নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশে কর্মরত গোপালগঞ্জের অধিবাসীদের তালিকা চেয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান। এই ঘটনায় তার বক্তব্য ঘিরে সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি তার ছেলের অপকর্ম ঢাকতে গিয়ে পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ। উল্লেখ্য, গত জুন মাসে তার ছেলে জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে পুলিশ চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক করেছিল। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
গতকাল রোববার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে মাসিক আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আজহারুল ইসলাম মান্নান। এসময় তিনি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে এই তালিকা দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘একটা কথা বলতে গেলে এসপি সাহেবের উপরে পড়ে। তবু আমি বলি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও বলব এই কথাটা। আজ আমি যাইতেছি ঢাকা। ৫ আগস্টের আগে পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ‘গোপালী’ দিয়ে ভরে গিয়েছিল। এখনো আবার ঘুরেফিরে সেই গোপালী দিয়া ভইরা গেছে। পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলা গোপালী দিয়া ভইরা গেছে। আইনশৃঙ্খলা কেমনে সুন্দর হবে? গোপালীরা কি আমাদের ভালো চাইবে? ভালো চাইবে না।’
ডিসি ও এসপির কাছে তালিকা চেয়ে সংসদ সদস্য বলেন, ‘গোপালীদের লিস্ট চাই আমরা। কার বাড়ি কোন দেশে, এই নারায়ণগঞ্জে কোন থানার মধ্যে কে আছে, এটার লিস্ট চাই। তালিকা চাই আমরা। ঘুরেফিরে আবার ওই গোপালী দিয়ে ভরে গেছে পুরো নারায়ণগঞ্জ।’
আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় নদীপথে চাঁদাবাজির জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলেন আজহারুল ইসলাম মান্নান। তিনি বলেন, ‘মেঘনা বা বিভিন্ন নদী থেকে বালুর বাল্কহেডগুলো ঢোকার আগেই চাঁদা শুরু হয়ে যায়। আবার নাকি মোবাইলে চাঁদা দিয়ে দেয়, কীভাবে দেয় জানি না। এটার সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ’র অফিসাররাও জড়িত।’
তার এই বক্তব্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচানা শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়াউল ইসলাম কাজল বলেন, কার বাড়ি কোথায় এটা তো বিষয় না, বিষয় হচ্ছে পুলিশ আইন অনুযায়ী কাজ করছে কি-না। যদি আইন অনুযায়ী কাজ করে তাহলে কোনো কথা থাকতে পারে না। আর যদি আইন অনুযায়ী কাজ না করে তাহলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তিনি অভিযোগ করবেন, সেটাও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। তিনি যেহেতু এমপি তার এই বিষয়গুলো জানার কথা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এটি তুলে মনে হচ্ছে তিনি প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন। তার ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ঢাকতে হয়তো তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, গত ২১ জুন সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে আটক করে পুলিশ। পরে নানা অনিয়মে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে সজীবকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেসময় ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সজীবের বিরুদ্ধে কিছু লোকজন পুলিশের কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে ভুক্তভোগীরা মামলা করবেন। পরে অবশ্য সজিবকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিতর্কিত বক্তব্য প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি জেলার সব পুলিশ প্রসঙ্গে এ কথা বলেছি। শুধু সোনারগাঁয়ের পুলিশ প্রসঙ্গে বলিনি। আমি তালিকা চেয়েছি। তালিকা দেখে পরে আবার কথা বলবো।’
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারা তারেক আল মেহেদীর ভাষ্য, সংসদ সদস্যের বক্তব্য শুনেছেন তারা। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তবে জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, জেলার কোনো ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি গোপালগঞ্জে না। শুধু একজন ওসি’র বাড়ি গোপালগঞ্জে।