দায়িত্ব পেলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠনকে গতিশীল করব। নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ক্যাম্পাসগুলোতে সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করবেন বলেও জানান তিনি।
কমিটি গঠনে কারা, কতটা সক্রিয় বলয়
বর্তমানে ছাত্রদলের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে আছেন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল। তিনি খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য। ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী ও কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ১৫ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন কমিটি গঠনে বকুল ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল কাজ করছেন।
নব্বইয়ের দশক থেকে ছাত্রদলে ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান এবং রুহুল কবির রিজভী ও গুমের শিকার ইলিয়াস আলীকে ঘিরে পৃথক বলয় সক্রিয়। বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আসা হাবিবুন্নবী খান সোহেল, প্রয়াত শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, রকিবুল ইসলাম বকুল, আজিজুল বারী হেলাল, হাসান মামুন, আকরামুল হাসান মিন্টু, ইকবাল হোসেন শ্যামল, নাছির উদ্দীন নাছিরসহ অনেকে রিজভী–ইলিয়াস বলয়ের। বিপরীতে শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, রাকিবুল ইসলাম রাকিব, রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ, ফজলুর রহমান খোকন, রাজিব আহসানরা নেতৃত্বে এসেছেন আমান বলয় থেকে।
ছাত্রদলে অনেক যোগ্য ও সম্ভাবনাময় নেতা রয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষ নেতৃত্বে আসার সুযোগ পাবেন হাতেগোনা কয়েকজন। সুযোগ পেলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের আধুনিকায়ন এবং অনুমোদনের উদ্যোগ নেব।আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক, পদপ্রত্যাশী
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এবার সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে আগের মতো একক বলয় বা কয়েকজন নেতার প্রভাব ছাত্রদলে থাকার সম্ভাবনা কম।
তবে নাম প্রকাশ না করে ছাত্রদলের প্রথম সারির এক নেতা বলেন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ পৃথক বলয় নিয়ন্ত্রিত। রাজনীতির হাতেখড়ি থেকে নেতৃত্বে আসা পর্যন্ত একজন নেতার পৃষ্ঠপোষকতা, দায়িত্ব বণ্টন, বিভিন্ন ইউনিটের নেতৃত্ব নির্বাচন এবং নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনায় বলয়গুলো বিশেষ ভূমিকা রাখে। ফলে বলয়কে পুরোপুরি বাদ দিয়ে ছাত্রদলের রাজনীতিকে দেখা কঠিন। এসব বলয়ের সমন্বয়ে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কাঠামো পোক্ত হয়েছে।