ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পূর্ণ করল বিএনপি সরকার। বর্তমানে জনগণের উচ্চ আশা পূরণ করা আর দেশ পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা সামলানোর মধ্যবর্তী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তারা।
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েই বেশ কিছু পুরোনো ও জটিল সমস্যা পেয়েছে। এসবের মধ্যে ছিল হাম রোগের প্রকোপ, দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কূটনীতি ও নানা খাতের সংস্কারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শুরুর দিকের অনেক সমস্যারই স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।
বাজারে নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। ব্যাংকিং খাতের টানাপোড়েন কাটেনি। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসনের গতি আনা এবং রাষ্ট্রীয় নানা সংস্কার কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সরকার বলছে, এসব সংস্কার কাজ শেষ করতে ও দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে তাদের আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন ও স্বস্তি এনে দিতে পারছে কি না—তার ওপরই সরকারের প্রতি জনগণের বিশ্বাস টিকিয়ে রাখা নির্ভর করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগের চেয়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।’
তিনি জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা সরকার বেশ ভালোভাবে সামলে নিয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা ও দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকারের যে চেষ্টা রয়েছে, তারও প্রশংসা করেন তিনি।
তিনি স্বীকার করেন, সংকটময় অবস্থায় বাংলাদেশকে টেনে তোলা কোনো সহজ কথা নয়। তা সত্ত্বেও সরকারের কাজ ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেন। অধ্যাপক কাজী মাহবুব বলেন, গত বছরের তুলনায় কয়েকটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট অগ্রগতি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনো অর্থনীতি
দেশের অর্থনীতি এখনো সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। মূল্যস্ফীতির বোঝা টানা পঞ্চম বছরে পা দেওয়ায় কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এবং হাজার হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে কাহিল হয়ে পড়েছে।
চলতি অর্থবছরে সরকারের ঘোষিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা খুব কম। একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকার যে বড় কোনো আর্থিক সহায়তা দেবে, সে ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে।
এর ওপর যোগ হয়েছে ব্যাংক খাতের চরম বিশৃঙ্খলা। এই আর্থিক অস্থিরতা ঠেকাতে সরকারকে শেষ পর্যন্ত করদাতাদের টাকাই ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন টাইমসকে বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা বোঝার জন্য ছয় মাস খুব কম সময় নয়, আবার খুব বেশি সময়ও নয়। তবে তাদের শুরুর পদক্ষেপগুলো দেখলেই কোন দিকে এগোচ্ছে তা টের পাওয়া যায়।’
তিনি বলেন, পুরোনো কিছু জটিল সমস্যা সমাধানের মনোভাব সরকারের মধ্যে দেখা গেলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয়, দৃঢ়তা ও সময়ের সঠিক ব্যবহারের অভাব ছিল।
উদাহরণ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, পণের দাম না বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটি মার্চ-এপ্রিল মাসে নতুন জটিলতা তৈরি করে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি যেখানে ৮ শতাংশের ওপরে আটকে আছে, সেখানে সম্প্রতি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি আরও বলেন, যখন কারখানাগুলো জ্বালানি সংকট ও নতুন কাজের অর্ডারের অভাবে ভুগছে, তখন শুধু কম সুদে ঋণ দিয়ে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে ব্যবসার খরচ কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন সুবিধা এবং সহজে অর্থ পাওয়ার পথ তৈরি করা দরকার।
তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর স্প্রেড বা সুদের ব্যবধান বেঁধে দেওয়ায় নীতিগত হস্তক্ষেপ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সেই সব বিনিয়োগকারীর মনে, যাদের আগের আমলের সুদের হারের সীমার কথা মনে আছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সম্প্রতি নেওয়া কর সংস্কার, নিয়মকানুন শিথিল করা ও শেয়ারবাজারের নানামুখী উদ্যোগ হয়তো বিনিয়োগের পরিবেশ একটু উন্নত করতে পারে। তবে ব্যবসায়ী সমাজ শেষ পর্যন্ত দেখবে এগুলো কতটা সততা ও সুনির্দিষ্ট নিয়মে বাস্তবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।’
অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় এখনো জ্বালানি খাত। সেই সঙ্গে দিন দিন আর্থিক সামর্থ্য কমে যাওয়াও বড় এক বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘পুরোনো সব সমস্যা রাতারাতি মিটে যায় না, সময় লাগে। কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে একদিন সময় নষ্ট করার সুযোগও আমাদের হাতে নেই।’
কূটনীতিতে আস্থা ফেরানোর লড়াই
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সরকার তাদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখেছে। বিশ্বের বড় বড় শক্তি ও উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখেই তারা পথ চলার চেষ্টা করছে।
