জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয় গত বছর। এতে ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে সেই সাজাও বাড়িয়ে সর্বোচ্চ করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। কিন্তু বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।
আইনজীবীদের অভিযোগ, প্রসিকিউশন টিমের অবহেলার কারণেই মামলাটির শুনানি পিছিয়ে রয়েছে। যদিও চিফ প্রসিকিউটর দাবি করেছেন, আপিলের বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন। তবে, কবে শুনানি শুরু হবে সেই সময়সীমা তিনি জানাতে পারেননি। এই আপিল আবেদনে শেখ হাসিনার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার জন্য আটটি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
মামলার তিন আসামি শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন/কোলাজ ছবি
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। সেখানে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর প্রথম বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ওইদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রীই মামলার একমাত্র আসামি ছিলেন। পরে মার্চ মাসে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে এ মামলায় আসামি করতে প্রসিকিউশনের করা আবেদন মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে প্রসিকিউশন কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এতে শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। পরে মামলায় একমাত্র গ্রেফতার আসামি আবদুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হিসেবে জবানবন্দি দেন।
সার্বিক অবস্থা বিচারে শেখ হাসিনার মামলায় প্রতীয়মান হচ্ছে, প্রসিকিউশনের অবহেলা-অনাগ্রহ রয়েছে। যার জন্যই এত মাস পর্যন্ত মামলাটির শুনানি পিছিয়ে রয়েছে।- সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ সাইফুর রহমান
বিচারের পরবর্তী ধাপ শেষে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। এতে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি মামুন পান পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
পরবর্তীসময়ে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ও কামালের আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা আরও বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল করে প্রসিকিউশন।
দণ্ড বাড়াতে ৮ যুক্তি উপস্থাপন
আপিল আবেদনে সাজা বৃদ্ধির দাবিতে আটটি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। এর অন্যতম হলো- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এ যে শাস্তির কথা বলা আছে, তার প্রথমেই মৃত্যুদণ্ডের বর্ণনা রয়েছে। আর জুলাই- আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। সেখানে নিষ্ঠুরতম অপরাধ হয়েছে, যার শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত।
আপিলের যুক্তিতে আরও বলা হয়, আসামিরা জেনেছেন যে তাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে। সাজা হচ্ছে। আপিলের মেয়াদও ৩০ দিন। এসব জেনেই তারা নিজেদের পলাতক রেখেছেন। পলাতক থেকে বিভিন্নভাবে বিচারে বাধা দেওয়ার জন্য বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে তাদের শাস্তি কমানোর কোনো সুযোগ নেই। আর আসামিদের সরাসরি আদেশ বা নির্দেশে যে ধরনের হত্যাযজ্ঞ হয়েছে, তা পৈশাচিক। তাদের নির্দেশে সারাদেশে এক হাজার ৪০০ এর বেশি মানুষ শহীদ ও ২৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন, যা নজিরবিহীন এবং ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঘটনা। অতএব শেখ হাসিনাসহ আসামিদের মৃত্যুদণ্ডই ছিল সঠিক ও ন্যায়বিচার।
আদালত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করা হয়/ফাইল ছবি
‘আসামিদের মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত ছিল’
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল যে অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেননি, আমরা মনে করি তা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। রায় সঠিক, তবে এই একটি অভিযোগে দণ্ড সঠিক হয়নি। তাই যে অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেই অভিযোগেও দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল আবেদন করা হয়েছে।’
‘আমরা মনে করি, শেখ হাসিনার উসকানির কারণে এদেশে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে, চিরপঙ্গুত্ববরণ করেছে, দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেছে, মাথার খুলি গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এগুলোর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং আমরা বিশ্বাস করি, এটাই হওয়া উচিত ছিল,’ যোগ করেন তিনি।
যেসব আসামির সাজা কম হয়েছিল, এর মধ্যে যাদের সাজার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আপিল আবেদন করা হয়েছিল, সেই আপিলগুলোর শুনানি হওয়া প্রয়োজন। আমরা এসব আপিল নিয়ে কাজ করছি।- চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলামের মতে, ট্রাইব্যুনাল অন্য অভিযোগে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিলেও, সংশ্লিষ্ট অভিযোগেও তাদের মৃত্যুদণ্ডই হওয়া উচিত ছিল। তাই রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।
৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী, রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া আপিল দায়েরের পর ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধানও রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সময়সীমা নির্দেশনামূলক হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলেও আপিলের কার্যকারিতা বহাল থাকে।
সর্বশেষ গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের কার্যতালিকায় (কজলিস্টে) আপিলটি শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এরও আগে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য গত ১ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের চেম্বার জজ আদালত আদেশ দেন। সেদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম। পরে মামলাটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠানো হয়। তারপর থেকে এটি সেখানে ঝুলে রয়েছে। এখনো শুরু হয়নি শুনানি।
বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ সাইফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সার্বিক অবস্থা বিচারে শেখ হাসিনার মামলায় প্রতীয়মান হচ্ছে, প্রসিকিউশনের অবহেলা-অনাগ্রহ রয়েছে। যার জন্যই এত মাস পর্যন্ত মামলাটির শুনানি পিছিয়ে রয়েছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম/ফাইল ছবি
যা বলছেন চিফ প্রসিকিউটর
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার মামলাসহ যেসব মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ে আসামিদের দণ্ড কম হয়েছে, তাদের দণ্ড বাড়ানোর ব্যাপারে করা আপিল আবেদনের শুনানির উদ্যোগ নেবো।’
‘অনেক আসামির সাজা অল্প বা কম হয়েছে, এমনকি অনেক আসামির সাজার মেয়াদ শেষও হয়ে যাচ্ছে। যেসব আসামির সাজা কম হয়েছিল, এর মধ্যে যাদের সাজার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আপিল আবেদন করা হয়েছিল, সেই আপিলগুলোর শুনানি হওয়া প্রয়োজন। আমরা এসব আপিল নিয়ে কাজ করছি। তবে, কবে শুনানি হবে সেই সময়সীমা বলতে পারছি না,’ যোগ করেন আমিনুল ইসলাম।
হাসিনাসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে করা আপিল আবেদনের ওপর শুনানির বিষয়ে জুলাই শহীদ পরিবারগুলোর আকাঙ্ক্ষা রয়েছে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তাদের তো একটা প্রত্যাশা রয়েছে। সেই অনুযায়ী আমরা চেষ্টা করছি। যথাসময়ে আপিল আবেদনের শুনানি করা হবে।’