ঢাকা একাধারে ওয়াশিংটন, নতুন দিল্লি, বেইজিং, মস্কো, কুয়ালালামপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। পাশাপাশি জাপান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
সবক্ষেত্রেই দেশের নিজস্ব স্বার্থকে ওপরে রেখে বড় শক্তির দেশগুলোর সঙ্গে সমতা বজায় রাখার একটি চেষ্টা দেখা গেছে।
৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়াকে দেশের জন্য এক বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই নির্বাচনের প্রচারের জন্য বাংলাদেশ মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় পেয়েছিল।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মেহেদী হাসান মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ সঠিক দিকেই আছে।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা ইতিবাচক। সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া অনেক বড় একটা অর্জন, যা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সম্মান ও অবস্থান অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে।’
তিনি জানান, সরকার প্রধান প্রধান উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে একটি ‘চমৎকার ভারসাম্য’ বজায় রেখে চলছে।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে মেহেদী হাসান বলেন, জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক টানাপোড়েন দূর করা। এক্ষেত্রে চীনের কাছ থেকে জোরালো সমর্থনও পাওয়া গেছে।
তবে এর পর চীন বাংলাদেশকে তাদের ‘ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’-এ যোগ দেওয়ার জন্য বললেও কৌশলগত সুবিধার কথা ভেবে ঢাকা তাতে সায় দেয়নি বলে জানান মেহেদী হাসান।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ঘিরে কড়া নজরদারি
বিএনপি সরকারের ছয় মাস পার হলেও গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে বড় আশা তৈরি হয়েছিল, তার অনেকখানিই এখনো অধরা। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে স্পষ্ট অগ্রগতি না থাকায় রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ আর হতাশা জমা হচ্ছে।
গণভোটে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষই জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বারবার এটি বাস্তবায়নের দাবি তুলছে। তাদের বক্তব্য: জনগণের স্পষ্ট রায় থাকার পরও সরকার এখনো কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন, সাধারণ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগে দলীয় বিবেচনায় লোক বসানো বা বদলি করার নানা অভিযোগে সরকার সমালোচিত হচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড রাজনীতিকে আবারও সেই পুরোনো দলীয়করণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছিল।
তবে এর মাঝেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাদামাটা জীবনযাপন ও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার প্রবণতা নজর কেড়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ব্যক্তিত্বের এই দিকগুলো হয়তো জনগণের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু দিনশেষে সরকার কেমন চলল তা মাপা হবে সংস্কারের দৃশ্যমান কাজের মাধ্যমেই।
সরকারের বক্তব্য
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ মনে করেন, কোনো সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা মেপে দেখার জন্য ছয় মাস খুবই কম সময়। কারণ, এই সময়ের বড় অংশই গেছে ভেঙে পড়া প্রশাসনকে দাঁড় করাতে।
তিনি বলেন, কাজের ফলাফল দেখতে, ভুলত্রুটি বুঝতে এবং তা শুধরে নিয়ে এগোতে সরকারের আরেকটু সময় পাওয়া উচিত।
রিজভী জানান, সরকার ইতিমধ্যে বড় ধরনের অগ্রগতি এনেছে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয় তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার ধরে কাজ করছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, হেলথ কার্ড এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের কথা তুলে ধরেন, যার মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকরা সরাসরি উপকার পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও যুদ্ধ চলা সত্ত্বেও সরকার দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের অভাব মেটাতে রাতদিন কাজ করছে। ফলে এত অল্প সময়ে সরকারের সার্বিক পারফরম্যান্স নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
এখনো মাথা ব্যথার কারণ আইনশৃঙ্খলা
প্রশাসনের জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও সরকার পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানো এবং নিরপেক্ষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবুও কিছু কিছু জায়গায় অপরাধ ও সহিংসতার ঘটনায় মানুষের উদ্বেগ কমেনি।
পুলিশের কয়েকটি সংস্থায় রদবদল এবং নজরদারি বাড়ানো হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গেলে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে আরও গভীর সমন্বয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া গতি নেই।
সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস কেটেছে আগের আমল থেকে পাওয়া সমস্যা সামাল দেওয়া এবং নতুন এক পথ তৈরির চেষ্টার মধ্য দিয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান সরকারের জন্য আগামী মাসগুলো চরম পরীক্ষার। কারণ, প্রতিশ্রুতিগুলোকে সত্যি সত্যি কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করা এবং সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা পুরোদমে ফিরিয়ে আনাই এখন তাদের মূল কাজ।